অকাতরে রক্তদান যেন ব্যর্থ না হয়

বাংলাদেশ সম্ভবত জন্মলগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত এই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি। একদিকে চরম অর্থনৈতিক সংকট, অন্যদিকে তার চেয়েও বেশি রাজনৈতিক সংকট। পনেরো বছরেরও বেশি সময় ক্ষমতা ধরে রাখা আওয়ামী লীগ সরকারের নানা বিশৃঙ্খলা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে এক ভয়াবহ সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। অর্থনীতির যে ভিত্তিগুলোর ওপর একটা দেশ দাঁড়িয়ে থাকে, তার প্রায় সবগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভীষণভাবে। অর্থনীতি এখন অতিক্রম করছে স্মরণকালের সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্ত। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আন্তঃদেশীয় লেনদেনের ভারসাম্য, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিনিয়োগ কর্মসংস্থান পুঁজিবাজার আর বিশেষ করে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অনিয়ম আর দুর্নীতি দেশের অর্থনীতিকে পর্যুদস্ত করে দিয়েছে। এখন এই ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে আবার পুনর্গঠিত করতে হবে যত দ্রুত সম্ভব। 

অর্থনৈতিক  ব্যবস্থার পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে সব থেকে প্রথমে আসে ব্যাংকিং খাতের কথা। ঋণ জালিয়াতি, অনিয়ম অর্থপাচার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণহীনতা ব্যাংকিং খাতকে দেউলিয়ত্বের দ্বার প্রান্তে নিয়ে গেছে। দেশের আটটি ব্যাংক ইতিমধ্যেই দেউলিয়া হওয়ার পথে। এই ব্যাংকগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটা ইসলামি ধারায় পরিচালিত। কিছুদিন আগে এগুলোকে দুর্বল ব্যাংক হিসাবে চিহ্নিত করে অন্যান্য সবল ব্যাংকগুলোর সাথে একীভূত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কিন্তু তা বিফলে যায়, কেননা কোনো সবল ব্যাংক দুর্বল একটা ব্যাংকের দায় কেন নিতে যাবে? তবে ব্যাংকগুলোর এই অবস্থা কেন তা জানা প্রয়োজন। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অনেক কারণে ব্যর্থ হতে পারে। যেমন প্রতিযোগিতায় পেরে না ওঠা, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা বাজারে সেই পণ্য বা সেবার চাহিদা না থাকা ইত্যাদি। কিন্তু এই ব্যাংকগুলোর দুরাবস্থার যদি কারণ দেখতে চান তবে দেখবেন যে এদের সফল না হওয়ার একটাই কারণ আর সেটা হল দুর্নীতি। ব্যাংকগুলো দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ঋণ দিয়েছে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে, ফলে সৃষ্টি হয়েছে বিপুল পরিমাণ মন্দ ঋণ। মন্দ ঋণের এই বোঝা বহনের ক্ষমতা এই ব্যাংকগুলোর নেই। 

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে শপথ নিচ্ছেন প্রধান উপদেষ্টা ড.মুহাম্মদ ইউনূস। ফাইল ছবিএখানে ত্রাণকর্তা হিসাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবির্ভূত হয়েছে কখন মূলধন সহায়তা দিয়ে আবার কখন পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে প্রশাসক নিয়োগ করে। কিন্তু এতে করে কোনো লাভ হয়নি, হবেও না। মূলত যেটা করতে হবে সেটা হল দুর্নীতি করার রাস্তা চিরতরে বন্ধ করা। ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপি আর দুর্নীতির মাধ্যমে নেওয়া ঋণের ব্যাপারে দ্রুত আরও কঠিন ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়ে আর যেন কেউ ঋণ নিতে না পারে সে ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ জানা সত্ত্বেও ব্যাংক ম্যানেজারদের ঋণ অনুমোদনে বাধ্য হতে হয় রাজনৈতিক ক্ষমতাধরদের ধমকে, এরকম নজির ভূরিভূরি আছে। ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পত্তির মূল্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেখান হয়। এভাবে নিত্য নতুন উপায়ে এক শ্রেণির লোক বিপুল অর্থের মালিক বনে যাচ্ছে। আর রাতারাতি ব্যাংকগুলি হয়ে যাচ্ছে দেউলিয়া। একটা দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা দেউলিয়া হলে সেই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা কি হতে পারে তা আমরা সবাই কম বেশি জানি। জানি বললে ভুল হবে, টের পাচ্ছি হাড়ে হাড়ে। ব্যাংকিং ছাড়াও অন্যান্য উল্লেখযোগ্য খাত যেমন বিমা, পুঁজিবাজারসহ সব জায়গায় প্রয়োজন আমূল সংস্কারের। বিগত প্রায় পনেরো বছর ধরে পুঁজিবাজার বিপর্যস্ত। অসাধু চক্রের কারসাজিতে মূল্য কমিয়া বাড়িয়ে এই শ্রেণির লুটেরেরা লুটে নিচ্ছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ। ধীরে ধীরে নিরুৎসাহিত হচ্ছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ। অথচ ব্যাংকিং-এর পাশাপাশি অর্থায়নের একটা বড় উৎস হল পুঁজিবাজার। পৃথিবীর সব উন্নত দেশেই পুঁজিবাজারই তাদের অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। তাই পুঁজিবাজার সংস্কারে বিশেষ মনোযোগী হওয়া দরকার এখনই। দেশের শিল্প-বাণিজ্য খাতও এখান থেকে প্রয়োজনীয় মূলধনের জোগান পেতে পারে সহজেই, তাতে করে কর্মসংস্থান হবে আর সেই সাথে অর্থনীতিও বেগবান হবে। 

আমাদের দেশে আরেকটা বড় সমস্যা হল চাঁদাবাজি। সারা দেশে এ ব্যাধি এমন ভাবে জেঁকে বসেছে যে তা প্রায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করতে যাচ্ছে। এমন কোনো জায়গা নেই যেটা চাঁদাবাজির আওতার বাইরে। সর্বনিম্ন পর্যায় থেকে মন্ত্রী পর্যন্ত–সবাই এর সাথে জড়িত। বিশেষ করে পরিবহণের চাঁদাবাজি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির একটা অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। সরকার পরিবর্তন হলে চাঁদাবাজের সিন্ডিকেটেও পরিবর্তন আসে। ক্ষমতাসীন দলের চাঁদাবাজরা সেই স্থান দখল করে ফলে চাঁদাবাজি আর বন্ধ হয় না। পরিবহণ শ্রমিক সংগঠনগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচিত। তাই জানা সত্ত্বেও অনেক সময় তাদের এই অন্যায় কর্মকাণ্ডে কোনো বাধা দেয় না। আবার অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও এদের চাঁদাবাজির ভাগীদার থাকে। তাদের নিয়মিত নজরানা দিতে হয়। সুতরাং এদের এই চক্র ভেদ করে বের হওয়া খুবই কঠিন। এই সমস্ত বিষয় আমাদের অর্থনীতিকে পঙ্গুত্বের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তাই শক্ত হাতে এদের শিকড় উপড়ে ফেলতে হবে চিরতরে। এছাড়া আমাদের প্রশাসন যে কি পরিমাণ দুর্নীতিগ্রস্থ তা এক ছাগলকাণ্ডই আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। আমাদের কর ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব খাতেও প্রয়োজন আমূল সংস্কার।

বর্তমান সরকারের প্রতি দেশের মানুষের ও বিশ্ববাসীর অকুণ্ঠ সমর্থন আছে। এটাকে কাজে লাগিয়ে এই দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া সরকারের পক্ষে সহজ। জনগণের চাওয়াও তাই। সুতরাং সংস্কার শুধু কিছু দুর্নীতিবাজকে পদ থেকে সরিয়ে দিলেই হবে না। এই সব কাজ যাতে কেউ ভবিষ্যতে করার সাহস আর শক্তি না পায় তার স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে আইন সংশোধন বা নতুন আইন করতে হবে। 

আমাদের মনে রাখতে হবে অর্থনৈতিক সংস্কার না হলে, দেশে সামাজিক শৃঙ্খলা আসবে না। লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত বেকার ঘুরে বেড়াচ্ছে দ্বারে দ্বারে। আর যারা অল্প শিক্ষিত তারা বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে। প্রতারিত হচ্ছে পদে পদে। অনেকেই ভূমধ্যসাগরে ডুবে মরছে। চুরি ছিনতাই ডাকাতি বেড়ে চলেছে আশঙ্কাজনকভাবে। এর পিছনে দায়ী আমাদের অর্থনৈতিক বিপর্যয়। তাই এখনই সময় এগুলির মূলোৎপাটন করার আর তবেই এর হাত ধরে সামাজিক আর রাজনৈতিক সংস্কার আসবে নিশ্চিতভাবে। এই আশায়ই দেশের মানুষ অকাতরে রক্ত দিয়েছে। 

লেখক ও গবেষক: ড. ইজাজ আহসান

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]