ঘটনার সূত্রপাত এক তারকার অসুস্থ হওয়া থেকে। এরপরই একজন সাংবাদিক তাঁকে একটি প্রশ্ন করে বসেন। সেই প্রশ্ন শুনেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন তারকা। তার পরই আসে উড়ায় দেওয়া বা জীবনের অর্ধেক গায়েব করে দেওয়ার হুমকি। পাওয়ারের ধমকি শুনে পাল্টা অবস্থানে যান সাংবাদিকেরাও। প্রতিবাদ সমাবেশ করে আল্টিমেটাম দিয়ে ক্ষমা চাইতে বলে ওই তারকার কোনো ধরনের সংবাদ প্রকাশ না করার কথাও বলা হয়। একেবারে একে-অপরের বিপক্ষে যুদ্ধ ঘোষণা যেন!
অভিনেত্রী তানজিন তিশা কিছুদিন আগে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁর ‘আত্মহত্যার চেষ্টা’ সংক্রান্ত কিছু সংবাদ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে বটে। যদিও এই অভিনেত্রীর অসুস্থতার সংবাদ সংগ্রহ থেকে শুরু করে এর প্রকাশের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকার কারণে এতটুকু জানি যে, ওই অভিনেত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে আত্মহত্যার চেষ্টার তথ্যের সপক্ষে কিছু বলা হয়নি। তবে হ্যাঁ, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে গুঞ্জনটি রটেছিল বটে। তবে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সেটিকে গুঞ্জন ছাড়া অন্যকিছু বলার কোনো সুযোগ ছিল না, শিরোনামেও জায়গা দেওয়া সম্ভব ছিল না (অন্তত সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা মানলে তো অবশ্যই)। যদিও অনেক সংবাদমাধ্যম আত্মহত্যার চেষ্টাকে টেনে শিরোনামে এনেই সংবাদ প্রকাশ করে গেছে।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এর পরে। ওই ঘটনায় দুই পক্ষের বক্তব্য শুনে নেওয়া যাক। মূলত একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের একজন সাংবাদিক একটি প্রশ্ন করেছিলেন তানজিন তিশাকে। ওই টিভি চ্যানেলের ওয়েব পোর্টালে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, ‘বৃহস্পতিবার রাত ৯টা ২০ মিনিটের দিকে বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানার জন্য যোগাযোগ করে চ্যানেল 24 বিনোদন টিম। তখন সম্পর্কের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে সাংবাদিকদের উড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেন তিনি। একই সঙ্গে নিজের সর্বোচ্চ ক্ষমতা ব্যবহার করে ‘দেখে নেবেন’ বলেও জানান অভিনেত্রী তিশা। তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে তিনি বলেন, সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলেই উত্তর দিতে বাধ্য নই আমি। আপনি প্রথম এই প্রশ্ন করেছেন, তাই আপনাকে ছাড় দিলাম। এরপর কেউ সাহস করে আমাকে এই প্রশ্ন করলে আর ছাড় দেয়া হবে না। তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে―এটা আমি প্রমিজ করলাম। আপনি এই কথাটা অন্য সব সাংবাদিককে বলে দেন ভাইয়া। এরপরই সাংবাদিকদের চাকরিচ্যুত করার হুমকি দিয়ে তিনি বলেন, নিউজ তো অনেক পরের কথা, আমি তো তখন উড়ায় ফেলব! বাট, এখানে মুখ দিয়েও কেউ যদি বলে বা আমি শুনতে পাই কারও নাম, তাহলে আমার পাওয়ার খাটিয়ে, এমনকি যতবড় পাওয়ার খাটানো যায়, সেই পাওয়ার খাটিয়ে আমি যা করার করব। আমি আপনাকে ডিরেক্টলি বলে দিচ্ছি ভাইয়া। কারণ, এটি একজন মেয়ের জন্য খুবই সেনসেটিভ। তিশা আরও বলেন, তাদের জীবনের অর্ধেক শেষ করার জন্য যা করার আমি করব, এজন্য আমি একেবারেই প্রস্তুত। এটা যেকোনো মেয়ের জন্য খুবই স্পর্শকাতর একটি বিষয়। আর আমি এখনই মুশফিক আর ফারহানকে নিয়ে কোনো কথা বলব না।
অর্থাৎ, কোনো একটি প্রশ্নে আক্রান্ত বোধ করেছেন অভিনেত্রী তিশা। কোন প্রশ্নে আক্রান্ত বোধ করেছেন, সেটি সম্পর্কে অবশ্য স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। তবে একটি জাতীয় দৈনিক যা লিখেছে, তাতে বোঝা যায় যে একজন নারীর অত্যন্ত ব্যক্তিগত শারীরিক পরিস্থিতির বিষয়টি নিয়েই জানতে চাওয়া হয়েছিল। ওই তথ্য যদি সঠিক হয় তবে আমাদের সাংবাদিকদের বুঝতে হবে যে, সব প্রশ্ন সবাইকে সব পরিস্থিতিতে করা যায় না এবং করাও উচিত নয়। কোনো নারী পাবলিক ফিগার হন বা যা-ই হন, তাঁকে অন্তত এমন প্রশ্নটি করা উচিত নয়। জ্ঞানপিপাসারও কিছু সীমা আছে। যখন সেই জিজ্ঞাসা অতি ব্যক্তিগত তথ্যের ভাণ্ডার উন্মুক্ত করার চেষ্টা করে, সেটি অভব্যতা। সাংবাদিকেরা বলতেই পারেন যে, তথ্য পাওয়া অধিকার। ঘটনার বিস্তারিত জানতে তারা প্রশ্ন করতেই পারেন, উত্তর দেওয়া বা না দেওয়া তো যার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে, তার ব্যাপার। কিন্তু কিছু প্রশ্ন আছে, যেগুলো কারও কারও ব্যক্তিগত ট্রমাকে উসকে দিতে পারে। অন্তত এই ক্ষেত্রে পাপারাজ্জিদের মতো আচরণ কোনো সাংবাদিকের কাছ থেকে কাম্য নয়।
আসলে কী প্রশ্ন হয়েছে, তার আনুষ্ঠানিক স্বীকারপত্র প্রকাশ্য নয়। তবে এটি প্রকাশ্য যে, তানজিন তিশা হুমকি দিয়েছেন। সেই হুমকিও এমন ভাষায় যাতে পাওয়ার খাটানো, চাকরি খাওয়া বা জীবনের অর্ধেক শেষ করে দেওয়ার মতো শব্দবন্ধের উল্লেখ আছে ভালোমতোই। এমন শব্দ তখনই কেউ একজন ব্যবহার করেন, যখন তার ওইসব হুমকিকে বাস্তবে রূপদানের কিঞ্চিৎ অভিজ্ঞতা থাকে। সমস্যা হলো, তিশার পেশাগত ইতিহাস অনুযায়ী তাঁর ঝুড়িতে থাকা উচিত উপচে পড়া জনপ্রিয়তা, এ ধরনের অভিজ্ঞতা নয়।
আবার বলা হচ্ছে যে, পুলিশের কাছে নাকি এ নিয়ে তিশা অভিযোগও করে এসেছেন। ফলে তিশার বক্তব্য শুনে আক্রান্তবোধ করা সাংবাদিকেরা ঘটা করে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, সমাবেশ করছেন। তা সাংবাদিকেরা করতেই পারেন। এটি তাদের মৌলিক অধিকারই। অন্যদিকে কোনো কিছুতে পুলিশের দ্বারস্থ হওয়াটাও বেআইনি কিছু নয়।
কারও কাছ থেকে ক্ষমা চাওয়ার দাবি যে কেউ করতে পারে। তবে তা না পেলে সভা-সমাবেশ করে কোনো অভিনেত্রীর সংবাদ বর্জনের কথা বলাটা ঠিক পেশাদার নয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে দাবি হয়তো আদায় হয়, কিন্তু জনমানসে খুব একটা শ্রদ্ধার আসন ধরে রাখা যায় বলে বোধ হয় না।
সমস্যা হলো, এ দেশের অনলাইন সংবাদমাধ্যমগুলো ও এর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম বেশ কিছুদিন ধরেই ভিউ ও ক্লিকের ওপর অতিনির্ভরশীল হয়ে গেছে। ফলে সংবাদকর্মীদের ওপরও আলোচিত খবর খোঁজার চাপ থাকেই। এখন যারা সংবাদ তৈরি ও বিতরণের পুরো ব্যবস্থার দায়িত্বে থাকেন, তাদের দায়িত্ব হলো – কোন সংবাদের রূপ কেমন হবে, তা ঠিক করা। কোনটা বাড়াবাড়ি, আর কোনটা সঠিক ও ন্যায়সঙ্গত দৃষ্টিভঙ্গি – সেটি জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদেরই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মুক্ত বাজার অর্থনীতির যুগে সংবাদমাধ্যমকেও বাণিজ্য করতে হয়, নইলে টিকে থাকাই কঠিন। আবার নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কেও অবগত থাকা প্রয়োজন বটে। এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতাকে স্মরণে রাখাই অবশ্য যথেষ্ঠ। তবে মাঝে মাঝেই অনতিক্রম্য সেই সীমা যে অতিক্রম হচ্ছে – সেটি স্বীকার করতেই হবে। কারণ আমরা অনেক ক্ষেত্রেই সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতার তুলনায় সোশ্যাল মিডিয়ার হিসেব-নিকেশকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। এ ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনার দায় অবশ্যই বিভিন্ন মিডিয়া হাউজের বড় কর্তাদের ঘাড়েই বর্তায়। তাদেরই ঠিক করতে হবে যে, নৈতিকভাবে সৎ থেকে তারা কোন কনটেন্ট থেকে আয় করবেন, আর কোন কনটেন্ট থেকে করবেন না।
নিরপেক্ষভাবে বলতে গেলে, অভিনেত্রী তানজিন তিশার ঘটনায় এক পক্ষের সীমা অতিক্রম করা দেখে আরেক পক্ষও মুখের লাগাম তুলে নিয়ে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারকেই সমাধান হিসেবে বেছে নিয়েছিল। এখন দুই পক্ষই যদি একে-অন্যের কাছে ক্ষমা চেয়ে সমস্যার সুন্দর সমাধানের পথে এগিয়ে যান, তবেই মঙ্গল হবে। এর বদলে দুই পক্ষই যদি একে-অন্যকে ‘উড়ায় ফেলতে’ চায়, তবে দিনশেষে কারোরই হয়তো আর এই মাটির পৃথিবীতে পা থাকবে না। হ্যাডমের জোরে শুধু উড়তেই থাকলে আর কীভাবেই বা থাকবে, বলুন!
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন