নেপালের তরুণেরা ক্ষুব্ধ। ফেসবুক, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম ও স্ন্যাপচ্যাটের মতো প্রথম সারির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তরুণ নেপালিদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। তারা এই প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করে নিজেদের ভেতরে জমে থাকা হতাশা প্রকাশ করে, বন্ধুদের সাথে সংযুক্ত হয় এবং বিশ্বের বাকি অংশের সাথে তাল মিলিয়ে চলে। তারা ইতিমধ্যেই দেশের শোচনীয় স্বাস্থ্য ও শিক্ষাব্যবস্থা এবং ব্যাপক দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি নিয়ে বিরক্ত ও উদ্বিগ্ন–এমনকি অনেকেই দেশে কোনো ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছিল না। তাদের জীবনধারার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠা এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ তাদের হতাশা আরও বাড়িয়ে তুলবে। গত কয়েক দিনে এই সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞা ‘নেপো কিডস’-এর প্রতিও তাদের ক্ষোভ প্রকাশে উদ্বুদ্ধ করেছে। এই ‘নেপো কিডস’ হলো বিশিষ্ট রাজনীতিকদের সেইসব সন্তান, যারা তাদের নিজেদের কোনো অর্জনের জন্য নয়, বরং তাদের মা‑বাবার অবস্থানের কারণে সামাজিক মর্যাদা পেয়েছে। তরুণরা, বা জেন জি-এর সদস্যরা, আজ কাঠমান্ডুর মৈথিঘর মন্ডলে জড়ো হয়ে জানিয়ে দিয়েছে ‘যথেষ্ট হয়েছে’। তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একের পর এক অবিচারকে আর তারা নিঃশব্দে সহ্য করবে না।
এই তরুণদের হালকাভাবে নেওয়াটা সরকারের জন্য হবে বোকামি। এমন স্বতঃস্ফূর্ত তরুণ-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন এমনকি সুপ্রতিষ্ঠিত শাসনকেও উৎখাত করেছে। আমাদের এই অঞ্চলেও এমন উদাহরণ আছে। সবচেয়ে সাম্প্রতিক সময়ের উদাহরণ বাংলাদেশ। এই আন্দোলনগুলোর নিজস্ব শক্তি রয়েছে, যা নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা অসম্ভব। কিন্তু সারা বিশ্বে, তাদের যা উদ্দীপিত করে তা হলো–তরুণদের উদ্বেগ ও আকাঙ্ক্ষার প্রতি ‘শাসনকাঠামো ও ব্যবস্থার’ উদাসীনতা। বাকস্বাধীনতা দমনের প্রাতিষ্ঠানিক প্রচেষ্টা এ ধরনের আন্দোলনকে আরও উসকে দেয়। নেপালি তরুণদের ক্ষোভও বেশ যৌক্তিক। নেপালের আইনি ও সামাজিক বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য সামাজিক মাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলো নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্তটি সরকারি দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক হলেও এর বাস্তবায়ন ছিল সম্পূর্ণ ভুল। প্রথমত, এই প্ল্যাটফর্মগুলোকে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে গৃহীত পদক্ষেপ দিয়ে নিয়ন্ত্রণের বদলে আইনি কাঠামোর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণই যুক্তিযুক্ত হতো। সুপ্রিম কোর্টও সরকারকে এমনটাই বলেছিল। কিন্তু সে রায়কে ক্ষমতাসীন দলগুলো নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করেছে। আইনি কাঠামোয় নিয়ন্ত্রণের বদলে সরকার যেটা করেছে তা হলো সামাজিক মাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলোকে নেপালে নিবন্ধিত হওয়ার শর্ত হিসেবে এমন কিছু বিষয় জুড়ে দেয়, যা তাদের নেপালে নিবন্ধিত হতে নিরুৎসাহিত করে। এ ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ‘সমস্যাজনক বিষয়বস্তু’ অপসারণের একটি বিধানের কথা উল্লেখ করা যায়, যা এসব প্ল্যাটফর্মকে নেপালে নিবন্ধিত হতে নিরুৎসাহিত করেছে। সরকারের এমন অবস্থান নিয়ে অবশ্যই সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় নেপাল এখনও তুলনামূলকভাবে বেশি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ভোগ করে–যা বাকস্বাধীনতার একটি প্রতীক। তবে সামাজিক মাধ্যম ও সংবাদমাধ্যম নিয়ে বিভিন্ন বিধিনিষেধমূলক বিলের কারণে এই অবস্থানও সম্প্রতি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। এবং এ জন্য গত কয়েকটি সরকারকেই দায় নিতে হবে। বিশ্বজুড়ে নানা ঘটনার দিকে তাকালেই প্রমাণ মিলবে যে, বাকস্বাধীনতা আছে বা থাকবে বললেই তা চিরকাল একইভাবে থাকে না। বাকস্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখতে নিরবচ্ছিন্ন সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।
আমরা আশা করি যে, নেপালের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের রক্ষক হিসেবে সরকার বিলম্বে হলেও জনগণের কণ্ঠস্বরকে শুনবে। অর্থাৎ, নেপালের ভবিষ্যৎ নেতা ও নির্মাতা এই আন্দোলনরত তরুণ সমাজের চাওয়া ও উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। দেশের নিয়ম মেনে চলতে অস্বীকারকারী বিদেশি সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপগুলোকে আইনি পরিধির আওতায় আনাকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বলে মনে হতে পারে। এমনকি তা গুরুত্বপূর্ণও। কিন্তু তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের জনগণের, বিশেষত তরুণদের আবেগকে, তাদের আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান করা।
কাঠমান্ডু পোস্ট–এ প্রকাশিত সম্পাদকীয় নিবন্ধটির শিরোনাম ছিল ‘শাটিং অ্যাপস, আনলিশিং অ্যাঙ্গার’। লেখাটি হুবহু ভাষান্তর করা হলো।



