দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়ে গেছে। নতুন সরকারও গঠিত হয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যা চেয়েছে, তাই হয়েছে। এখন পর্যন্ত সরকার বলছে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এ দুটি পুরোনো চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি তাদের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। অবশ্য ভোটের আগেও বিদেশি, বিশেষ করে আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্বের চাপ মোকাবিলা করতে হয়েছে সদ্য বিদায়ী দলটিকে।
যেকোনো সরকারের জন্য তা নতুনই হোক বা পুরোনো হোক—প্রথম ১০০দিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর এবার আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য এটা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সরকারও মনে করেছে রাজনীতি, অর্থনীতি (বিশেষ করে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ) ও কূটনীতিক অঙ্গণে তাদের দৃশ্যমান কিছু সফলতা দেখাতে হবে। তাহলে আগামী ৫ বছর সরকার পরিচালনা অনেকটাই সহজ হবে।
আওয়ামী লীগ এবার নিয়ে টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় এসেছে। আর ক্ষমতাসীন দলকে নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই চলতে হবে এটাই স্বাভাবিক। একটা বড় অংশের ভোট বর্জনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর সরকার আমেরিকার চাপে পড়বে বলে যেটা মনে করা হচ্ছিল, সে ধরনের কোনো কিছুই এখনো দৃশ্যমান হয়নি। আমেরিকা ও পশ্চিমারা ভোট নিয়ে তাদের অসন্তুষ্টির কথা জানালেও বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা সুষ্পষ্ট করেই বলেছেন। পাশাপাশি অনেকের ধারণা ছিল ভোটের পরই কম্বোডিয়ার মতো বাংলাদেশের ওপরও আমেরিকা নিষেধাজ্ঞা দেবে, সেটাও হয়নি। ভোট পরিচালনাকারীদের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা নিয়েও এখন পর্যন্ত কোনো কথা বলেনি দেশটি। নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রায় সব দেশের কূটনীতিকদের উপস্থিতি এবং নতুন সরকারকে তাঁদের অভিনন্দন জানানোকে ইতিবাচক মনে করছে ক্ষমতাসীন দলটির নেতারা।
অন্যদিকে দেশের ভেতরে বিরোধী রাজনৈতিক দলের ব্যাপক চাপের সম্মুখীন সরকারকে এখনই হতে হবে—এমনটা মনে হচ্ছে না। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি আপাতত কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়ার মতো অবস্থায় নেই। দলটি হয়তো আবার নিজেদের গুছিয়ে নিতে কাজ করবে। কিন্তু সরকার পতনের আন্দোলনের যে ধারাবাহিকতা দলটির ছিল, সেই সুতায় ছেদ পড়েছে।
ভোটের পর তাৎক্ষণিক দেশে–দেশের বাইরে বড় কোনো চাপের সম্মুখীন না হওয়ায় স্বাভাবিবকভাবেই অনেকে প্রশ্ন তুলছেন—বিএনপি কি নির্বাচন বর্জন করে ভুল করেছে? এমন প্রশ্নকে আরও উসকে দিয়েছে গণমাধ্যমে কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তির লেখা বা সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকার ও লেখায় এই ব্যক্তিরা সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন না হওয়ার জন্য সরকারকে যেমন দোষারোপ করেছেন, তেমনি তাঁরা এও বলেছেন—নির্বাচনের মাঠ ফাঁকা করে দিয়ে বিএনপিও ভুল করেছে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র এক দিন আগে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদারের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেন। সাক্ষাৎকারটির শিরোনাম ছিল ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থাকলেও বিএনপির মাঠ ছেড়ে দেওয়া উচিত হয়নি’।
সেখানে আলী ইমাম মজুমদার এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি, প্রধানত বিএনপির কথাই আমি বলব, কোনো রাজনৈতিক ফর্মুলা নন-নেগোশিয়েবল হয় না। তারা একটাই ফর্মুলা দিয়ে রাখছে, সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া তারা কোনো আলোচনায় যাবে না, ইলেকশন করবে না। এই রকম নন-নেগোশিয়েবল কিছু হয় না। আমি মনে করি বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতেও যদি তারা নির্বাচনে যেত, সেটা তাদের জন্য ভালো হতো।’
অবশ্য আলী ইমাম মজুমদার এমন একটা সময় এ কথা বলেছেন, যখন বিএনপির পক্ষে আর নির্বাচনে আসার সুযোগ ছিল না। অথচ যখন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছিল, সে সময় আরও ৪৭ জন নাগরিকের সঙ্গে তিনি এই নির্বাচনী তফসিল বাতিল করে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানিয়েছিলেন।
শুধু আলী ইমাম মজুমদারই নন, বিএনপির নির্বাচনে আসা উচিত ছিল বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মহসিন। গত ১১ জানুয়ারি ডেইলি স্টারে এ নিয়ে কলাম লেখেন তিনি।
আমেনা মহসিনের লেখার মূল কথা হলো—বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার কারণে ভোট অংশগ্রহণমূলক হয়নি। ঝুঁকি নিয়ে হলেও বিএনপির ভোটে অংশ নেওয়া উচিত ছিল। তিনি এও লেখেন, বিএনপি সব সময় বলে আসছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচনে যাবে না। কিন্তু দলটি সাধারণ মানুষের জন্য কি কোনো ইস্যুতে সোচ্চার হয়েছে?
অবশ্য নির্বাচনে না যাওয়া ইস্যুতে বিএনপি নেতৃত্ব মনে করে তাদের সিদ্ধান্তে ভুল নেই। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপিকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছিল—এটা বিএনপি নেতা বিশ্বাস করেন। এবারও বিএনপি ভোটে গেলে একই অবস্থা হতো। শুধু আওয়ামী লীগের পাতানো নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য ভোটে যাওয়া কোনো সিদ্ধান্ত হতে পারে না বলে মনে করেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান। তিনি বলেন, ‘যে যাই বলুক, মানুষ ভোট বর্জন করেছে। এখানে কেবল একটি দল ও তাদের আনুকল্য পাওয়া দলগুলো অংশ নিয়েছে। ফলে এটা কোনো ভোট হতে পারে না। বিএনপি তাদের যে এক দফা দাবি (সরকার পতন) সেখানে অটল আছে।’
অবশ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ মনে করেন, ‘সরকারের প্রধান কাজ ছিল একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া এবং নির্বাচন কমিশনের চাওয়া বাস্তবায়ন করা। ভোটের সময় থাকা সরকার সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পেরেছে বলে মনে করি।’ তিনি বলেন, বিএনপিকে ভোটে আসার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। তারা আসেনি। এটা তাদের সিদ্ধান্ত।
বিএনপি সরকার পতনের দাবিতে আন্দোলন করছিল। কিন্তু সেই দাবি দলটি আদায় করতে পারেনি। একপর্যায়ে দলটি ভোট বর্জনের দাবিতে কর্মসূচি পালন শুরু করে। নির্বাচনে প্রায় ৪২ শতাংশ ভোট পড়েছে। কম ভোট পড়াতে দলটি তাদের আহ্বানে জনগণ সাড়া দিয়েছে বলে দাবি করেছে। তবে বিএনপি নেতৃত্ব সরকার পতনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায়ে কী করছে, সে ব্যাপারে কোনো কিছু জানাতে পারেনি। কোনো কোনো নেতা মনে করেন এখন অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতা কারাগারে আছে। তাঁরা ছাড়া পেলে বিএনপি নতুন করে আন্দোলনের কর্মসূচি পালন শুরু করবে।
অবশ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম নতুন সরকারের শপথ নেওয়ার পর গত ১৩ জানুয়ারি তাঁর পত্রিকায় কলাম লেখেন।
‘এক দল থেকে এক ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা: যা ছিল “কার্যত”, এখন তা “আইনসিদ্ধ”’ শীর্ষক ওই লেখায় তিনি লিখেছেন, ‘গণতান্ত্রিক দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন নির্বাচনের ওপরও শেখ হাসিনার কতটা নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তার আরেকটি উদাহরণ হলো দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন—বিরোধী দল বর্জন করায় যেটা তাঁর জন্য আরও সহজ হয়ে যায়। বেশির ভাগ বিষয়ে আগে থেকেই রফা হয়ে যাওয়ায় নির্বাচনের দিন তেমন কোনো বাধা-বিঘ্নের ঘটনা ঘটেনি। বিএনপি প্রমাণ করেছে যে, তারা শেখ হাসিনার কৌশলি চিন্তা ও পরিকল্পনা সম্পর্কে বুঝতে সক্ষম না এবং নির্বাচন বর্জন করায় তাদেরকে যে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে চড়া মূল্য চোকাতে হবে, সে বিষয়েও খুব সামান্যই ভেবেছে।’
মাহফুজ আনাম তাঁর লেখায় এও বলেন, ‘নির্বাচন বর্জনের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বিএনপির প্রান্তিক হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে।’
লেখক: প্রধান বার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন