যেকোনো দেশের জন্যই সংবাদমাধ্যম অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে এটি স্বীকৃত। এই স্বীকৃতির বয়সও অনেক। কারণ, রাষ্ট্রের অন্য স্তম্ভগুলোর অন্দরমহলে ঘটে যাওয়া ঘটন‑অঘটন সম্পর্কে সাধারণ মানুষ জানতে পারে একমাত্র এর মাধ্যমেই। ফলে স্বাভাবিকভাবেই কোনো শাসনব্যবস্থা একচেটিয়া হয়ে ওঠার পথে প্রথম আঘাতটি আসে সংবাদমাধ্যমের ওপরেই।
ফরাসি বিপ্লবের সময় থেকেই সংবাদমাধ্যম রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃত। সে সময় রাষ্ট্রের বাকি তিনটি স্তম্ভের মধ্যে ছিল অভিজাত শ্রেণি, পুরোহিত (খ্রিষ্টান সমাজের বিচারে যাজক শ্রেণি) এবং ব্যবসায়ীসহ সাধারণ নাগরিকেরা। অবশ্য সেই সময়ের বিচারে সাধারণ নাগরিক বলতে এখনকার মতো সর্বসাধারণ বোঝাত না। সেই সাধারণও আসলে ছিল সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণিই। অর্থাৎ, অগণিত সাধারণ এই স্তম্ভের বিচারে বাদই পড়ে গিয়েছিল বলা যায়।
ফলে মহাকাব্যের এই চরিত্র দিয়েও যদি সংবাদ সংগ্রাহক ও প্রচারকের ভূমিকাকে বিশ্লেষণ করা যায়, তবে দেখা যাবে–সংবাদমাধ্যমের আসলে দুই ধরনের ভূমিকা। সংবাদমাধ্যম রাষ্ট্র ও বিশ্বে ঘটে চলা নানা ঘটনা সম্পর্কে যেমন সর্বসাধারণকে অবহিত করে, তেমনি রাষ্ট্রের শীর্ষ মহলকেও অবহিত করে। এর মধ্য দিয়ে শাসকদের পক্ষে যেমন বিভিন্ন নীতি গ্রহণ, বর্জন ও সংশোধন সম্ভব হয়, তেমনি গৃহীত নীতি এবং অতি অবশ্যই দুর্নীতি সম্পর্কিত নানা তথ্য সম্পর্কেও সাধারণ মানুষ অবহিত হতে পারে। ফলে একটা জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার কাঠামো তৈরি হয়। শাসকগোষ্ঠী কোনোভাবে পথ হারালে সাধারণ মানুষ তাকে প্রশ্ন করতে পারে, তার সংশোধনে চাপ প্রয়োগ করতে পারে।
ফলে বোঝাই যাচ্ছে যে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যম কেন গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের হয়ে সংবাদমাধ্যমই তার তথ্যের অধিকারকে নিশ্চিত করে। জবাবাদিহি ও স্বচ্ছতা এবং অতি অবশ্যই সুশাসনের ক্ষেত্রে একটি চাপপ্রয়োগকারী কাঠামো হিসেবে কাজ করে। ফলে বিস্ময়ের কিছু নেই যে, কোনো শাসকগোষ্ঠী যখন একচেটিয়া ক্ষমতার মোহে পড়ে, তখন কেন সে সংবাদমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরতে চায়।
যে প্রক্রিয়ায় এই কাজটি করা হয়, তারও আছে একটি প্রণম্য গতিপথ। প্রথমেই বিরোধী মতের সাথে মেলে বা বিরোধী মতকে শক্তি জোগাতে পারে–এ ধরনের আর্থ‑সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ইত্যাদির প্রকাশের পথ রোধ করা হয়। বিরোধী মতের বুদ্ধিজীবীদের মতামত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের ক্ষেত্রে অদৃশ্য বাধা সৃষ্টি করা হয়। এতে কাজ না হলে সুনির্দিষ্ট সাংবাদিক বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও বিশ্লেষণ হাজির করা ব্যক্তিদের হুমকি‑ধমকি দেওয়া, মামলা দেওয়া ইত্যাদি। এতেও কাজ না হলে সরাসরি কিছু সাংবাদিকের ওপর শারীরিক নিপীড়ন চালানো হয়। শেষের দুটি উপায় অবলম্বনের মধ্য দিয়ে গোটা সাংবাদিক সমাজের সামনে একটি অদৃশ্য সীমারেখা টেনে দেওয়া হয়, যা লঙ্ঘন করলেই বিপদ সুনিশ্চিত। অর্থাৎ, একটি ভয়ের আবহ তৈরি করা হয়।
এর পাশাপাশি চলে আরেকটি কাজ। আর তা হলো–কিছু জনপ্রিয় সংবাদ প্ল্যাটফর্ম কিনে ফেলা, বা বিরোধী মত প্রচারে নিবিষ্ট সংবাদমাধ্যমের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া। পাশাপাশি সাংবাদিক নির্যাতনের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বা গোষ্ঠীগুলোকে এক ধরনের অঘোষিত দায়মুক্তি দেওয়া হয় এ ধরনের শাসনব্যবস্থায়।
গোটা বিশ্বে এখন সাংবাদিক নিপীড়নের দিক থেকে আলোচনায় আছে অর্ধশতাধিক দেশ। এমনকি যে যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ফেরিঅলা, সেই যুক্তরাষ্ট্রেও ফিলিস্তিন‑ইসরায়েল ইস্যুতে সরাসরি প্রশ্ন করার কারণে চাকরি হারাতে হয়েছিল এক সাংবাদিককে। তিনি কাকে প্রশ্ন করেছিলেন? উত্তর হচ্ছে–শান্তিতে নোবেল পাওয়া সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে। যারা ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে আগ্রহী, তারা একটু গুগল করলেই বিস্তারিত পেয়ে যাবেন। কিংবা এখানে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের নামও উল্লেখ করা যেতে পারে, যিনি গোপনীয় তথ্য ফাঁস করার দায়ে দীর্ঘদিন বন্দী থেকে এই সেদিন মুক্তি পেয়েছেন।
ফ্রিডম হাউস বলুন, আর ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিট বলুন বা অন্য যেকোনো সংস্থার সূচকই বলুন–আমেরিকা নিশ্চিতভাবেই গণতন্ত্র সূচকে বেশ ওপরের দিকে থাকা দেশ। সেই দেশেই যখন এ দশা, তখন এসব সূচকে যেসব দেশকে একচেটিয়া শাসন বা একনায়কের শাসনের দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেসব দেশের সাংবাদিকের অবস্থা সহজেই অনুমেয়।
তারপরও কিছু তথ্য দেওয়া যাক। ফ্রিডম হাউসের ২০২৩ সালে পরিচালিত গবেষণায় বলা হয়েছে, নিজ দেশ তো বটেই স্বেচ্ছায় বা বাধ্য হয়ে অন্য দেশে আশ্রয় নেওয়া সাংবাদিকদেরও পিছু ছাড়ছে না বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা একচেটিয়া শাসকেরা। বিশ্বের অন্তত ৩৮টি দেশের সরকার অন্য দেশে আশ্রিত তাদের সাংবাদিককে হত্যার বা শারীরিকভাবে আঘাতের চেষ্টা করেছে গেল কয়েক বছরে। এর মধ্যে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগির কথা নিশ্চয় মনে থাকার কথা সবার।
এসব দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি কী? প্রতি মুহূর্তে দেশগুলোর সাংবাদিককে এক ধরনের ভয়ের পরিবেশে থাকতে হয়। নানা ধরনের হুমকি তাদের জন্য নিত্যকার ঘটনা হয়ে ওঠে। এসব হুমকি যে সরাসরি রাষ্ট্রীয় পদধারী ব্যক্তিদের কাছ থেকে আসে এমন নয়। বরং, একচেটিয়া শাসকদের তৃণমূল পর্যায়ের সহায়ক গোষ্ঠী, যারা মূলত ওপর মহলের লুটপাটের ছিটেফোঁটা পেয়ে নিজেদের তালেবর ভাবতে শুরু করেছে, তাদের দিক থেকেই আসে। সূর্যের চেয়ে বালি গরমের মতো করে, ক্ষমতার উচ্ছিষ্টভোগীরাই এ ক্ষেত্রে আগুয়ান থাকে। আর একচেটিয়া শাসকেরা তাদের দায়মুক্তি দেয় বিচারহীনতার চাদরে ঢেকে।
এ ক্ষেত্রে অজস্র উদাহরণ সামনে হাজির করা যেতে পারে। দেশে বা দেশের বাইরে এমন অজস্র উদাহরণ রয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সর্বশেষ নির্বাচনের সময়ে যে বিষয়টি ভীষণভাবে সামনে আসে, তা হলো–গদি মিডিয়া। হ্যাঁ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমর্থক হিসেবে ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’ হয়ে ওঠা সংবাদমাধ্যমকে চিহ্নিত করতেই এই শব্দবন্ধ চালু হয়েছে ভারতজুড়ে। ভারতে কাজটি সমাধা হয়েছে সংবাদ প্রকাশের পথ বন্ধ করে নয়, বরং একটা ভয়ের আবহ তৈরি করে। কোনো কোনো বড় মিডিয়া হাউস সরকার সমর্থক ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মাধ্যমে কিনে নেওয়া হয়েছে। ফলে খবরের ধরন, উপজীব্য ইত্যাদি সব বদলে গেছে। বাংলাদেশেও কি তা হয়নি? হয়েছে। মুখ্যত কিছু আইনের মারপ্যাঁচে, আর অতি অবশ্যই ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে। আর এই ভয়ের পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে দলীয় লোক, পাণ্ডা যেমন, তেমনি কাজে লাগানো হয়েছে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থাকে।
সেটা কী রকম? ইউনেস্কোর একটি প্রতিবেদনে চোখ বোলানো যাক। এতে বলা হয়েছে, ১৯৯৩ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সারা বিশ্বে ১৬০০‑এর বেশি সাংবাদিককে শুধু সংবাদ প্রকাশের জন্য হত্যা করা হয়েছে। শুধু ২০২০‑২১ সময়েই হত্যা করা হয়েছে ১১৭ সাংবাদিককে। এর মধ্যে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে ৩৮ শতাংশ এবং এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলে হয়েছে ৩২ শতাংশ হত্যাকাণ্ড। এখানে কিন্তু দুর্ঘটনায় মৃত্যুকে গণনায় নেওয়া হয়নি। যদিও সাংবাদিক হত্যায় সড়ক বা এমন দুর্ঘটনাকে একচেটিয়া শাসকদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের নজির আছে।
একচেটিয়া শাসকেরা, আগেই বলা হয়েছে, সংবাদমাধ্যমের টুটি চেপে ধরে মূলত তাদের আর্থিক দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার সম্পর্কিত নানা খবরের মুখ চেপে ধরতে এবং তাদের নানা বাহিনী দ্বারা পরিচালিত নিপীড়ন ও নির্যাতনের খবরের প্রকাশ বন্ধ করতে। আর থাকে সম্মতি উৎপাদন। নিজেদের ক্ষমতার পক্ষে, শাসক গোষ্ঠীর অন্য কোনো বিকল্প যে নেই, তা প্রমাণের লক্ষ্যে চালানো হয় জবরদস্তি প্রচার। ফলে যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের উপকরণ হিসেবে সংবাদমাধ্যমকে সাধারণ মানুষ বিবেচনা করে, তা তার পক্ষে অনেকটাই করা আর সম্ভব হয় না।
এর ফল হিসেবে দুটি ঘটনা ঘটে–এক. বর্তমান যুগে তথ্য যেহেতু পুরোপুরি চাপা দেওয়া সম্ভব হয় না, সেহেতু প্রচলিত সংবাদমাধ্যম জনআস্থা হারিয়ে ফেলে; এবং দুই. সঠিক তথ্যের দরজা বন্ধ হওয়ায় অপতথ্য, গুজব ইত্যাদির জয়জয়কার হয়। ফলে সাধারণ মানুষ এক তথ্যসমুদ্রে গিয়ে হাজির হয়, যেখানে অধিকাংশই অতিরঞ্জিত বা গুজব।
সংবাদমাধ্যমকে হাস্যকর করে তোলার ক্ষেত্রে রীতিমতো ধ্রুপদি উদাহরণ স্থাপন করেছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি নিজেই ‘ফেক নিউজ’ শব্দটি এতবার উচ্চারণ করেছেন এবং এতবার মিথ্যা বলেছেন যে, তা মার্কিন রাজনীতির ইতিহাসেই একটা আলাদা স্থান দখল করেছে। টুইটার প্রেসিডেন্ট হিসেবে খ্যাত ট্রাম্প প্রতিনিয়ত সংবাদমাধ্যমকে আক্রমণ করে গেছেন। প্রেসিডেন্ট স্পিচের মূল মাধ্যম হয়ে উঠেছিল টুইটার। শেষে সেখানেও উসকানি ছড়ানোর অভিযোগে তাঁর অ্যাকাউন্ট সাময়িক বন্ধ করা হলে নিজেই খুলে বসেন আরেকটি সামাজিক মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’। বলে রাখা ভালো–এই ডোনাল্ড ট্রাম্প কিন্তু আরেকবার ওভাল অফিসে বসতে পারেন।
সামাজিক মাধ্যমের এই যুগে রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিদের সামাজিক মাধ্যমে উপস্থিতি নিয়ে এমনিতে সমালোচনার সুযোগ নেই। কিন্তু এটিই আলোচনার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে, যখন সেই সব দেশের রাষ্ট্রপ্রধানেরা সামাজিক মাধ্যমে সরব থাকেন, যারা সংবাদমাধ্যমকে বিতর্কিত করতে নানা মন্তব্য শুধু নয়, এর টুটি চেপে ধরতে নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। এই একই সময়ে সংবাদমাধ্যম যেহেতু যথাযথভাবে সংবাদ পরিবেশনে ব্যর্থ হয়, অথচ সেই সব তথ্যের নানা অপভ্রংশ সামাজিক মাধ্যমে ঘুরে বেড়ায়, আবার যথাযথ তথ্য সেসব প্ল্যাটফর্মেও তুলে ধরার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ওপর একটি অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা জারি থাকে, তখন সাধারণ্যে সংবাদমাধ্যম বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে হাস্যকর বস্তুতে পরিণত হয়।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একচেটিয়া শাসকেরা বা একচেটিয়া শাসক বনতে চাওয়া শাসকগোষ্ঠী ঠিক এই বিষয়টিই চায়। কারণ, সাধারণ মানুষের কাছে সংবাদমাধ্যম যত হাস্যকর হয়ে উঠবে, ততই তাদের শক্তি বাড়বে। যেহেতু জবাবদিহি এবং যথেষ্ট তথ্য‑উপাত্তসহ প্রশ্নের মুখোমুখি তাকে হতে হয় না, সেহেতু সমাজের অন্য সব স্তর থেকে আসা সমালোচনাকে মুচকি হেসে এড়িয়ে যাওয়া সহজ হয়। যেকোনো শাসনব্যবস্থার একচেটিয়া হয়ে ওঠার পথে তাই প্রথম শহীদটি হতে হয় সংবাদমাধ্যম ও সেখানে কাজ করা সাংবাদিকদেরই।
ফজলুল কবির: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]
আগের পর্ব পড়ুন: