ঘরগুলো গেছে আগেই। চার দেয়ালের ভেতর থেকে আসা চিৎকারগুলো দীর্ঘশ্বাসে ঢেকে গিয়েছে কবেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও এখন একই কাতারে। সেখানে লকলকে জিভ বের করে আছে সহপাঠী থেকে শুরু করে শিক্ষকেরা। আর পথ? সে যে নিরাপদ নয়, তা তো কবেই ঘোষিত হয়েছে। চলন্ত বাস, থেমে থাকা বাসে ধর্ষণের ঘটনা শিরোনাম হয়েছে বছর গড়ালো। এবার আবার চলন্ত ট্রেনে ধর্ষণের ঘটনা সামনে এল। আর কী বাকি থাকে তবে?
নারী নিপীড়নের খবর এবং এর প্রতিবাদ সবই যেন ডালভাত হয়ে গেছে এ দেশে। যৌন হেনস্তা, ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা এখন এতটাই যে ইভটিজিং, মানসিক নির্যাতন, মারধর–এসব কিছু আর ধর্তব্যেই পড়ে না। যেন এগুলো কিছুই নয়। প্রতি মাসে দেশের নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো নারী নিপীড়নের একটি হিসাব তুলে ধরে। এই হিসাব তারা দেয় সাধারণত সংবাদমাধ্যমে আসা খবরগুলোকে আমলে নিয়ে। আর বাংলাদেশ পুলিশ একই ধরনের হিসাব দেয় থানায় করা অভিযোগের ভিত্তিতে। এই হিসাবের বাইরেও বহু বহু ঘটনা থেকে যায়–এতে কোনো সন্দেহ নেই।
এত এত নিপীড়নের মধ্যে কিছু কিছু ঘটনা একটু নাড়া দেয় বটে। সেটা দেয় আক্রান্তের প্রতি কতটা সমবেদনা থেকে, কতটা ক্ষোভ থেকে আর কতটা বৈচিত্র্যের কারণে–ঠিক করে বলা মুশকিল। না হলে ‘বাঁশবাগানে নিয়ে কিশোরী ধর্ষণ’, ‘প্রেমে ব্যর্থ হয়ে ধর্ষণ’, ‘পাওনা টাকার জন্য দিনের পর দিন ধর্ষণ’, ‘জমি নিয়ে বিরোধের জেরে ধর্ষণ’–গত দুদিনে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এসব খবরও আলোচনার জন্ম দিতে পারত। চাইলে আরও উদাহরণ দেওয়া যাবে। বরং থামা যাক। থেমে এবার ট্রেনে চড়া যাক।
সিলেট থেকে চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেসে হওয়া সর্বশেষ ধর্ষণের ঘটনায় এরই মধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গঠিত হয়েছে তদন্ত কমিটি। রেলের কর্তারা বলছেন, ট্রেনের সেবা নিয়ে অনেক ধরনের অভিযোগ থাকলেও এমন অভিযোগ আগে আসেনি। বলছেন, এটা খুবই গুরুতর। যাত্রীদের নিরাপত্তা তাঁদের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয়। শুনে হয়তো একটু হলেও সান্ত্বনা খুঁজতে ইচ্ছা করবে। কিন্তু দয়া করে তা করতে যাবেন না। হতাশা চেপে ধরবে।
কেন হতাশা? কারণ, ট্রেনের নিরাপত্তা নিয়ে কর্তাদের এমন বক্তব্য বরাবরের মতোই আরেকটি অসত্য বয়ান। কর্তৃপক্ষীয় বয়ানে এমন মিথ্যাচার প্রায়ই করা হয়। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। কেন? কারণ, গত পাঁচ বছরে ট্রেনে এমন অন্তত ১০টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এটা রেলওয়ে পুলিশেরই তথ্য।
রেলওয়ে পুলিশের তথ্য বলছে, ২০১৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১০টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এসবের পেছনে জড়িতদের বেশির ভাগই রেলের কর্মচারী। চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সেপ্রেসের আগে সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছিল চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি। লালমনি এক্সপ্রেসে হওয়া সেই ঘটনায় ধর্ষণের শিকার হয়েছিল ১৩ বছরের এক কিশোরী, যে ছিল শারীরিক প্রতিবন্ধী। ভুল করে ট্রেনে চড়েছিল সে। মূল্য চোকাতে হয়েছিল ধর্ষণের শিকার হয়ে। ধর্ষক কে? অ্যাটেন্ডেন্ট আক্কাস আলী।
এমনকি ধর্ষকের তালিকা থেকে বাদ যাননি স্টেশন মাস্টারও। ২০২০ সালের ২০ জানুয়ারি রাজশাহী রেলস্টেশন মাস্টার মঈন উদ্দীন ধর্ষণ করেন দুই সন্তানের জননীকে। বিভাগীয় ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে ‘শাস্তি’ হয়েছিল তাঁর! ভাববেন না, বিস্ময়চিহ্নটি অভ্যাসবশত দেওয়া। এমনটাই হয়, হরদম। একই বছর ২২ জুন সিরাজগঞ্জের শহীদ ক্যাপ্টেন মনসুর আলী রেলস্টেশন থেকে রাজশাহীতে যাওয়ার পথে আন্তনগর সিল্কসিটি এক্সপ্রেস ট্রেনের টয়লেটে অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীকে মো. মমিনুল ইসলাম (২৬) নামের এক যুবক ধর্ষণের চেষ্টা করে।
২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতি বছরই এক বা একাধিক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে চলন্ত ট্রেনে। ধর্ষক কারা? কখনো সহকারী জেনারেটর অপারেটর, কখনো অ্যাটেনডেন্ট, কখনো অন্য যাত্রী, কখনো সাবেক স্বামী, কখনো ‘বখাটে’, কখনো সৎবাবা, কখনো স্বয়ং স্টেশনমাস্টার। আর সর্বশেষ এল রেলে খাবার সরবরাহের দায়িত্বে থাকা কর্মী। ধর্ষকের পরিচয়ে কী বৈচিত্র্য! তবুও রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম বলছেন, ‘এটা নজির বিহীন’। বাহ, কী চমৎকার!
ধর্ষণের শিকারদের দিকে তাকালে দেখা যাবে নারীর বয়স বা অন্য কোনো পরিচয় এখানে কোনো বিষয় নয়। কোনো বয়স, কোনো পরিচয়, কোনো বেশভুষা–কোনো কিছুই তাকে নিরাপত্তা দিতে পারে না। তারপরও উদয়ন এক্সেপ্রেসের ঘটনার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় রেল কর্তৃপক্ষের প্রশ্ন ছিল–মেয়েটি খাবারের বগিতে কী করছিল? সংবাদমাধ্যমগুলোর ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেজ ঘাটলেই এই বক্তব্যসহ ভিডিও নজরে পড়বে। না, তেমন জোর দিয়ে প্রশ্নটি করা হয়নি। তবে করা হয়েছিল।
অথচ পাল্টা প্রশ্নটি করা হয়নি যে, ভুল করে অথবা জেনেবুঝে খাবারের বগিতে ভ্রমণ করলে কি কোনো নারী ধর্ষণযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন, না হতে পারেন? এরপর তো এমন প্রশ্নও উঠতে পারে যে, উদয়ন এক্সপ্রেসে কী করছিল মেয়েটি? বলা হতে পারে, লালমণি বা অন্য কোনো এক্সপ্রেসের কথাও। বলা হতে পারে রেলস্টেশনের কথাও, যেখানে স্টেশনমাস্টারও ধর্ষকের দলে। এমনকি ট্রেন, এমনকি গোটা রেলওয়ে। বলা হতে পারে যে, নারী কেন পথেই বের হয়? কেন চড়ে বাসে বা ট্রেনে?
এমন প্রশ্ন আমরা আগেও শুনেছি। ধর্ষণের কারণ হিসেবে নারীর পোশাক নিয়ে কত কত টানাটানি হলো এবং এখনো হচ্ছে। কত কত তত্ত্ব এল গেল, যার প্রতিটিতেই ভুক্তভোগী নারীকেই দাঁড় করানো হয়েছে কাঠগড়ায়। এ নিয়ে তোলপাড় হয় সামাজিক মাধ্যম, সংবাদমাধ্যমে। শেষে নজরদারি বাড়ানো, তদন্ত কমিটি গঠন ইত্যাদির মধ্য দিয়ে শেষদৃশ্যে পৌঁছায় ঘটনাগুলো। তারপর আর কোনো দৃশ্য নেই। তারপর আবার নতুন দৃশ্য, আরেকটি ধর্ষণ নিয়ে আলোচনা হয়। তাও যদি তাতে যথেষ্ট ব্যতিক্রমী উপাদান থাকে তবেই। বিশেষজ্ঞরা সিসি ক্যামেরার দাওয়াই হাজির করেন। অথচ একবারও বলা হয় না–ঠিক কত কোটি সিসি ক্যামেরা লাগালে তবে পুরুষ তোমার ধর্ষণ থামবে?
লেখক: ফজলুল কবির, উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]