বিশ্বজুড়ে মোদির বন্ধু এখন এরাই?

২০১৪ সাল থেকে একটানা ক্ষমতায় থাকা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আরও এক মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে পারবেন কি না, তা নিয়ে ভারতজুড়ে আলোচনা এখন ‘বায়ুবেগে’ বইছে। লোকসভা নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, মোদিকে নিয়ে আলোচনার পারদ তত চড়ছে। তাঁর জয়ের ব্যাপারে বিজেপি সমর্থকদের বেশ আত্মবিশ্বাসী দেখা যাচ্ছে। অতি আত্মবিশ্বাসের পিঠে সওয়ার হয়ে কেউ কেউ তো ভুলভাল বক্তব্যও দেওয়া শুরু করেছেন।

গতকাল রোববার যেমন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার আবেগের বসে বলে ফেলেছেন—‘চার লাখ এমপি নিয়ে ক্ষমতায় বসতে যাচ্ছেন মোদি!’ তারপর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভুল শুধরে বলেন, ‘না না, চার লাখ নয়, চার হাজার এমপি নিয়ে জয়ী হবেন মোদি।’ কিন্তু এই চার হাজার সংখ্যাটিও যে ভুল, তা বুঝে উঠতে উঠতেই ‘ভাইরাল’ বস্তুতে পরিণত হন নীতিশ। তাঁর ভুল বক্তব্যের ভিডিও ঝড়ের গতিতে ছড়িয়ে পড়ে ইন্টারনেট দুনিয়ায়। আর মানুষের ‘হা হা’ রিঅ্যাক্ট জমতে থাকে সেখানে। কারণ সারা ভারতেই যে চার হাজার নির্বাচনী আসন নেই! দেশটির লোকসভায় সর্বমোট আসনসংখ্যা ৫৪৫টি।

অতি আবেগ ও অতি আত্মবিশ্বাস যে কখনো কখনো বিপদ ডেকে আনে, তার সর্বশেষ উদাহরণ সম্ভবত নীতীশ কুমার। এমন অতি আত্মবিশ্বাস মোদির জন্যও বিপদ ডেকে আনতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। ভারতীয় লেখক অমর্ত্য বন্দোপাধ্যায় তাঁর এক লেখায় বলেছেন, ‘শুধু আত্মবিশ্বাস আর দেশীয় জনপ্রিয়তার খুঁটির ওপর ভর করে ভারতের ক্ষমতায় থাকা যায় না, ক্ষমতায় থাকতে হলে বিদেশি প্রভুদের স্নেহচ্ছায়ারও প্রয়োজন হয় বলে বিশ্বাস করেন অনেকেই।’ সেই ‘সস্নেহ হাত’ কি মোদির কাঁধে রয়েছে? প্রশ্ন তুলেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, আন্তর্জাতিক মহলের বন্ধুদের সঙ্গে মোদির বন্ধন তত আলগা হয়ে পড়ছে।

প্রশ্ন তোলার যথেষ্ঠ কারণও আছে অবশ্য। সম্প্রতি দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সরেনকে গ্রেপ্তার করে জেলখানায় পাঠানো হয়েছে। আদালত তাঁদের জামিনও মঞ্জুর করছেন না। এমন পরিস্থিতিতে প্রথম প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জার্মানি। এরপর জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। প্রত্যেকেই মোদি সরকারের এ আচরণকে ‘অগণতান্ত্রিক’ বলে সাব্যস্ত করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র বিবৃতি দিয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলেছে, ‘কেজরিওয়ালের গ্রেপ্তারের ঘটনার ওপর ‘‘কড়া নজর’’ নজর রাখছে হোয়াইট হাউস। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর আশা করে, অরবিন্দ কেজরিওয়াল স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও সময়-নির্ধারিত বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।’

এরপর দিল্লিতে নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাসের উপ–রাষ্ট্রদূত গ্লোরিয়া বারবেনাকে ডেকে মৃদু ভাষায় ‘আপত্তি’ জানিয়েছে দায় সেরেছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

ভারতের এই মৃদু আপত্তিকে আমেরিকা যে মোটেও গায়ে লাগায়নি, তার প্রমাণ দুদিন বাদেই দিয়েছে বাইডেন প্রশাসন। ভারতের প্রধান বিরোধী দল ন্যাশনাল কংগ্রেসের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার তীব্র সমালোচনা করেছে তারা। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তরফে বলা হয়েছে, নির্বাচনের আগে বিরোধী দলের প্রতি এ ধরনের আচরণ ‘অগণতান্ত্রিক’।

পরিস্থিতি সামাল দিতে তড়িঘড়ি মাঠে নামেন ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তিনি বলেন, ‘কোনও দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অন্য কোনও দেশের অযাচিত নাক গলানো অমর্যাদাকর।’

কিন্তু জয়শঙ্কর হয়তো ভুলে গেছেন, ২০১৯ সালে আমেরিকার টেক্সাসে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, ‘অব কি বার ট্রাম্প সরকার’। তার কিছু দিন পর ২০২০ সালে ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। অন্য একটি দেশের জাতীয় নির্বাচনের আগে সেই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে মন্তব্য করা কি অমর্যাদাকর ছিল না?

এরপর কানাডায় হরদীপ সিং নিজ্জার ও গুরপতওয়ান্ত সিং পান্নু হত্যার ঘটনায়ও মোদি বেশ চাপের মধ্যে রয়েছেন। কানাডা সরকার মোদির মাথার ওপর থেকে বন্ধুত্বের ছাতা যে ক্ষণিকের জন্য হলেও সরিয়ে নিয়েছে, তা মোটামুটি স্পষ্ট। কানাডা সরাসরি অভিযোগ করে বলেছে, কানাডীয় নাগরিক হরদীপ সিং নিজ্জার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত। এ ঘটনার অবশ্যই বিচার করা হবে এবং কাউকে ক্ষমা করা হবে না।

এদিকে প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরও গুরুতর অভিযোগ তুলেছে। দ্য গার্ডিয়ান বলছে, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা পাশের দেশ পাকিস্তানেও একাধিক গুপ্তহত্যা ঘটিয়েছে বলে যথেষ্ট সন্দেহের কারণ রয়েছে।

এসবের বাইরে, বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) কার্যকর করা নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলের তোপের মুখে রয়েছে মোদি সরকার। জাতিসংঘ তো বটেই, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও বলেছে, এ আইন বৈষম্যমূলক।

মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র ম্যাথু মিলার সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ভারত কোন প্রক্রিয়ায় সিএএ আইন কার্যকর করে, সেই প্রক্রিয়ার ওপর আমরা কড়া নজর রাখব। কারণ আমেরিকা বিশ্বাস করে, ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা ও আইনের চোখে সকল সম্প্রদায়ের সমানাধিকার গণতন্ত্রের মৌলিক ধারণা।’

ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এরিক গারসেত্তিও মিলারের সুরে কথা বলেছেন। দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আদর্শের প্রশ্নে আমেরিকা কখনো আপস করে না। যত কাছের বন্ধু কিংবা যত দূরের বন্ধুর কাছ থেকেই এ ধরনের প্রস্তাব আসুক না কেন, মৌলিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রে কোনও আপস সম্ভব নয়।’

বাইডেনের বিরাগভাজন হওয়ার আরও বেশ কিছু কারণ রয়েছে মোদির। যেমন রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ ইস্যুতে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে রয়েছেন মোদি। এমনকি রাশিয়ার ওপর আমেরিকা যেখানে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে, সেখানে মোদি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করেছেন। এসব আচরণ বাইডেনের পছন্দ হওয়ার কোনো কারণ নেই।

এসবের বাইরেও গণতন্ত্র-হত্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার, সংবিধানের অসম্মান, সংবাদমাধ্যমের উপর হামলা ইত্যাদি ইস্যুতে বেশ কয়েক বছর ধরেই আন্তর্জাতিক সমীক্ষাগুলোর তলানির দিকে দেখা যাচ্ছে ভারতের নাম। এসব নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে প্রতিনিয়ত সমালোচনার তীরবিদ্ধ হচ্ছেন মোদি।

সুতরাং, এত সমালোচনা কি সইতে পারবেন নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি? বিশ্বজুড়ে এখন তাঁর বন্ধু কারা? আমেরিকায় ট্রাম্প, ফ্রান্সে লা পেন আর ব্রাজিলে বলসোনারো। এরা প্রত্যেকেই বিশ্বব্যাপী উগ্র ডানপন্থী, একরোখা ও স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতার হিসেবে পরিচিত। আর এরা প্রত্যেকেই এখন ক্ষমতা থেকে দূরে। সুতরাং এই সমস্ত সমালোচনা উতরে আসন্ন নির্বাচনে মোদি তাঁর চিরারচিত ‘ম্যাজিক’ দেখাতে পারবেন কি না, সেটিই দেখার বিষয়।

লেখক: সহ–সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন