প্রতিশ্রুতি আছে, পরিকল্পনা নেই— বাস্তবায়ন তো দূরের কথা! জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলই তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা— সবখানেই প্রতিশ্রুতির ছড়াছড়ি। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবেশ রক্ষার কথাও।
ইশতেহারে বন, নদী, বাতাস, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের অঙ্গীকার নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু প্রশ্ন একটাই— এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের রূপরেখা কোথায়?
পরিকল্পনা নেই, সময়সীমা নেই, দায়বদ্ধতার কাঠামো নেই— শুধু কথার ফুলঝুরি।
বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ প্রায় সব দলের ইশতেহারে রয়েছে পরিচিত কিছু বাক্য: নদী বাঁচাতে আইন প্রয়োগ হবে, কার্বন বাণিজ্য চালু হবে, প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করা হবে, শিল্পকারখানায় দূষণ রোধে বাধ্যতামূলক ইটিপি চালু থাকবে— এই ‘ব্লা… ব্লা… ব্লা’ বহু বছর ধরেই শোনা যাচ্ছে। বাস্তবে ফলাফল শূন্যের কোঠায়।
নদীখেকো–দখলদারদের অর্থেই চলে রাজনীতি: বাংলাদেশে ১১শোর বেশি নদী দখল করে রেখেছে প্রায় এক লাখ দখলদার। নদীর প্লাবনভূমি, সংযোগ খাল দখল করে গড়ে উঠেছে মার্কেট, গুদামঘর, বাগানবাড়ি, পিকনিক স্পট। নদীর বুকে ড্রেজারের পাইপ ঢুকিয়ে নির্বিচারে তোলা হচ্ছে বালু।
প্রশ্ন হলো— কারা করছে এসব?
সাধারণ মানুষ নয়....! এই দখলদারদের বড় অংশই...রাজনৈতিক অর্থনীতির অংশীদার। তারাই রাজনৈতিক দলের মিছিল-মিটিংয়ের খরচ জোগায়, নির্বাচনের অর্থ দেয়— যাকে ভদ্র ভাষায় বলা হয় ‘ডোনেশন’।
এই অর্থই ভবিষ্যতের নদী দখলের বিনিয়োগ।
তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়— আপনার দল কি পারবে নিজের অর্থদাতাদের হাত থেকেই নদী উদ্ধার করতে?
বনভূমি: দখলমুক্তির কোনো অঙ্গীকার নেই। বাংলাদেশে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার একর সংরক্ষিত বনভূমি রয়েছে। এর মধ্যে ৮৮ হাজার একরের বেশি দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে। এই দখলদারদের মধ্যে আছে রাষ্ট্রীয় সংস্থা, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক শক্তি।
কিন্তু কোনো দলের ইশতেহারেই নেই স্পষ্ট ঘোষণা— রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও দলীয় নেতাকর্মীদের হাত থেকে বনভূমি দখলমুক্ত করা হবে। এই নীরবতাই সবচেয়ে বড় স্বীকারোক্তি।
সংকটে সুন্দরবন: বনদস্যুদের রাজনৈতিক ছায়া। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের প্রধান শত্রু বনদস্যুরা। মাছ ডাকাতি, হরিণ, বাঘসহ বন্যপ্রাণী শিকার—সবই নিয়ন্ত্রিত হয় মাছের আড়ত ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে। এই চক্রের গডফাদাররা খুলনা বিভাগের রাজনৈতিক শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা। ডাকাতির ভাগ রাজধানী পর্যন্ত পৌঁছে।
কিন্তু কোনো দলের ইশতেহারেই নেই— এই বনদস্যুদের পুনর্বাসন, বিকল্প কর্মসংস্থান বা মূল চক্র ভাঙার পরিকল্পনা।
উপকূলীয় নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি: উপেক্ষিত মানবিক সংকট....! নারীরা গলা সমান পানিতে দাঁড়িয়ে সারাদিন চিংড়ি পোনা ধরে। এর ফলে ঋতুচক্রে মারাত্মক প্রভাব, বন্ধ্যাত্ব, চর্মরোগ ভয়াবহভাবে বাড়ছে। প্রায় প্রতিটি ঘরেই রোগাক্রান্ত নারী— ভবিষ্যৎ একেবারেই অনিশ্চিত। বিকল্প কর্মসংস্থান নেই।
মোংলার ইপিজেডে সীমিত কর্মসংস্থান থাকলেও স্থানীয় নারীরা যুক্ত হতে পারছে না। কোনো ইশতেহারে নেই এই নারীদের জন্য টেকসই বিকল্প জীবিকার পরিকল্পনা।
বাগেরহাটের নারিকেল শিল্প ধ্বংসের রাজনীতি ও অর্থনীতি: ভারতীয় তেলে ব্র্যান্ডের বাজার উন্মুক্ত করতে বাগেরহাটের স্থানীয় নারিকেল তেল কারখানাগুলো বন্ধ করা হয়।
বন্ধ হয়েছে ৯৯টি অটো কোকোনাট অয়েল মিল। ৭০ ভাগ উৎপাদন কমে যাওয়ায় ৪ লক্ষাধিক মানুষ জীবিকা হারিয়েছে।
অথচ বিশ্ববাজারে এখন নারিকেল ছোবড়ার বহুমুখী ব্যবহার— ইন্টেরিয়র পণ্য, জুতা, সৌখিন সামগ্রী, ক্রিকেট পিচ, নির্মাণ সামগ্রী— চাহিদা আকাশচুম্বী।
এখানে নারিকেল বাগান পুনর্গঠন মানেই উপকূলীয় অঞ্চলের বিকল্প অর্থনীতি সৃষ্টি। কিন্তু ইশতেহারে নেই এক লাইনও।
পার্বত্য বন: এখানে মাদার ট্রি নেই, বন নেই। ড. আলী রেজা খানের ভাষায়— পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চলে ৩০ বছরের পুরনো কোনো গাছ নেই। সব গাছই ৩০ বছরের কম বয়সী।
প্রশ্ন একটাই— পুরনো গাছ গেল কোথায়? কারা কেটে ‘স’মিলগুলোতে পাঠিয়েছে? এই তথ্য প্রশাসন ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর হাতেই আছে। কিন্তু নীরবতা সর্বত্র। পর্যটনের নামে পাহাড় দখল কেওক্রাডং, সাজেকের পর পাহাড়জুড়ে দখলের বিস্তার। ঢাকা-চট্টগ্রামের পুঁজিশালীদের জন্য পর্যটন ব্যবসার ক্ষেত্র তৈরি করতে উচ্ছেদ করা হচ্ছে আদিবাসীদের।
রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাতেই গড়ে উঠছে অনেক প্রকল্প। ইশতেহারে নেই স্থানীয় জনগোষ্ঠীভিত্তিক পরিবেশবান্ধব পর্যটনের কোনো পরিকল্পনা।
পাহাড়ি কৃষিতে তামাকের আগ্রাসন: বান্দরবানে ৭–৯ হাজার একরের বেশি জমিতে তামাক চাষ। মাতামুহুরি নদী অববাহিকা হয়ে উঠেছে পানিশূন্য। নদী, ঝিরি, ছড়া থেকে পানি তুলে চলছে তামাক চাষ।
ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলনে পাহাড় ক্রমেই মরুভূমির পথে। এখন যুক্ত হয়েছে মহাজনি লিজ বাগানের ব্যবসা— কৃষক ও কৃষি উভয়ই ঝুঁকিতে।
সেন্টমার্টিনে পরিবেশ নয়, ভোটই মুখ্য: “কচ্ছপ তো ভোটার নয়”— এই একটি বাক্যই রাজনৈতিক মানসিকতার নগ্ন প্রকাশ। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের মাস্টারপ্ল্যানে ছিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে স্থানীয়দের দিয়ে পর্যটন পরিচালনার রূপরেখা।
নয় মাস পর্যটন নিষেধাজ্ঞায় ইতিবাচক পরিবেশগত পরিবর্তনও দেখা গেছে। তবু নির্বাচনী ইশতেহারে সেন্টমার্টিন নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই।
পলিথিন নিষেধাজ্ঞা আছে, বিকল্প নেই: ২০০১ সাল থেকে পলিথিন নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে বাজার দখলে। কারণ একটাই— বিকল্প পণ্যের অনুপস্থিতি। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর তৈরি পাতার মোড়ক হতে পারত বড় শিল্পখাত। কর্মসংস্থান, পরিবেশ সুরক্ষা ও অর্থনীতি— তিনটিই লাভবান হতো। কিন্তু কোনো দলই এই সম্ভাবনাকে নীতিতে রূপ দেয়নি।
বন্যপ্রাণী পাচার আন্তর্জাতিক অপরাধ, জাতীয় নীরবতা: ‘ট্রাফিক’-এর তথ্যমতে বছরে ৫০০ কোটি টাকার বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ পাচার হয় বাংলাদেশ থেকে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পাচার রুট হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
২০২৩ সাল থেকে পাখি পাচারের কারণে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে। এই চক্রে বন বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও প্রভাবশালীদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তবুও কোনো ইশতেহারে নেই বন্যপ্রাণী পাচার রোধের নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা।
প্রশিক্ষিত উদ্ধারব্যবস্থা নেই: হাতি, বাঘ, বনবিড়াল মানুষের এলাকায় ঢুকে পড়ছে খাদ্যের সন্ধানে। দ্বন্দ্ব বাড়ছে, প্রাণহানি ঘটছে। কিন্তু নেই প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী বাহিনী, নেই স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক। এ নিয়েও নেই কোনো রাজনৈতিক পরিকল্পনা।
উপসংহার: প্রতিশ্রুতি নয়, নীতিগত সংস্কার দরকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা এখন আর বিলাসিতা নয়— এটি অস্তিত্বের প্রশ্ন। কিন্তু রাজনৈতিক ইশতেহারগুলোতে পরিবেশ শুধু একটি সাজানো অনুচ্ছেদ। গবেষক, বিজ্ঞানী, পরিবেশবিদদের মতামত ছাড়া তৈরি এসব ইশতেহার মূলত পুরোনো ব্যর্থ পথেরই পুনরাবৃত্তি।
প্রশ্ন তাই একটাই— এই ইশতেহারগুলো কি সত্যিই পরিবেশ রক্ষা দলিল, নাকি শুধু ভোটের জন্য তৈরি করা সবুজ মোড়কের রাজনৈতিক ভণ্ডামি?
বিষয়টি কি সত্যিই হাস্যকর নয়.....!
লেখক: পরিবেশ বিষয়ক সাংবাদিক
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]



