সম্প্রতি একটি অফিসে একটি পদের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। জানতে পারলাম, চারজনকে ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাকা হয়েছে। এদের মধ্যে দুজন নারী আর দুজন পুরুষ। ইন্টারভিউ বোর্ডের মূল্যায়নে চারজনের মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় হয়েছেন দুজন নারী। পরে শুনলাম, নারী নিয়োগে ভেটো দিয়েছেন কর্তা ব্যক্তিদের একজন। তাঁর যুক্তি—নারীরা ছুটি বেশি নেন, নাইট শিফট করতে পারেন না। কিন্তু তারা যে দক্ষ কর্মী, সেটা বিবেচনায় নিচ্ছেন না। অথচ যিনি ভেটো দিয়েছেন তাঁর মেয়েও চাকরি করেন।
একজন নারীর মেধা ও দক্ষতা থাকার পরও কাজের জন্য এমন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সত্যিই দুঃখজনক। একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্ব যখন পৌঁছে গেছে মহাকাশে, মঙ্গলে, চাঁদে—তখনও এমন চিন্তাভাবনা সংকীর্ণতা ছাড়া কিছুই নয়। বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠানে নারীরা কৃতিত্বের সঙ্গে কাজ করছেন, অথচ আমাদের এই দশা!
বাংলাদেশ এখনও উন্নয়নশীল দেশ। এদেশের সম্পদ সীমিত, অর্থনীতিও চাপে। আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ জনবল—যার অর্ধেকই নারী। বিগত সব সরকারই নারীদের সামনে এগিয়ে আনার চেষ্টা করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় শিক্ষায়, কর্মে, সেবায় এদেশের নারীরা এগিয়েছে ঈর্ষণীয় পর্যায়ে। পুরুষের কাছে তা দৃষ্টিকটু লাগছে কি না, সেটাই এখন বড় সন্দেহ!
আমরা ভাবতে চাই—একজন নারী কারো মা, কারো মেয়ে, কারো স্ত্রী। তারা যদি পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেন, তবে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবকিছুরই উন্নতি হবে। আমরা স্বপ্ন দেখি উন্নত রাষ্ট্রের, কিন্তু আচরণ করি অন্ধকার যুগের মতো।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে নারী রাষ্ট্রপ্রধান দক্ষতার সঙ্গে দেশ চালিয়েছেন বা চালাচ্ছেন। রাজনৈতিক দলগুলোতেও নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। কিন্তু সমান ভোটারের দেশে এখনও রাজনৈতিক দলে নারী প্রতিনিধিত্ব খুবই সামান্য। তবুও রক্ষা এই যে, আইনপ্রণেতা হিসেবে সংবিধানে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন রয়েছে।
সম্প্রতি ২৩৮টি আসনে প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছে বিএনপি। যার মধ্যে মাত্র ৯ জন নারী—অর্থাৎ প্রার্থীদের ৪ শতাংশেরও কম। বিএনপির স্থায়ী কমিটিতেও নারীর সংখ্যা খুব বেশি নয়। যদিও মহিলা দল ও যুব মহিলা দল দলের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী সংগঠন।
জামায়াতে ইসলামীর মিছিল, মিটিং বা সমাবেশে নারীদের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। যদিও মাঠ পর্যায়ে দলটির নারী কর্মীরা সক্রিয় আছেন বলে জানা যায়। দলটি এরই মধ্যে ৩০০ আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে, তবে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। যাদের প্রচারণা চোখে পড়ছে, তাদের মধ্যে কোনো নারী নেই।
তরুণ দল এনসিপির নেতৃত্বে রয়েছেন কয়েকজন নারী, তবে সংখ্যায় খুব বেশি নন। ৩০০ আসনে তারা প্রার্থী ঘোষণা করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে—এনসিপি নারীদের কতটা প্রাধান্য দেয়।
২৩ জনের অন্তর্বর্তী সরকারে মাত্র ৪ জন নারী উপদেষ্টা—অর্থাৎ প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগ। তবে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ঐকমত্য কমিশনে একজনও নারী ছিলেন না। যাদের দায়িত্ব ছিল জুলাই সনদ তৈরি ও সংস্কারের নীতিমালা চূড়ান্ত করা। কিন্তু সংস্কারে নারী উন্নয়ন ছিলো অবহেলিত। এমনকি নারী সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনও গুরুত্ব পায়নি।
ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচন। তার আগেই জানা যাবে এমপি পদে মোট কতজন নারী প্রার্থী হচ্ছেন। আর ভোটের পর জানা যাবে—বিএনপি, এনসিপি বা জামায়াত থেকে কতজন নারী সংসদ সদস্য হবেন। তাদের সাহসী ভূমিকার ওপরই নির্ভর করবে এদেশে নারীর ভবিষ্যৎ।
নারীর স্বাধীনতা ও ক্ষমতায়নকে কোন দল কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে—আগামী নির্বাচনের ফলাফলেও তার প্রতিফলন দেখা যাবে। কারণ নারীর উন্নয়নের দিকে নারী ভোট যাবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
সবশেষে মনে করিয়ে দিতে চাই—নারী ক্রিকেট ও ফুটবল দল যে সুনাম কুড়িয়েছে, তা কি পেরেছে পুরুষ দল অর্জন করতে? কারণ একাগ্রতা, মেধা ও দক্ষতায়—নারীরাই উত্তম।
লেখক: ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]



