মৃত্যু সব সময়ই জীবনের শেষ বিন্দু নয়। অনেক সময় মৃত্যু হয়ে ওঠে এক তীব্র, নির্মম অথচ স্পষ্ট প্রতিবাদের ভাষা। সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যুকে ঘিরে যে আলোচনার ঝড় উঠেছে, সেটি আমাদের সামনে সেই প্রশ্নকেই ফের উসকে দিয়েছে। তিনি একটি ‘খোলা চিঠি’ লিখে গিয়েছেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যু আত্মহত্যা, নাকি হত্যাকাণ্ড—এমন নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছনো এখনও সম্ভব হয়নি। রহস্য রয়ে গিয়েছে, আর সেই রহস্যই ঘটনাটিকে আরও অস্বস্তিকর, আরও বেদনাদায়ক করে তুলেছে। তবে একটি বিষয়ে কোনও দ্বিমত নেই—তাঁর রেখে যাওয়া ‘খোলা চিঠি’ আমাদের সামনে এমন এক সত্য উন্মোচন করেছে, যা আমরা এড়িয়ে যেতে পারি না। সেই চিঠি নিছক ব্যক্তিগত হতাশার দলিল নয়, এটি আমাদের সামষ্টিক ব্যর্থতার দলিল, আমাদের অবহেলা ও অমানবিকতার আখ্যান। চিঠির প্রতিটি বাক্য যেন এক ধরনের আত্মকথন, অথচ একই সঙ্গে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চার্জশিটও বটে। প্রশ্ন জাগে—বিভুরঞ্জন সরকারের মতো এক প্রবীণ, অভিজ্ঞ এবং প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক কেন জীবনের অন্তিম প্রান্তে এসে এমন চিঠি লিখে যেতে বাধ্য হলেন? এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের চোখে ভেসে ওঠে এই সমাজের অসংখ্য ফাঁকফোকর, অসংখ্য অপূর্ণতা, যেগুলো আমরা এত বছরেও পূরণ করতে পারিনি।
এটা হয়তো কখনও নিশ্চিতভাবে জানা যাবে না, কীভাবে তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায় রচিত হয়েছিল। তদন্তের ফলাফল হয়তো কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে, হয়তো পৌঁছাবে না। কিন্তু তাঁর চিঠির ভাষা আমাদের এড়াতে দেয় না সেই অস্বস্তিকর সত্য—মৃত্যু কখনও কখনও হয়ে ওঠে প্রতিবাদের শেষ সীমারেখা। যদি সত্যিই তিনি স্বেচ্ছায় জীবন বিসর্জন দিয়ে থাকেন, তবে সেই মৃত্যু নিছক ব্যক্তিগত দুর্বলতার স্বাক্ষর নয়। বরং এটি এই সমাজের শ্বাসরুদ্ধকর নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে এক তীব্র এবং অনিবার্য প্রতিবাদ। আর যদি তাঁর মৃত্যুতে রহস্য থেকেই যায়, তবে সেই রহস্যের আড়ালেও ধরা দেয় দীর্ঘদিনের অবহেলা, যোগ্যতার যথার্থ মূল্যায়নের অভাব, আর আমাদের সামষ্টিক নিস্পৃহতার কালো ইতিহাস।
বিভুরঞ্জন সরকার ছিলেন এক দীর্ঘপথ পাড়ি দেওয়া সাংবাদিক। তাঁর কলমে বারবার উঠে এসেছে রাষ্ট্র ও সমাজের অনিয়ম, বৈষম্য আর অন্যায়ের নির্মম কাহিনি। তিনি জানতেন শব্দের শক্তি, জানতেন সংবাদমাধ্যমের প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী হতে পারে। তবু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁর ভরসা রইল একটি ‘খোলা চিঠি’, যেখানে তিনি লিখে গেলেন নিজের অভিমান, অভিযোগ এবং গভীর হতাশার কথা। অনেকেই আজ সেই লেখাটিকে ‘আত্মহত্যার জবানবন্দি’ হিসেবে চালাচ্ছেন। কিন্তু সত্যিই কি এটি কেবল একটি আবেগের বিস্ফোরণ? কেবল জীবনের অপ্রাপ্তি আর একাকিত্বের দলিল? নাকি এর ভেতরে লুকিয়ে আছে সমাজের অসহিষ্ণুতা, ক্ষমতার হিংসা, প্রতিপক্ষ দমন আর ভয়াবহ রাজনৈতিক বাস্তবতার দলিল? এই দেশে যেখানে ভিন্নমতকে দমন করার জন্য খুন, গুম, ভয় দেখানো প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে, সেখানে কি একে নিছক ব্যক্তিগত আত্মহত্যা বলে পাশ কাটিয়ে দেওয়া যায়? হত্যাকাণ্ডের সম্ভাবনাকেও কি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায়? এই প্রশ্নগুলো হয়তো অস্বস্তিকর, কিন্তু বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যু সেই প্রশ্ন তোলার অধিকার আমাদের দিয়েছে।
আমাদের মধ্যে অনেকের ধারণা, ‘খোলা চিঠি’ মানেই মৃত্যুর ঠিক আগে লেখা কিছু আবেগঘন পংক্তি। কিন্তু বিভুরঞ্জন সরকারের লেখা পড়লে সেই ধারণা ভেঙে যায়। তাঁর লেখায় প্রতিফলিত হয়েছে বহু দিনের জমে থাকা আক্ষেপ, দীর্ঘ এক জীবনের হতাশার ইতিহাস। এখানে ব্যক্তিগত বেদনা যেমন রয়েছে, তেমনি স্পষ্ট আছে সামষ্টিক দায়ের ইঙ্গিত। তিনি যেন আমাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেন এক বিশাল আয়না। সেই আয়নায় আমরা দেখতে পাই—কীভাবে সমাজের প্রান্তে ঠেলে দেওয়া মানুষ ধীরে ধীরে একা হয়ে যান, কীভাবে সহকর্মী, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র কেউই তাঁদের সত্যিকারের ভরসা হতে পারে না। তাঁর ‘খোলা চিঠি’ তাই কেবল ব্যক্তিগত আর্তি নয়, এটি সমাজের প্রতি একটি শেষ হুঁশিয়ারি, একটি আর্তনাদ যা শোনা যায় কেবল মৃত্যুর পর, যখন আর কিছুই করার থাকে না।
বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যু তিনি স্বেচ্ছায় বেছে নিন বা না নিন, সেই মৃত্যু আসলে আমাদের উদাসীনতার ফল। যদি এটি সত্যিই আত্মহত্যা হয়ে থাকে, তবে এটি নিছক ব্যক্তিগত পরাজয় নয়, বরং সামাজিক কাঠামোর ব্যর্থতা ও অবিচারের বিরুদ্ধে এক ভয়ঙ্কর প্রতিবাদ। আর যদি মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনও রহস্য লুকিয়ে থাকে, তবে সেই রহস্যের আড়াল থেকেও ভেসে আসে দীর্ঘ মানসিক ক্লান্তির সুর, অসহ্য একাকী এক লড়াইয়ের ভার, এবং সমাজের দেওয়া নির্মম অবজ্ঞা।
কেন একজন মানুষ শেষ মুহূর্তে এসে ‘খোলা চিঠি’ লেখেন? কারণ, তিনি জীবিত অবস্থায় তাঁর কথাগুলো পৌঁছে দিতে পারেননি। তাঁর চারপাশে কেউ কান পাতেনি। সহকর্মীরা হয়তো উদাসীন ছিলেন, প্রতিষ্ঠান হয়তো নিজের দায় এড়িয়ে গিয়েছে, রাষ্ট্র থেকেছে নিশ্চুপ। ফলে শব্দই হয়ে উঠল তাঁর একমাত্র আশ্রয়। মৃত্যুর আগে তিনি তাই শব্দকে অস্ত্র করে রেখে গেলেন এক দলিল, যাতে আমরা সবাই অভিযুক্ত। এই প্রক্রিয়া আমাদের কেবল দুঃখিত করে না, বরং অপরাধবোধে ভরিয়ে তোলে। আমরা যারা আজও বেঁচে আছি, তাঁদের উদ্দেশে যেন তিনি বলে গেলেন—’দেখো, তোমাদের কারণেই আমি আর বাঁচতে পারলাম না।’
সংবাদমাধ্যমকে আমরা সাধারণত দেখি আলোর ঝলকানিতে ভরা একটি ক্ষেত্র হিসেবে। কিন্তু এর আড়ালে লুকিয়ে থাকে ভীষণ চাপ, অসীম অনিশ্চয়তা, আর্থিক অস্থিরতা এবং মানসিক যন্ত্রণা। প্রতিদিন সাংবাদিকরা অন্যের দুঃখ, মৃত্যু, দুর্নীতি, অবিচারের কাহিনি লিখতে লিখতে নিজের ভেতরে জমিয়ে তোলেন এক গভীর শূন্যতা। অথচ তাঁদের জন্য থাকে না কোনও মানসিক পরিচর্যার ব্যবস্থা, থাকে না নিরাপত্তার আশ্বাস। প্রবীণ বয়সে এসে সেই শূন্যতা, সেই অনিশ্চয়তা আরও তীব্র হয়। বিভুরঞ্জন সরকারের ‘খোলা চিঠি’ তাই কেবল একজন মানুষের ব্যক্তিগত আখ্যান নয়, এটি সাংবাদিকতার অন্দরমহলের এক ভয়ঙ্কর দলিল—যা বলে দেয়, এই পেশায় কতটা অসহায়ত্ব, আর কতটা অবহেলা জমে থাকে অদৃশ্য দেয়ালের আড়ালে।

আমরা মৃত্যুর পর অনেক কিছু বলি। এখন নানা জায়গায় বিভুরঞ্জন সরকারকে স্মরণ করা হচ্ছে, তাঁর লেখার প্রশংসা করা হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনায় তাঁর নাম উচ্চারিত হচ্ছে। কিন্তু জীবিত অবস্থায় আমরা কতটা পাশে দাঁড়িয়েছিলাম? তাঁর একাকিত্বে আমরা কি সত্যিই কান পাততে শিখেছিলাম? নাকি আমরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি কেবল মৃত্যুর পর চোখের জল ফেলতে? এ এক ভয়ঙ্কর ভণ্ডামি, যা আমরা প্রতিনিয়ত করি। মৃত্যুর পর শোকসভা করি, মোমবাতি জ্বালাই, স্মৃতিচারণ করি, তারপর আবার সাধারণ জীবনে ফিরে যাই। কিন্তু যাঁরা চলে যান, তাঁরা আর ফিরে আসেন না। তাঁদের আর্তি আর শোনা হয় না।
এই মৃত্যু আমাদের জন্য শিক্ষার সুযোগ। প্রথমত, মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। মানসিক যন্ত্রণা কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি সামাজিক প্রশ্ন। দ্বিতীয়ত, সাংবাদিকদের মতো পেশায় যেখানে সত্য বলার দায় অনেক, সেখানে নিরাপত্তা ও পরিচর্যার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। তৃতীয়ত, আমাদের সমাজকে সহমর্মিতার পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে কেউ চরম একাকিত্বে ভুগে ‘খোলা চিঠি’ লিখে জীবন শেষ করতে বাধ্য না হন। আর চতুর্থত, প্রবীণ নাগরিকদের জীবনের প্রতি আমাদের আরও সংবেদনশীল হতে হবে। বয়স বাড়া মানে সমাজ থেকে ক্রমশ সরে যাওয়া—এই ধারণা বদলাতে হবে।
বিভুরঞ্জন সরকারের ‘খোলা চিঠি’ আমাদের জন্য এক আয়না। সেখানে আমরা দেখতে পাই আমাদের অক্ষমতা, অবহেলা আর উদাসীনতার প্রতিচ্ছবি। যেখানে সত্য বলা যায় না, সত্য বললে টিকে থাকা যায় না। স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করলে কোনো একটা বিশেষ পক্ষে তালিকাভুক্ত করা হয়। তিনি চলে গিয়েছেন, কিন্তু আমাদের সামনে রেখে গিয়েছেন কঠিন প্রশ্ন—আমরা কি সত্যিই মানুষের কথা শুনতে শিখেছি? আমরা কি মৃত্যুর আগে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি? নাকি আমাদের সমাজ কেবল মৃত্যুর পরই সাড়া দেয়?
এই মৃত্যু নিশ্চিত আত্মহত্যা হোক বা হোক রহস্যজনক প্রয়াণ—এটি এক প্রতিবাদ। এই প্রতিবাদ কেবল বিভুরঞ্জন সরকারের নয়, এটি আমাদের সবার বিরুদ্ধে তোলা এক অভিযোগ। তিনি তাঁর শেষ লেখায় যেন বলে গেলেন, ‘আমি ভাল নেই, তোমরা শুনতে চাইলে পারতে।’ আমরা শুনিনি। এখন তাঁর অনুপস্থিতিতেই আমরা তাঁর লেখা পড়ছি, শোক করছি, অথচ জানি, এর কোনও প্রতিকার নেই। মৃত্যুর পর আর সংশোধন হয় না।
তবু যদি আমরা সত্যিই শিখতে চাই, তবে এই মৃত্যুকে স্মৃতি নয়, শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আমাদের কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হবে, মানুষকে মানুষের পাশে দাঁড়াতে শিখতে হবে। যোগ্যতার মূল্যায়ন করতে হবে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। না হলে একের পর এক ‘খোলা চিঠি’ আমরা পড়ব, আর একের পর এক মৃত্যু আমাদের চমকে দেবে। বিভুরঞ্জন সরকার আমাদের চোখের সামনে সেই আয়নাটি রেখে গিয়েছেন। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের—আমরা কি সেই আয়নায় নিজের মুখোমুখি দাঁড়াব, নাকি আবারও ভান করে ভুলে যাব?
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


নিখোঁজের একদিন পর মেঘনা নদীতে মিলল সাংবাদিক বিভুরঞ্জনের মরদেহ
