অমর একুশে বইমেলা সম্প্রতি শেষ হলো। প্রতিবারই বইমেলা চলাকালে এবং তা শেষ হওয়ার পর মানসম্মত বই বা লেখক নিয়ে এক ধরনের হাহাকার ওঠে। গত কয়েক বছরের ট্রেন্ড এটিই। এবারও উঠেছে বরাবরের মতোই। কেউ বলছেন ভালো লেখক নেই, কেউ বলছেন কেনার মতো মানসম্মত বই নেই, আবার কেউবা দোষ চাপাচ্ছেন প্রকাশনা সংস্থাগুলোর ঘাড়ে! কিন্তু সমস্যা আসলে কোথায়?
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, এ বছর মেলায় প্রায় ৬০ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে। এই তথ্য দিয়েছে অমর একুশে বইমেলার আয়োজক সংস্থা বাংলা একাডেমিই। মেলার শেষ দিনে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব ড. মুজাহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, বইমেলায় গত বছর বই বিক্রি হয়েছিল ৪৭ কোটি টাকার বেশি। সেই হিসাবে গত বছরের তুলনায় বইয়ের বিক্রি বেড়েছে প্রায় ১৩ কোটি টাকার।
এ ছাড়া বাংলা একাডেমির তথ্য অনুযায়ী, এবারের বইমেলায় বই প্রকাশিত হয়েছে ৩ হাজার ৭৫১টি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৭৩০টি। মেলায় গল্পের বই এসেছে ৫২১টি, উপন্যাস ৫৪০টি, কবিতা ১২৬২টি, মুক্তিযুদ্ধ ৬৯টি, বিজ্ঞান ৪৪টি, ভ্রমণ ৬৪টি, ইতিহাস ৫৫টি, ধর্মীয় ৬২টি ও অনুবাদ ৬১টি।
অর্থাৎ, হিসাব দেখলে বলতেই হবে যে, এ দেশের মানুষের বইপ্রীতি অবশ্যই বেড়েছে। কারণ, তা না হলে আর গত বছরের তুলনায় বিক্রি বাড়বে কেন, বই প্রকাশের সংখ্যাও–বা বাড়বে কেন? সুতরাং গাণিতিক হিসাবে বলাই যায় যে, এ দেশে বইয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। তবে করোনার আগের বছরগুলোতে ফিরে গেলে আবার দেখা যাবে, এই আগ্রহ প্রচণ্ডভাবে কমে গেছে।
সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ২০২০ সালে অমর একুশে বইমেলায় বই বিক্রিতে নতুন রেকর্ড হয়েছিল। সেবার ৮২ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছিল বলে জানিয়েছিল বাংলা একাডেমি। এবার টানা কয়েক বছরের হিসাব জানা যাক। বাংলা একাডেমির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বইমেলায় বিক্রির পরিমাণ ছিল ৮০ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে ছিল ৭০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ২০১৭ সালে বই বিক্রি হয়েছিল ৬৫ কোটি ৪০ লাখ টাকার। ২০১৬ সালে ছিল ৪০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ২০১৫ সালে আরও কম টাকার বই বিক্রি হয়েছিল, পরিমাণটি ছিল ২১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। আর ২০১৪ ও ২০১৩ সালে এই অঙ্কটি ছিল যথাক্রমে সাড়ে ১৬ কোটি এবং ১০ কোটি ১৪ লাখ টাকা।
তবে হ্যাঁ, এটিও ঠিক যে, করোনার পর থেকে মানুষের চিত্তের বিনোদনের উপায়গুলো বদলেছে। মহামারির কাল থেকে সারা বিশ্বেই মানুষ অনেক বেশি প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস–২০২২–এও আপনি এর প্রমাণ পাবেন। এই জরিপে দেখা গেছে, ২০২২ সালে ৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী ৫৯.৫৮ শতাংশ মানুষ মোবাইল ফোনের ব্যবহারকারী। এই হিসাবের পাশাপাশি আরও দেখা গেছে যে, ৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী জনসংখ্যার ৪১.০২ শতাংশ এবং ১৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী জনসংখ্যার ৪৫.৫০ শতাংশ বিভিন্ন মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। এই দুই ক্ষেত্রেই পল্লির তুলনায় শহরাঞ্চলে এমন হার অনেকটাই বেশি।
অর্থাৎ, একটি বিষয় স্পষ্ট যে, মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহার এ দেশের প্রতি ১০০ জনের মধ্যে প্রায় ৫০ জনের হাতেই পৌঁছে গেছে। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের মানুষও ছোট স্ক্রিনে ইন্টারনেটের বিশাল দুনিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। আর স্ক্রিনে অভিগম্যতার সঙ্গে সঙ্গেই কমেছে ছাপা অক্ষরের সাথে সখ্য। একটা মানুষ তো আর সারা দিন কি মোবাইল, কি বইয়ে বা কি পত্র–পত্রিকার মাধ্যমে শুধু অক্ষর পড়ে কাটাবে না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এক ক্ষেত্রে বেশি সময় দেওয়াটাই অন্য ক্ষেত্রে অমনোযোগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ। ব্যক্তিগতভাবে অনেক প্রকাশকের সঙ্গে কথা বলেও ডিজিটাল মাধ্যমের এই প্রবল প্রতাপ সম্পর্কে বোঝা গেছে। কিন্তু অন্য সব খাত ডিজিটাইজড হওয়ার পথে অল্প–বিস্তর এগিয়ে গেলেও, আমাদের সৃজনশীল পুস্তক প্রকাশনা শিল্প এ ক্ষেত্রে সেভাবে এগোয়নি। ই–বুকের বাজার আমরা এখনো সেভাবে তৈরিই করতে পারিনি, ধরা তো পরের কথা। এটি শিল্পসংশ্লিষ্ট একটি বড় ব্যর্থতা বলেও ধরে নেওয়া যায়। আমরা এ ক্ষেত্রে ডিজিটাইজেশন বলতে বুঝেছি শুধু অনলাইনে বই বেচাকেনাকেই। তাতে তেলের খরচ বাঁচে বটে, কিন্তু জ্ঞানবিস্তারে বা বইয়ে থাকা কনটেন্টকে মানুষের চোখের সামনে আক্ষরিক অর্থে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়।
এই যেমন, এখন কেউ কেউ বলেই বসেন—‘আগে কীসব বই লেখা হতো। আর এখন…ছ্যা ছ্যা!’ কথা হলো, এই যে এবারের বইমেলায় ৩ হাজার ৭৫১টি বই প্রকাশিত হলো, তার মধ্যে ৫০টি বইও কি মানসম্মত নয়? সেই ৫০টি বইও কি ‘ছ্যা ছ্যা’ বলা মন্তব্যকারী পড়েছেন, বা পড়ার জন্য সংগ্রহ করেছেন? বইমেলার মাঝপথেই যারা তিশা–মুশতাক বা হিরো আলমের বই বের করাকেই উত্তম উদাহরণ হিসেবে মেনে নিয়ে আলটপকা মন্তব্য করে বসেন, তাঁদের কাছে অবশ্য এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়াও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। একইসাথে তা ফেসবুকে গালি–উৎপাদনকারীও বটে!
তবে এর মানে এই নয় যে আমাদের লেখককূল ক্ষণে ক্ষণে মেঘনাদবধ কাব্য বা ধূমকেতু বা ক্ষুধিত পাষাণ প্রসব করছেন। এ দেশের বর্তমানের লেখককূলের বেশির ভাগের মধ্যেও ওই ভাসা ভাসা জ্ঞান চর্চা এবং অনুকরণনির্ভর সৃষ্টির প্রবণতা প্রবল। কেউ কেউ তো চাপা মেরেও পার পেয়ে যাচ্ছেন। এ দেশের শিল্প–সাহিত্যের জগতে গোষ্ঠীভিত্তিক দ্বন্দ্ব ও অহেতুক প্রীতির চর্চাও সুবিদিত। ফলে জাতীয় স্তরের সংবাদমাধ্যমেও এমন লেখা পাওয়া যায়, যার বাক্য গঠনই হয়তো ঠিক নয়। কিন্তু লেখকের নামের ভারেই তা ছাপা হয়ে যায় দিব্যি। সংবাদমাধ্যমে প্রায় এক দশক কাজ করার সুবাদেই এমন কারবার চোখের সামনে ঘটতে দেখা গেছে বেশ। বাধা দিয়েও অনেক সময় লাভ হয়নি। কারণ বাক্য গঠনের বা বিতর্কিত কনটেন্টের সমস্যাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে জনপ্রিয় লেখক কাম বড়কর্তার সঙ্গে একসাথে ছবি থাকাটাই যথেষ্ঠ এ দেশে!
মানের প্রসঙ্গে বাংলা একাডেমির দিকেই চলুন চোখ ফেরানো যাক। এবারের বইমেলার শেষের দিনে প্রায় সব সংবাদমাধ্যমেই পুরো মেলার কেনাকাটার হিসাব পাওয়া গেল। মিলল প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা বা সেসবের ধরনও। কিন্তু প্রকাশিত বইয়ের মান নিয়ে কোনো তথ্য আপনি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আতিপাতি করে খুঁজেও পাবেন না। বাংলা একাডেমি এ–সংক্রান্ত একটি হিসাব সাধারণত দেয়। এবার হয়তো এখনো দেয়নি, পরে দেবে। তবে কবে দেবে, কে জানে! কারণ এই মান নিয়ে না লেখক, না প্রকাশক, না বাংলা একাডেমি—কেউই খুব বেশি উৎসুক নয়। বেশির ভাগ প্রকাশকই মানের চেয়ে সংখ্যাকে বেশি গুরুত্ব দেন। জাতি হিসেবেও কি আমরা এখন সেটিই করছি না? ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। যে কেউ যা খুশি লিখে বই প্রকাশ করতে পারছেন। কারণ প্রকাশকদের অনেকে এখন লেখককে সম্মানি দেওয়ার বদলে, কেউ কেউ লেখকের কাছ থেকে সম্মানি নিয়েও যে বই ছাপান! যার টাকা, তারই বই। মান নিয়ে তবে আর টানাহ্যাঁচড়া হবে কেন?
এই প্রসঙ্গে যারা উপরিউক্ত বক্তব্যে আহত হয়ে আমার প্রতি ‘হা…রে রে…’ করে তেড়ে আসার প্রস্তুতি নিতে চাচ্ছেন, তাদের প্রতি একটি অনুরোধ। একবার ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে বলুন তো, এ দেশের কয়টি প্রকাশনা সংস্থা পুরোপুরি পেশাদারভাবে সম্পাদনা বোর্ড চালায় এবং মান অনুযায়ী বই বের করার যাবতীয় ব্যবস্থা সঠিকভাবে নেয়? আবার সেই সঙ্গে লেখকের পাওনার প্রতিও কাচের মতো স্বচ্ছ থাকে? আমি নিশ্চিত, নিরপেক্ষ হলে আপনারা কর গুণেই সেই সংখ্যাটি বের করতে পারবেন। যদিও একুশের বইমেলার বিশাল প্রাঙ্গণে থাকা অজস্র প্রকাশনীর স্টল আপনি সেভাবে গুণে সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে পারবেন না কখনোই।
‘পপকর্ন ব্রেইন’–এর বিষয়টি দিয়েই এ লেখার যবনিকা টানা যাক। আগেই বলে নেওয়া যাক, এটি কোনো মেডিকেল টার্ম নয়। তবে ডিজিটাল যুগে এর ব্যবহার এখন বেশ। সাধারণত সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত সংযুক্ততা বা আসক্তির বিষয়টি থেকেই ‘পপকর্ন ব্রেইন’ ধারণার উৎপত্তি। এটি হলে একজন ব্যক্তি কখনো একটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে বেশিক্ষণ মনযোগ ধরে রাখতে পারে না। কোনো বিষয়ে গভীরভাবে ভাবনা–চিন্তার সামর্থ্যও কমে যায় নিদারুণভাবে। সেই সাথে ব্যক্তির স্ট্রেস ও উদ্বেগ বেড়ে হয়ে পড়ে অনিয়ন্ত্রিত। নিজের অনলাইন উপস্থিতি নিশ্চিত রাখাই তখন আক্রান্ত ব্যক্তির মূল এজেন্ডা হয়ে দাঁড়ায়। বাকি সব চুলোয় যাক!
কি, নিজেদের সঙ্গে মিল পাচ্ছেন নাকি? মাত্রাটা এবার পরিমাপ করে ফেলুন বরং। তবেই বুঝবেন, আমাদের মস্তিষ্ক পপকর্নচালিত কতটা। সেটি মাথায় গেঁথে গেলে অবশ্য তারাপদ রায়ের কবিতায় সুর মিলিয়ে বলতেই হবে যে, ‘…আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে’!
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন