২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর, বাংলাদেশের ময়মনসিংহে প্রায় ১৫০ জনের একটি মব ২৫ বছর বয়সী এক হিন্দু পোশাক শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যা করে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওই যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
বাংলাদেশে মবের ইতিহাস দীর্ঘ, যা ‘গণপিটুনি’ নামে পরিচিত। যদিও এই সংকট শুধু বাংলাদেশের একার নয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ‘ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট ২০২৫’ অনুসারে, দলীয়ভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়া এখন এক বৈশ্বিক কেন্দ্রস্থল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে; ভারত ও পাকিস্তানেও প্রায়শই একই রকম সহিংসতা ঘটে।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানজুড়ে গণ-সহিংসতার বাড়বাড়ন্তের কারণ একই রকম: বিচার বিভাগের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার ক্রমশ অবনতি এবং ডিজিটাল ডিসইনফরমেশনের (অপতথ্য/ভুয়া খবর) দ্রুত বিস্তার। এই দুইয়ের সমন্বয় রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব পেরিয়ে গণধোলাইকে কার্যকর করে তোলে। কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর এক বিশ্লেষণে ২০২০ সালে আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পল স্ট্যানিল্যান্ড যেমনটা পর্যবেক্ষণ করেছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় এই ধরনের ঘটনা কোনো সাম্প্রতিক বিকাশ নয়, বরং এর ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা রয়েছে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অনুপস্থিতি বা ব্যর্থতায় বেআইনিভাবে ‘অপরাধী’কে শাস্তি দেওয়ার সংস্কৃতি আদতে ঔপনিবেশিক কাঠামোর মাঝে প্রোথিত এবং ১৯৪৭ সালের ভারতভাগে প্ররোচিত; ডিজিটাল যুগে আবারও তা পুনঃসংগঠিত হয়েছে।
২০১৭ সালে পাকিস্তানের মারদানে গণপিটুনিতে নিহত বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র মাশাল খানের ঘটনাটি এক জ্বলন্ত উদাহরণ যে, সহিংসতার জন্য কীভাবে সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত মিথ্যা অভিযোগকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ধর্ম অবমাননার আড়ালে একটি ক্যাম্পাস মব মাশালকে লক্ষ্যবস্তু বানায় এবং তাঁর মৃত্যুর ভিডিও মোবাইল ফোনে ধারণ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করা হয়। এই হামলার ছক করেছিল কতিপয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্মী ও মাশালের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা, যারা মূলত প্রশাসনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল।
এই মর্মান্তিক ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহাসিক প্যাটার্নকে ফুটিয়ে তোলে, যেখানে রাজনৈতিক গতিশীলতা ও সামাজিক পুলিশিংয়ের জন্য মব সহিংসতা একটি পরিকল্পিত হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
গত শতাব্দীর ব্যবধানে ‘মব মানসিকতা’র মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়াগুলো এই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ভূখণ্ডে গভীরভাবে মিশে গেছে। মব মানসিকতা মূলত ‘বিচ্ছিন্নতা’ (Deindividuation) নামে পরিচিত একটি মনস্তাত্ত্বিক ঘটনা, যেখানে একজন ব্যক্তি একটি বৃহৎ গোষ্ঠীর মধ্যে তার ‘আত্মবোধ’ (Sense of self) ও ব্যক্তি-পরিচয় হারিয়ে ফেলেন। ব্যক্তি যখন একদল উত্তেজিত জনতার অংশ হয়ে ওঠেন, তখন তিনি প্রায়শই সুপ্ত এক অনুভূতি অনুভব করেন। বিশ্বাস করেন যে চারপাশের মানুষের থেকে তিনি নিজেও আলাদা নন এবং সম্মিলিত কর্মকাণ্ডের আড়ালে ব্যক্তিগত জবাবদিহিতার ভয় হ্রাস পায়। এটি ব্যক্তিকে এমন আচরণে জড়িত হতে বাধ্য করে, যা তিনি একা কখনও কল্পনাও করতে পারতেন না।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, সমষ্টিবাদী সমাজে গোষ্ঠীগত সম্প্রীতিকে ব্যক্তিগত পরিচয়ের চেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। চীনা গবেষক জিংজিং জিও ও জুন ঝাওয়ের ২০২৩ সালের এক গবেষণা অনুসারে, সমষ্টিবাদী সংস্কৃতির মানুষ জন্ম থেকেই তাদের ব্যক্তিগত পরিচয়কে সম্প্রদায়ের অধীনস্থ করতে অভ্যস্ত। ফলে স্বতন্ত্র ব্যক্তি থেকে সমষ্টিগত জনতার অংশ হয়ে ওঠার রূপান্তর অনেকটা তরলের মতো সহজ হয়।
কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন কেন? দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতির মতো এটিও একটি সমষ্টিবাদী সমাজ হওয়া সত্ত্বেও সেখানে মব সহিংসতা বিরল। ৬০ ও ৭০-এর দশকে উল্লেখযোগ্য সহিংসতা দেখা গেলেও, বর্তমানে দেশটি ‘ওয়েইওয়েন’ (স্থিতিশীলতা রক্ষণাবেক্ষণ) নীতির মাধ্যমে কঠোর কর্তৃত্ব বজায় রেখেছে। সেখানে সকল প্রকার মব সহিংসতাকে রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের ওপর হুমকি হিসেবে দেখা হয় এবং দ্রুত দমন করা হয়।
মবের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়া ও চীনের মধ্যে বড় পার্থক্য হলো ‘নৈতিক প্ররোচনা’র প্রকৃতি। দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্ম অবমাননা বা গো-হত্যার মতো ‘পবিত্র’ যুক্তিগুলো জনতাকে আবেগগতভাবে আইনি কাঠামো ভেঙে ফেলতে প্ররোচিত করে। অন্যদিকে, চীনের ধর্মনিরপেক্ষ ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে এই ‘পবিত্র’ অজুহাতের অভাব থাকায় উন্মত্ত মব তৈরি করা কঠিন।
ডিজিটাল গতিশীলতাও এই দুই অঞ্চলকে পৃথক করেছে। দক্ষিণ এশিয়া প্রতিনিয়ত ভাইরাল ডিসইনফরমেশনের সঙ্গে লড়াই করছে। কিন্তু চীনের কঠোর নজরদারির আওতায় থাকা ‘ডিজিটাল স্পেস’ উন্মত্ত মব তৈরির পথে বড় প্রতিবন্ধকতা।
দক্ষিণ এশিয়ায় পুঁজিবাদের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে একটি ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান ঘটলেও তা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের চেয়ে সমষ্টিবাদী ঐতিহ্যের সঙ্গে বেশি জড়িত। ব্যবসায়ী সম্প্রদায় প্রায়শই উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে, যারা মব সহিংসতায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ভারতীয় ইতিহাসবিদ মীরা নন্দা তাঁর ‘দ্য গড মার্কেট’ বইয়ে বিষয়টি বিস্তারিত অনুসন্ধান করেছেন।
এই সংকট সমাধানের জন্য দ্বিমুখী পদ্ধতির প্রয়োজন: ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের জোরালো চর্চা এবং রাষ্ট্রীয় নীতিতে সিদ্ধান্তমূলক পরিবর্তন। সরকারকে অবশ্যই মব সহিংসতাকে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে এবং কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
পাকিস্তানি দৈনিক ডন থেকে অনুবাদ করেছেন রাব্বানী রাব্বি
লেখক: নাদিম এফ পারাচা, পাকিস্তানি সাংবাদিক ও লেখক
(এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।)



