একটি ইটভাটা। সেখানে দিন নেই, রাত নেই—স্থানীয় সবাই মাটি খুঁড়ছে। তাও আবার ভাটায় ইট তৈরির কাজে ব্যবহার করার জন্য মাটি। গুজব ছড়িয়েছে, ওই মাটি খুঁড়লেই নাকি সোনা মিলছে! আর তাতেই শয়ে শয়ে বা মতান্তরে হাজার হাজার মানুষের ভিড়, কোদাল–শাবল হাতে। দিনের আলো ফুরিয়ে গেলেও রাতের অন্ধকারে টর্চ লাইট বা মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইটের আলোতেও চলতে সোনা খোঁজার অভিযান!
ঠাকুরগাঁও জেলার রানীশংকৈল উপজেলার কাতিহার এলাকায় এমন ঘটনা ঘটেছে সম্প্রতি। পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল যে শেষে ওই ইটভাটায় ১৪৪ ধারা জারি করতে হয়েছে প্রশাসনকে। স্থানীয় হুজুগে মানুষদের দাবি, কেউ কেউ নাকি আসলেই সোনা পেয়েছেন। কিন্তু এখন প্রশাসনের জব্দ করার ভয়ে স্বীকার করছেন না। আর এ কারণেই অন্যরাও সেই ইটভাটার মাটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছেন মুফতে সোনা পাওয়ার আশায়।
এখানে একটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো। সেটি হলো–শয়ে শয়ে বা হাজার হাজার মানুষ এই গুপ্তধন পেতে মরিয়া হয়েছেন। শুনেই মাটি খুঁড়তে লেগে পড়েছেন তারা। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত বিভিন্ন ভিডিওচিত্র দেখলেই বোঝা যায়, সেসব গুপ্তধনপ্রত্যাশী মানুষের সোনা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আসলে কতটা! সেসব মানুষের শরীরী ভাষাতেই ওই আকাঙ্ক্ষা ফুটে ওঠে প্রবলভাবে। আর তাতে একটি প্রশ্ন জাগে। এ দেশের মানুষের মুফতে কিছু কামাই করার আগ্রহ আসলে কতটা?
ওপরের ঘটনাটি একেবারে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের। এরা বেশির ভাগই সাধারণ মানুষ। অনেকের হয়তো টানাটানির সংসারও আছে। ফলে শুধু মাটি খুঁড়ে সোনার মালিক হওয়ার সাধ জাগলে, তা অগ্রাহ্য করা কঠিন। কথায় আছে, অভাব নাকি নৈতিকতা ভুলিয়ে দেয়! অতি লোভও দেয় অবশ্য। তখন আর নৈতিকতা মানুষের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। বরং সোনা কেনার টাকা উপার্জনের পরিশ্রম ছাড়াই সোনা পাওয়ার আশায় মন নেচে ওঠে।
যে কোনো ফ্রি বা বিনামূল্যে বা বিনাশ্রমে পেতে সাধারণত মানুষের খুব একটা খারাপ লাগে না। এক্ষেত্রে ব্যক্তির এক ধরনের প্রবৃত্তিও পক্ষে কাজ করে। এই কারণেই মুক্তবাজার অর্থনীতির বাজার ব্যবস্থায় বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো একটি পণ্যের সঙ্গে আরেকটি পণ্য ফ্রি দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করেছে। কারণ মানুষ যখন দেখে একটি কিনে আরেকটি ফ্রি পাচ্ছে, তখন কিনতে উৎসাহিত হয়। হয়তো দেখা যায়, কেনা পণ্যটির দাম বাড়িয়েই বিক্রি করা হচ্ছে। বা পরিমাণে কিছুটা কম দিয়েই ফ্রি দেওয়া হচ্ছে আরেকটি পণ্য। বর্তমান বাজারে কোনো প্রতিষ্ঠান লোকসান করে এক পণ্যের সঙ্গে আরেক পণ্য ফ্রি দেয় না। হয়তো সর্বোচ্চ লাভের অঙ্ক কিছুটা ছেড়ে দেয়। এর চেয়ে বেশি কিছু হয় না। তবুও সাধারণ মানুষ ফ্রি পেতে ওই নির্দিষ্ট পণ্য কিনতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। কারণ মানুষের ওই মুফতে কিছু পাওয়ার আগ্রহকে পুঁজি করা হয় মাত্র।
তবে আমাদের দেশের ঠাকুরগাঁওয়ে যে সোনা খোঁজার গণঅভিযান দেখা গেল, তার আরও ব্যাখ্যা আছে। সাধারণ মানুষের এমন কাজে গা ভাসানোর ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ের কিছু উদাহরণও প্রণোদনা হিসেবে কাজ করে। যখন আপনি দেখবেন কুমিরের খামার দেখিয়ে কোনো এক পি কে হালদার কোটি কোটি টাকা ঋণ তুলে নিয়ে হাপিস, তখন আপনি মানসিকভাবে ধাক্কা খাবেনই। কারণ ওই টাকা ব্যাংক ঋণ হিসেবে দিলেও, আসলে তা এ দেশের সাধারণ মানুষেরই টাকা। ঠিক আপনার না হলেও আপনার পাশের জনের হয়তো। সুতরাং ওই টাকা আসলে মুফতেই অর্জন করেছেন পি কে হালদার। এবং নিশ্চয়ই তার অনেকাংশ একটা সময় ভোগও করেছেন।
বুঝুন তবে! এটাকে বলে সত্যিকারের ‘মুফতে’ টাকা কামানো। একেবারে কাঁচা টাকা, গরম গরম কারও কারও পকেটে এসে ঢুকছে এভাবে, কোনো কষ্ট ছাড়াই। স্রেফ, একটু বুদ্ধি খাটিয়ে অন্যের পকেট কাটার ব্যবস্থাটুকু করতে হবে কেবল। ফ্রি-তে এভাবে টাকা পেতে চাইলে এতটুকু বুদ্ধি খরচ তো করতেই হবে। যে দুনিয়া, এতটুকু বুদ্ধি না খাটালে কি চলে?
মুফতে পাওয়া টাকার রঙ কি হয়? সাদা যে হয় না, তা নিশ্চিত। আর কালো হলেও ক্ষতি কিছু নেই। কারণ কালো টাকার মালিকদের আবারও ক্ষমার সুযোগ দিচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে আসন্ন বাজেটে কর বাড়ছে পাঁচ শতাংশ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী অর্থবছরে ১৫ শতাংশ কর দিয়ে অবৈধ অর্থ-সম্পদ বৈধ করা যাবে। যা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবে না কোনো সংস্থা।
তো, এমন উদাহরণ যখন চোখের সামনে থাকে, তখন ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলার কাতিহার এলাকার সোনা খোঁজা মানুষের আর কি দোষ! ওপরের ঘটনাগুলো দেখতে দেখতেই হয়তো তাঁরা ভেবে নিয়েছেন যে, মুফতে পাওয়া অনৈতিক নয় মোটেও। তাই সোনা খুঁজতে ইটভাটার মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে জান কয়লা করে ফেলেছেন। ভেবেছেন, সোনা পেলেই কেল্লা ফতে!
কথা হলো, এদের নাহয় ১৪৪ ধারা জারি করে থামানো গেল। কিন্তু মুফতে হাজার হাজার কোটির হাপিস হওয়া ঠেকানো যাবে কোন ধারায়? আদৌ ঠেকানো যাবে তো? যদিও কথায় আছে, ‘আকলমান্দ কি লিয়ে ইশারাই কাফি হ্যায়’!
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]