একচেটিয়া শাসন যেভাবে প্রতিক্রিয়াশীলতার জন্ম দেয়একচেটিয়া শাসনের জন্মই হয় পুরো সমাজকে সাদা‑কালোয় বর্গীকরণের মাধ্যমে। এই বর্গীকরণ কিন্তু বহুলকথিত ‘ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট’ ধাঁচে হয় না; হয় ‘ব্ল্যাক অর হোয়াইট’ ধাঁচে। অর্থাৎ, কোনো সম্মীলনের মনোভাব একেবারেই অনুপস্থিত থাকে। মুছে ফেলা হয় সাদা‑কালোর মধ্যবর্তী তাবৎ ধূসর অঞ্চল। পুরো সমাজকে শত্রু ও মিত্রতে বিভাজিত করা হয়। আর এই বিভাজনের রেখার গহীন থেকেই জন্ম নেয় প্রতিক্রিয়াশীলতা।
একচেটিয়া শাসনের অধীনে গোটা সমাজ বহুত্ববাদ থেকে একত্ববাদের দিকে যাত্রা করে। এই একের সাথে না মিললেই যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ‘আক্রমণযোগ্য’ সাব্যস্ত করা হয়। ‘স্বর্ণযুগ’, ‘অভ্যন্তরীণ বা বহিঃশত্রু মোকাবিলা’, ‘জাতীয় গৌরব পুনরুদ্ধার’, ‘দিকে দিকে বিজয় পতাকা ছড়িয়ে দেওয়া’, ‘উন্নয়নের অভিযাত্রা’, ‘মাদক নির্মূল’, ‘দুর্নীতিবিরোধী অভিযান’, ‘সাবেক অপশাসনের বর্জ্য নির্মূল’ ইত্যাদি নানা অভিধায় ফুলিয়ে‑ফাঁপিয়ে প্রচার করা এক বৃহৎ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই এর নির্মাণ চলে। এই প্রচারের ফলে ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকে যৎকিঞ্চিৎ বা বৃহৎ সুবিধা পাওয়া জনগোষ্ঠী তৈরি হয়, যারা অনেকটা হিস্টিরিয়াগ্রস্তের মতো করে শাসকদের প্রচারকে এক সুবৃহৎ ঢোলকে পরিণত করে, যা আঘাত করলেও বাজে, না করলেও বাজে।
এই একই সময়ে ক্ষমতার একচেটিয়াকরণের অবধারিত ফল হিসেবে সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ইত্যাদির মতো অসুখ। ক্ষমতাকে একচেটিয়া করার অন্যতম কৌশল হিসেবেই এ ঘটনাটি ঘটে। কারণ, একচেটিয়া ক্ষমতার ভাগ এবং সেই সূত্রে সম্পদের ভাগ বিভিন্ন স্তরকে না দিয়ে শাসকের উপায় থাকে না। এই ভাগ‑বাটোয়ারার মধ্য দিয়েই শাসনের পক্ষে সমাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্তরের সম্মতিটি উৎপাদিত হয়। আর এ কাজটি করে ক্ষমতার মধুর ছিটেফোঁটা পেতে আগ্রহী তাবেদার গোষ্ঠী।
উদাহরণ হিসেবে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ে আমেরিকাসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যে ‘শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদের’ ধারণা মাথাচাড়া দিয়েছিল, তারই প্রতিক্রিয়ায় অন্য বর্ণের লোকেদের মধ্যে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতাবোধ তৈরি হয়। উদহারণ হিসেবে বলা যেতে পারে, ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কথাও। ভারতের বহুত্ববাদী সমাজের এক বড় রূপান্তর ঘটে গেছে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর দল বিজেপির শীর্ষ নেতাদের মাধ্যমে। বলা যেতে পারে তুরস্কের রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের কথা। সেখানে খেলাফতের স্বপ্নের প্রচারের মাধ্যমে কুর্দিসহ অন্যান্য জনগোষ্ঠীকে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। আফ্রিকার বহু দেশের নাম এখানে উল্লেখ করা যাবে চাইলে। প্রতিটি দেশেই দেখা যাবে, ক্ষমতাসীনদের এ ধরনের রাজনীতির প্রতিক্রিয়ায় জন্ম নিচ্ছে সংঘাতময় পরিস্থিতি।
দ্বিতীয়ত, একচেটিয়া শাসকেরা মুক্তচিন্তা, স্বাধীন মত ইত্যাদির পথ রুদ্ধ করতে একরৈখিক মত, পথ ও মনোভঙ্গির প্রচার করে। এর মধ্য দিয়ে ‘অন্য’ হিসেবে সাব্যস্ত করা অংশও একরৈখিক মনোভাবের দিকে যাত্রা করে। সমাজে দুটি পৃথক মেরুর সৃষ্টি হয়। কে না জানে–এক পরম সত্য জন্ম দেয় আরেক পরম সত্যের। যদিও প্রাসঙ্গিকতা ছাড়া কোনো সত্যই নেই। এর ফল হয় ভয়াবহ। একচেটিয়া শাসকেরা নিজেদের ক্ষমতাকে প্রশ্নহীন আনুগত্যের এক রাজত্বে রূপান্তরের লক্ষ্যে যে পরম লক্ষ্য ও সত্যের প্রচার করে, তারই জেরে সমাজের একেবারে গহিনে বাড়তে থাকে ঠিক বিপরীত আরেক সত্য। এই দুই সত্যের লড়াই চলে শুরুতে। কিন্তু পরে ক্রমেই বিরোধী সত্য পিছু হটে এবং গোপন প্রচার ও কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হয়ে যায়।
তৃতীয়ত, রাজা বা রাজত্বের যেমন নানা চিহ্ন বা প্রতীক থাকে, ঠিক তেমনি একচেটিয়া শাসকেরাও কিছু প্রতীক বাজারজাত করে। সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া কিছু ধারণা, লেবাস, বক্তব্য, শব্দ বা শব্দগুচ্ছ এই শাসনব্যবস্থার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে যায়। ফলে এ ধরনের শাসনব্যবস্থার বিরোধিতার প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় এসব প্রতীকের পূর্ণাঙ্গ ধ্বংস এবং তা এর বিপরীত প্রতীক দিয়ে প্রতিস্থাপন। শুরুতে শাসকের চোখে চোখ রেখে এই ধ্বংস বা প্রতিস্থাপনটি করা না গেলেও ক্রমে সমাজের বিভিন্ন স্তরে সম্পূর্ণ বিপরীত প্রতীকের বাড়বাড়ন্ত দৃষ্টিগ্রাহ্য হতে শুরু করে। কোনোভাবে একচেটিয়া শাসকের পতন হলে অনেকটা বাছবিচারহীনভাবে ওই শাসনের তাবৎ প্রতীককে ধ্বংসে মত্ত হয় জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ।
চতুর্থত, একচেটিয়া শাসকেরা ক্ষমতার একচেটিয়াকরণের প্রক্রিয়াতেই নাগরিক সমাজ, সংবাদমাধ্যম, বিরোধী দল ও মত ইত্যাদিকে এমনভাবে প্রান্তে ঠেলে দেয় যে, এই শাসনব্যবস্থার কোনো সমালোচনা বা বিরোধিতার আর কোনো স্বাভাবিক পন্থা অবশিষ্ট থাকে না। ফলে সংঘাতই বিরোধের একমাত্র পথ হয়ে ওঠে। কোনো দেশে এই সংঘাত সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্য দিয়ে ঘটে, কোনো দেশে চোরাগুপ্তা হামলা বা নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচির হঠাৎ সহিংস হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে ঘটে। বাংলাদেশে গত মধ্য জুলাই থেকে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এমন বাস্তবতাই দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়েছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাংলাদেশে সর্বশেষ ঘটে যাওয়া অভ্যুত্থান এবং তৎপরবর্তী নানা ঘটনা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শক্তির সংযোগের সুস্পষ্ট চিহ্নবাহী। এটা অভাবিত কোনো বিষয় নয়। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ক্ষেত্রে এটাই বাস্তব। এ ধরনের দেশের শাসকেরা কোনো না কোনো ক্ষমতাধর দেশের ছায়াতলে থেকেই নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে। কে কাকে ভাগ দিচ্ছে, বা কাকে কোন শক্তি নিজের ভাগ বুঝে নেওয়ার জন্য নিরাপদ মনে করছে, তার ওপর এ ধরনের দেশের শাসকগোষ্ঠীর বিদ্যমানতা অনেকখানি নির্ভর করে। জনসমর্থন বা জনচাহিদা এ ক্ষেত্রে অনেকটাই ভাঁওতা ছাড়া আর কিছু নয়।
এমন উদাহরণ পাওয়া যাবে পাকিস্তানে, পাওয়া যাবে তুরস্কে, মিয়ানমারে, মেক্সিকোতে। ইয়েমেন কিংবা সিরিয়ায় চলমান সংঘাত কিংবা কঙ্গো, রুয়ান্ডা, নাইজেরিয়া বা আফ্রিকা ও এশিয়া‑প্যাসিফিক অঞ্চলের মালদ্বীপ–যেদিকেই তাকানো যাক, এমন উদাহরণ মিলবে ভুরি ভুরি।
অর্থাৎ, ক্ষমতার একচেটিয়াকরণের পথে শাসকগোষ্ঠী যেসব ধ্যান‑ধারণাকে পুঁজি করে, যেসব প্রতীককে প্রচার করে নিজেদের ক্ষমতার চিহ্ন হিসেবে, সেসব ধারণা ও প্রতীকের বিপরীতে এক শক্তি প্রচ্ছন্নে বাড়তে থাকে সমাজের ভেতরে। প্রকাশ্য কোনো বিরোধী মতকে সহ্য করা হয় না বলে, এই বিপরীত সত্য বা ধারণা ও তার প্রতীকগুচ্ছ সমাজের ভেতরে ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এক ধরনের চরম অসহিষ্ণু মনোভঙ্গির বিস্তার ঘটে পুরো সমাজে। রাষ্ট্রের শীর্ষ থেকে প্রচার করা ‘সাদা অথবা কালো’ তত্ত্ব সমাজের ভেতরেও একই তত্ত্বের জন্ম দিতে থাকে। শুধু নিভৃতে গজিয়ে ওঠা ও বিস্তার পাওয়া তত্ত্বে শাসককে ‘কালো’ আর বিরোধীদের ‘সাদা’ হিসেবে প্রচার করা হয়। উভয় পক্ষই যাবতীয় ধূসর অঞ্চলকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের শীর্ষ থেকে প্রচার করা চরমের বিপরীতের আরেক চরম বেড়ে উঠতে থাকে সমাজের একেবারে গহীনে। প্রতিক্রিয়ার জবাব হিসেবে শুধু প্রতিক্রিয়ারই জন্ম হয়। মাঝখানে শুধু প্রাণ যায় সেই উলুখাগড়ার, যার প্রাণ যাওয়াটাই নিয়তি।
মূলত একচেটিয়া শাসকের প্রতিক্রিয়াশীল তৎপরতাই এক দীর্ঘসূত্রি ও আরও ভয়াবহ প্রতিক্রিয়ার জগতে নিয়ে যায় গোটা সমাজকে। এর দায় বা ফলভোগ করতে হয় প্রতিটি মানুষকে, যে বা যারা হয়তো কোনোভাবেই শাসন কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়। সমাজের প্রতিটি স্তর এক অর্থে প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। সমাজের গহীনে গজিয়ে ওঠা ও বিস্তার পাওয়া প্রতিক্রিয়াশীলতা তখন এমনকি শাসকগোষ্ঠীর প্রচার করা ইতিবাচক ধারণাগুচ্ছকেও খারিজ করে দেয়, যা যেকোনো বিবেচনাতেই আত্মধ্বংসী। একচেটিয়া শাসকেরা এই আত্মধ্বংসী বাস্তবতারই নির্মাতা।
ফজলুল কবির: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]
আগের পর্ব পড়ুন: