ক্ষমতার সমীকরণের কোন পাশটা মানুষের

একটা ছবি মাথার ভেতর গেঁথে যাচ্ছে ক্রমে। কারিকুরিহীন নিপাট সরল। অথচ কী ভয়ঙ্করভাবে গেঁথে যাচ্ছে মাথায়। পুরো ছবি নয়। বলা যায় এর মধ্যবিন্দুতে না চাইতেই চোখ আটকে যায়। এ এক বিদায় দৃশ্য। হৃদয়ে ক্ষরণ হয় অজান্তে। কারণ, এ বিদায় কোনো প্রিয়জন থেকে ক্ষণিকের নয়। একেবারে চিরতরে। না, এ কোনো স্বাভাবিক বিদায় নয়, নয় কোনো স্বেচ্ছামরণ। কোনো জরিপকাজ ছাড়াই চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায় যে, এ নিতান্ত অনিচ্ছার বিদায়।

ট্রেনের জানলায় দু হাত বাইরে রেখে যেভাবে পুড়ে গেল দেহটি, যে আবছায়া হলো রচিত, তা যেন এই গোটা সময়েরই টীকা-ভাষ্য। আর একটু, এই তো গোপীবাগ, তারপরই কমলাপুর। তারপর সামর্থ্যমতো যান খুঁজে নিজ ডেরায়। তারপর প্রিয়জন, প্রিয়জন। এই তো হতে পারত একটি দীর্ঘ যাত্রার আপাত শেষ দৃশ্য। কিন্তু তা পূর্ণযতি হয়ে গেল। আরও অনেকের শরীরে বসে গেল আগুনে-ক্ষতের দাগ।

বলা হচ্ছে বেনাপোল এক্সপ্রেসের কথা। গতকাল (৫ জানুয়ারি, ২০২৪) যার কিছু অংশ আগুনে পুড়েছে। সে আগুন নিভেছেও। কিন্তু আগুনের দৃশ্য কি নিভেছে? হাসপাতালে দগ্ধদের চিকিৎসা চলছে। নিশ্চয় যথাযথ সুশ্রুষায় আহতরা সেরে উঠবেন। কিন্তু ঘরে ফেরার এই যাত্রার একেবারে শেষ বিন্দুর কাছে এসে যে ক্ষত তাঁরা শরীরে নিলেন, নিলেন মগজে ও মনে, তার সুশ্রুষা করবে কে?

গোপীবাগে বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। ছবি: ইনডিপেনডেন্ট

আন্তঃসীমান্ত এই ট্রেনে ভারতীয় নাগরিকও থেকে থাকতে পারেন। তবুও এটা কিছুটা জোর দিয়ে বলা যায় যে, অধিকাংশই ছিলেন বাংলাদেশি। কারণ, দেশে নির্বাচনের আবহ। আচ্ছা তাঁরা কি ভারতে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন, যেমন অনেকেই যায়। গিয়েছিলেন পর্যটনে, যেমনটা এ পর্যটন মৌসুমে হরহামেশাই যাচ্ছেন-আসছেন অনেকে। নাকি কোনো ব্যবসার উদ্দেশ্যে? নাকি দেশেরই নানা অঞ্চল থেকে চড়ে বসেছিলেন ঢাকাগামী ট্রেনটিতে? কোনো বিশেষ কাজে রাজধানীতে, উচ্চশিক্ষা বা চাকরি? যদিও নির্বাচন। যদিও পাতা আছে হিংসার সমীকরণ।

আচ্ছা, যারা চিকিৎসা করিয়ে আসছিলেন, তাঁরা কি প্রিয়জনের রোগমুক্তির আনন্দ নিয়ে ফিরছিলেন? যারা বেড়াতে গিয়েছিলেন, তাঁরা ফিরছিলেন ঠিক কত স্মৃতি নিয়ে? যারা নিজের বাড়ি থেকে চুয়াডাঙ্গা বা অন্য জায়গা থেকে ঢাকায় আসছিলেন, তাঁদের চোখে কি স্বপ্ন ছিল কোনো? অথচ এই আনন্দ, এই স্মৃতি, এই স্বপ্ন-সব এক আগুনেই পুড়ে গেল। যার শরীর পুড়ল না, তারও।

তাঁরা সবাই জানতেন, দেশে নির্বাচন হতে চলেছে। তাঁরা জানতেন, ট্রেনে আগুন এখন সাধারণ হয়ে উঠছে। তবু তাঁরা ট্রেনে চড়েছিলেন। তাঁদের স্মৃতিতে নিশ্চয় ছিল তেজগাঁওয়ের সেই আগুন, যা ট্রেনেই দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের নিশ্চয় মনে ছিল, এমন আগুনে ৫ জন পুড়ে গেছে। তবু তাঁরা ট্রেনেই চড়েছিলেন। কী এত প্রয়োজন ছিল?

এই বোকা মানুষেরা জানতেন ট্রেনের লাইন সরিয়ে ফেলা হয়, আগুন লাগানো হয়। এই বোকা মানুষেরা মেনে নিয়েছিলেন, এই সবই করে কিছু দুর্বৃত্ত, যাদের কস্মিনকালেও খুঁজে পাওয়া যায় না। তাঁরা জানতেন তদন্ত কমিটি নামের এক দারুণ সোনার পাথরবাটি আছে, যা বারবার দেখানো হয়। এ যেন সেই নিষ্ফলা গাছ, যা থাকে, বাতাস দেয় মাঝেসাঝে; কিন্তু ফল নৈব নৈব চ।

আগুনের ঘটনার পর উদ্ধারকাজ করে ফায়ার সার্ভিস। ছবি: ইনডিপেনডেন্ট

এই বোকা মানুষেরা জানতেন, দেশে নির্বাচন হচ্ছে। তাতে দেশের ৪৪টি দলের মধ্যে ২৮টি অংশ নিচ্ছে; আর ১৬টি নিচ্ছে না। তাঁরা জানতেন, প্রায় দু হাজার প্রার্থী তাঁদের সেবা করার জন্য চেষ্টা করতে করতে যারপরনাই জেরবার। তাঁরা জানতেন, ক্ষমতায় থাকতে চাওয়ারা নির্বাচনমুখী, আর ক্ষমতা পেতে চাওয়ারা নির্বাচন-বিমুখী। তাঁরা জানতেন, উভয় পক্ষেরই তাঁদের সেবা করার ইচ্ছে এতই তীব্র যে, সে সুযোগ না দিলে ঘাড় মটকে যেতে পারে।

এ যেন সেই সুকুমার বাস্তবতা, যেখানে অভয়বাণীর শেষ পাতে থাকে বরাবরই সেই চিরন্তন বাক্য-‌সত্যি বলছি কামড়ে দেব মিথ্যে এমন ভয় পেলে। তাঁরা ভুলে গিয়েছিলেন, এই দেশে এই শীত শীত আবহে নির্বাচনের যজ্ঞে কিছু আহুতিরও প্রয়োজনও পড়তে পারে। ভুলে গিয়েছিলেন, এই এত সব আয়োজনের মধ্যমণি হিসেবে বিসর্জনটা তাঁদের কাতার থেকে হওয়াই দস্তুর।

ক্ষমতা তো জনগণের জন্য, জনগণের তরে, জনগণ থেকে উৎসারিত; অতএব এই ক্ষমতার বলি তো জনগণকেই হতে হবে নাকি! তাই হচ্ছে। ট্রেনে বা বাসে বা অন্য কোথাও আগুনে বা হামলায় যতবার মানুষ শব্দটি আক্রান্ত হচ্ছে, ততবার নিশ্চয়ই এই জনগণ নামের মানুষ বা মানুষ নামের জনগণের ক্ষমতার বলয় বাড়ছে। হে দুর্বৃত্ত তোমাকে ধন্যবাদ। তুমি না থাকলে এই অগণিত মানব-স্রোতের কী হতো!

হে দুর্বৃত্ত, তোমার কারণেই না জানা গেল, জনগণ আদতে গণিতের সেই ভগ্নাংশ, সেই লব বা হর, উভয় পক্ষই যাকে এড়াতে চায়, যা তিরোহীত হলেই শুধু অঙ্ক মেলে। তোমার কারণেই জানা হলো- ক্ষমতার সমীকরণে জনগণ হলো সেই আপদ, যাকে ঝেঁটিয়ে কোণঠাসা করা না গেলে কোনো মীমাংসাই হয় না। তোমাকে ধন্যবাদ। দুর্বৃত্ত তোমায় সালাম। তুমি আরও আরও বহুদিন অধরাই থেকে যেও। তার মধ্যে মানুষ নিশ্চয়ই বুঝে যাবে তার মূল্য। জেনে যাবে, সেবা মানে শুধু সহানুভূতির হাত নয়, খাওয়াও বটে। জানবে আর চিনে নেবে নিজের আদল। জানবে তার হাত-পায়ের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ। জানবে যে, তারও আছে পেশি, চোখ ও মগজ। জেনে যাবে যে, অন্যকে বহুগুণে বাড়ানোরই নয় শুধু চূড়ান্ত ক্ষয়ের মন্ত্রও আছে গাণিতিক ভগ্নাংশের কাঠামোজুড়ে। ততদিন, ঠিক ততদিন...

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন