ভিডিওর ডিক্টেটর, বাস্তবের স্বৈরাচার!

কালজয়ী অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিনের বিখ্যাত সিনেমা ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’। সিনেমার লেখক, পরিচালক, প্রযোজক, মুখ্য চরিত্র—সব জায়গায় তিনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে হিটলার আর মুসোলিনির স্বৈরাচারী কার্যকলাপে ইউরোপজুড়ে যখন থরহরি কম্প, তখন; অর্থাৎ, ১৯৪০ সালে হলিউডে চ্যাপলিন জন্ম দিলেন তাঁর এই অমর সৃষ্টির। এই সিনেমায় চ্যাপলিনের মুখে সাড়ে তিন মিনিটের একটা ভাষণ আছে, যেটা সাধারণ সেনা সদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া। এই ভাষণের বয়ান বঙ্গানুবাদ আকারে পুরোপুরি নিচে তুলে ধরা হলো। বৈশ্বিক চিত্র ও রাজনীতি একটু খেয়াল করলে বোঝা যায় ৮৪ বছর পরও ভাষণটি এখনো কত প্রাসঙ্গিক। চাইলে শুধু দেশকাল পাল্টে পড়ে দেখতে পারেন।

‘আমি দুঃখিত, কিন্তু আমি সম্রাট হতে চাই না। এটা আমার কাজ না। আমি কাউকে শাসন করতে বা বশীভূত করতে চাই না। আমি সবাইকে সাহায্য করতে চাই—যদি সম্ভব হয়—ইহুদি, বিধর্মী, কালো বা সাদা মানুষ। আমরা সবাই একে–অপরকে সাহায্য করতে চাই। মানুষ এমনই হয়। আমরা একে–অপরের সুখে বাঁচতে চাই, একে–অপরের দুঃখে নয়। আমরা একে–অপরকে ঘৃণা ও অবজ্ঞা করতে চাই না। এই পৃথিবীতে সবার জন্য জায়গা আছে। এবং এই ভালো পৃথিবী সমৃদ্ধ এবং প্রত্যেককেই এর দেওয়ার কিছু আছে। জীবন চলার পথ মুক্ত ও সুন্দর হতে পারে, কিন্তু আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি।’

‘লোভ মানুষের আত্মাকে বিষিয়ে তুলেছে। বিশ্বে ঘৃণার প্রাচীর খাড়া করেছে। আমাদের দুঃখ ও রক্তক্ষয়ের মধ্যে এনে ফেলেছে। আমরা বেগবান হয়েছি, কিন্তু নিজেদের রুদ্ধ করে। প্রাচুর্যদানকারী যন্ত্রপাতি আমাদের অভাবের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। আমাদের জ্ঞান আমাদের নিষ্ঠুর করে তুলেছে। আমাদের চতুরতা কঠোর ও নির্দয়। আমরা চিন্তা করি বেশি, অনুভব করি কম। যন্ত্রের চেয়েও আমাদের মানবিকতার প্রয়োজন। চালাকির চেয়ে দরকার উদারতা ও নম্রতা। এসব ছাড়া জীবন সহিংস হয়ে উঠবে। আমরা হারিয়ে যাব।’

‘উড়োজাহাজ ও রেডিও আমাদের কাছে এনেছে। এই উদ্ভাবন সাধনের মাধ্যমে মানুষের ভালো দিক এবং সর্বজনীন ভ্রাতৃত্বের কথা জোর দিয়ে বলা যাবে, সকলের ঐক্যের জন্য। এমনকি এখন আমার কণ্ঠ সারা বিশ্বে লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে, যারা হতাশাগ্রস্ত পুরুষ, নারী ও ছোট শিশু, যারা এই ব্যবস্থার শিকার, যা লোকেদের নির্যাতক বানায় এবং নিরাপরাধ মানুষকে বন্দী করে।’

‘যারা আমার কথা শুনতে পাচ্ছে, তাদের বলছি—হতাশ হবেন না। এখন আমাদের ওপর দুর্দশার যে পাহাড় রয়েছে, তা কেবল সেই সব মানুষের ধূর্ততা ও তিক্ততার জন্য, যারা মানুষের অগ্রগতিকে ভয় করে। মানুষের মধ্য থেকে ঘৃণা দূরিভূত হবে। স্বৈরশাসকদের মৃত্যু হবে। তারা জনগণের কাছ থেকে যে ক্ষমতা নিয়েছিল, তা জনগণের কাছেই ফিরে আসবে। আর যতদিন মানুষ প্রাণ দিয়ে যাবে, ততদিন স্বাধীনতা ধ্বংস হবে না।’

‘সৈনিক ভাইয়েরা, নিজেদেরকে বর্বরদের হাতে তুলে দেবেন না। এরা আপনাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, দাস করে রাখতে চায়, আপনার জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, আপনাকে কী করতে হবে-কী ভাবতে হবে-কী অনুভব করতে হবে, তা ঠিক করে দিতে চায়! কে তোমাকে দেখাশোনা করে, খাবার দেয়, গবাদি পশুর মতো ব্যবহার করে, কামান-পশুর মতো ব্যবহার করে? নিজেকে এই অপ্রাকৃতস্থ লোকদের বা যন্ত্রদানবদের হাতে তুলে দেবেন না, যাদের মন ও হৃদয়–দুটোই যন্ত্রের মতো। কিন্তু তোমরা তো মেশিন না! পশু না! তুমি মানুষ! তোমাদের হৃদয়ে মানবতার জন্য ভালোবাসা আছে! তুমি (কাউকে) ঘৃণা করো না! প্রেমহীন ঘৃণা– যা শুধু ভালোবাসাহীন ও অস্বাভাবিক। সৈনিক ভাইয়েরা, দাসত্বের জন্য নয়, মুক্তির জন্য লড়ো!’

‘সেন্ট লুকের ১৭তম অধ্যায়ে লেখা আছে: “ঈশ্বরের রাজ্য মানুষের মধ্যেই থাকে।” তা একজন মানুষ বা কোনো গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষের মধ্যে না, সব মানুষের মধ্যে! তুমি, তুমি তোমরা সাধারণ মানুষ; তোমাদের ক্ষমতা আছে, যন্ত্র তৈরির ক্ষমতা আছে। এই ক্ষমতাই সুখের উৎস। তোমরা জনগণ, তোমাদের ক্ষমতা আছে এই জীবনকে মুক্ত ও সুন্দর করার। এই জীবনকে একটি দুর্দান্ত উপভোগ্য করার।’

‘তারপর গণতন্ত্রের নামে, এসো সেই শক্তি ব্যবহার করি, আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হই। এসো আমরা একটি নতুন বিশ্বের জন্য লড়াই করি। একটি শালীন বিশ্বের জন্য যা মানুষকে কাজ করার সুযোগ দেবে, তরুণদের দেবে ভবিষ্যৎ এবং বয়স্কদের দেবে নিরাপত্তা। এসবের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিষ্ঠুর শাসকেরা ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু তারা মিথ্যা বলেছে! তারা সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করে না। তারা কখনোই করবে না!’

‘স্বৈরাচারীরা নিজেদের মুক্ত রেখে জনগণকে দাস করে! এবার এসো সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের লড়াই করি! এসো আমরা বিশ্বকে মুক্ত করতে লড়াই করি। চলো লড়াই করি জাতীয় বাধা দূর করার, লোভ, ঘৃণা ও অসহিষ্ণুতা দূর করার। এসো আমরা যুক্তির জগতের জন্য লড়াই করি। এমন একটি বিশ্ব গড়ে তোলার জন্য লড়ি, যেখানে বিজ্ঞান ও অগ্রগতি সব মানুষকে সুখী করবে। সৈনিক ভাইয়েরা, এসো গণতন্ত্রের নামে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হই!’

চ্যাপলিনের এই সিনেমার প্রসঙ্গ মনে এল সম্প্রতি ইউটিউবে ভারতের নির্বাচন নিয়ে তৈরি একটি ভিডিও দেখে। ‘ডরা হুয়া ডিক্টেটর’; অর্থাৎ, ‘ভয় পেয়েছে স্বৈরশাসক’ নামে তৈরি ভিডিওটি গত ১১ দিনে ২ কোটি ৭০ লাখবার দেখা হয়েছে। ভিডিওটি তৈরি করেছেন ধ্রুব রাঠী নামে একজন তরুণ, যার বয়স ২৯ বছর। ভিডিও কনটেন্ট প্রস্তুতকারী হিসেবে ধ্রুব এমনিতেই বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু এই বিশেষ ভিডিওটি তাঁকে সেলিব্রিটির মর্যাদা দিয়েছে। ভারতের মূলধারার গণমাধ্যম, যারা মোদি সরকারের কাছে সাংবাদিকতার সবকিছু হারিয়েছে, এবং যে কথা বলার সাহস তারা রাখে না, সেটা বলেছেন ধ্রুব। তিনি জানেন, তার পরিণতি কী হতে পারে। কিন্তু কোনো কিছুকে পরোয়া করেননি তিনি। এ জন্য এখন দেশ-বিদেশ থেকে জনপ্রিয় ইউটিউবার বা ভিডিও কনটেন্ট প্রস্তুতকারীরা তাঁর সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে দেখা যাক ধ্রুব রাঠী কে? ধ্রুবর জন্ম ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের রোহতকে। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশোনা দিল্লিতে। এরপর জার্মানিতে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক। পরে রিনিউয়েবল এনার্জির ওপর স্নাকতোত্তর। এত পড়াশোনা করে কী লাভ হলো? কাজে লাগল না। তাঁর ইচ্ছা, শিক্ষাবিষয়ক ভিডিও কনটেন্ট বানাবেন। তিনি শিক্ষার ওপর কনটেন্ট বানান, যা পয়সা দিয়ে শুনতে বা দেখতে হয়। তাঁর ইউটিউব চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ১ কোটি ৭৫ লাখ (১৩ এপ্রিল, ২০২৪ পর্যন্ত)। তাঁর ১০-১৫ জনের একটা টিম আছে। 

ভারতে আগামী ১৯ এপ্রিল থেকে লোকসভা নির্বাচন শুরু। আলোচিত এই ভিডিওতে ধ্রুব রাজনীতির এই মুহূর্তের সবচেয়ে আলোচিত কিছু দিক তুলে ধরেছেন। সেই সাথে মোদি সরকার রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে যে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছে, তা সহজ ভাষায় প্রমাণসহ তুলে ধরেছেন। ভবিষ্যতের ভারত স্বৈরশাসনের দিকে এগোচ্ছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। চ্যাপলিনের মতো একইভাবে দেশের সাধারণ মানুষকে সচেতন হয়ে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। যাতে দেশ স্বৈরশাসনের কবলে না পড়ে। 

‘ডরা হুয়া ডিক্টেটর’—এই ভিডিওতে ধ্রুব রাঠী, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের গ্রেপ্তার, নির্বাচনী বন্ড কেলেঙ্কারি, ভোটের আগে মোদির ইচ্ছানুসারে নতুন দুই নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ, প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের সব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ ও ১৭০০ কোটি রুপি জরিমানা, টাকা খরচ করেও কংগ্রেসের বিজ্ঞাপন মূলধারার খবরের কাগজে ছাপতে না পারা, ইডি বা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের আইনে বদল, সংবাদমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক দল ভাঙা-গড়া—এসবই ছিল বিষয়। এর কোনোটাই ভারতের রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়। ধ্রুব শুধু এটাকে একসূত্রে গেঁথেছেন এবং এর প্রত্যেকটির অভিষ্ঠ লক্ষ্য যে এক—সেটাই বলার চেষ্টা করেছেন।

ধ্রুবর সাথে আকাশ ব্যানার্জির সাক্ষাৎকার। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়াএই ভিডিও প্রকাশের পর ‘দেশভক্ত’ আকাশ ব্যানার্জি ধ্রুবর প্রায় ঘণ্টাব্যাপী সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। সাত দিনে ওই সাক্ষাৎকার দেখা হয়েছে ৭৯ লাখবার। বিখ্যাত টিভি আলোচক করণ থাপার তাঁর শো-তে আলোচনার জন্য ডেকেছেন ধ্রুব রাঠীকে। তিন দিনে তা দেখা হয়েছে ১৫ লাখবার। বোঝাই যাচ্ছে ধ্রুব রাঠীর একটি সাহসী ভিডিও কী পরিমাণে প্রভাব ফেলেছে।

এরই মধ্যে করণ থাপার কথা বলেছেন নরেন্দ্র মোদি সরকারের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণের স্বামী পারাকেল প্রভাকারের সাথে। সেখানে অর্থনীতিবিদ পারাকেল প্রভাকর যা বলেছেন, তার মোদ্দ কথা হলো: নরেন্দ্র মোদি একজন স্বৈরশাসক; তিনি গণতন্ত্রী নন। প্রধানমন্ত্রী মোদি ভারতের অর্থনীতিকে অন্তত ২০-২৫ বছর পিছিয়ে দিয়েছেন। রাজনীতিকে তিনি স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন। সামাজিক ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য, বৈজ্ঞানিক ধ্যানধারণা, সামাজিক মূল্যবোধ—এসব বিষয়ে তিনি ভারতকে মধ্যযুগে নিয়ে গেছেন। তাই এই সরকারের, যাদের ট্র্যাক রেকর্ড এমনই, তারা ক্ষমতায় ফিরে এলে তা হবে বিপর্যয়কর।

পারাকেল প্রভাকার। ছবি: এক্স থেকে নেওয়াঅন্ধ্রপ্রদেশের তেলুগু ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম হওয়া পারাকেল প্রভাকর একজন পলিটিক্যাল ইকনোমিস্ট হিসেবে পরিচিত। বিখ্যাত লন্ডন স্কুল অব ইকনোমিকস থেকে পিএইচডি ডিগ্রিধারী এই প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ প্রথম থেকেই মোদি সরকারের আর্থিক নীতিসহ অন্যান্য নীতির কঠোর সমালোচক। এখানে তাঁর বড় পরিচয় হয়ে গেছে মোদি সরকারের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামণ তাঁর স্ত্রী।

দৃশ্যত, সমাজের বিভিন্ন অংশ থেকে ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে নরেন্দ্র মোদি বা তাঁর সরকারের দিকে যেভাবে স্বৈরাচারের তির ছুটে আসছে, সেটাকে আগামী ৬৩ দিনে মোদি বা তাঁর দল কীভাবে মোকাবিলা করেন—সেটাই দেখার।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন