‘অদ্ভূত উটের পিঠে চলছে স্বদেশ’। অভিন্ন শিরোনামে শামসুর রাহমানের একটি কাব্যগ্রন্থ ও কবিতা আছে। বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে এই পরিস্থিতি যে বিরাজমান ছিল, সেটা এখন আবিশ্ব অবগত। তবে আমাদের ক্রীড়াঙ্গন বোধকরি স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকেই অদ্ভূত অথচ ক্লান্তিহীন এক উটের পিঠে সওয়ার হয়েই চলেছে। এতদিনেও পেশাদার ব্যবস্থাপনা যেমন গড়ে ওঠেনি, প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি সুশাসন ও শৃঙ্খলা। ক্রীড়াঙ্গন পরিচালনার এসব পূর্বশর্ত বরাবরই থেকে গেছে উপেক্ষিত।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, অনধিকারচর্চা, স্বজনপোষণ ও গণতন্ত্রের মোড়কে স্বেচ্ছাচারিতায় ব্যহত হয়েছে কাঙ্ক্ষিত অভীষ্ট অর্জন। বিগত ৫৩ বছরে এই পরিস্থিতি বদলায়নি একটুও। বরং ট্র্যাডিশন অব্যাহত রেখেছেন এক শ্রেণির সুযোগসন্ধানী ও সুবিধাভোগী কর্মকর্তা। দেশের সাম্প্রতিক পটপরিবর্তনের পর পুনরায় তৎপরতা শুরু করে দিয়েছেন যথাসময়ে রং বদলানো শ্রেণিরা।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ক্রীড়াঙ্গন সংস্কার অত্যাবশক হলেও এভাবে কেঁচে গন্ডুস করে দেওয়া যৌক্তিক না। অন্যদিকে কেবল ঘটমান বর্তমানে চোখ রেখে পদক্ষেপ গ্রহণও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। এজন্য কষ্টকর হলেও কিছুটা পিছিয়ে গিয়েই কাজটা শুরু করার উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য সীমা বা সময়কাল নির্ধারিত হতে পারে ১৯৯১ সাল থেকে। কারণ, নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার শুরু ওই সময় থেকেই। অর্থবছরের হিসাব মেনে ১৯৯১ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত এই সময়কালকে বিবেচনায় রেখেই ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণ করতে পারলে ব্যর্থতার আশঙ্কা কমবে। প্রত্যাশিত সাফল্য পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
প্রসঙ্গত, গত তিন দশকেরও বেশি সময়ে আমাদের কোনো ক্রীড়ানীতি যেমন বাস্তবায়ন হয়নি, তেমনি আমরা পাইনি সত্যিকারে কোনো দূরদর্শী ক্রীড়ামন্ত্রী। ক্রীড়ানীতি না থাকায় একটা দিকনির্দেশনাহীন ক্রীড়াঙ্গন চলছে একদল নীতিহীন, স্বেচ্ছাচারী ও অপেশাদার কর্মকর্তাদের খেয়ালখুশিতে। ব্যাটন হাতবদল করে তাঁরা ক্রীড়াঙ্গনকে নিয়ে গেছেন দিকশূন্যপুরের দিকে।
ক্রীড়াঙ্গন সংস্কার তাই এখন সময়ের দাবি। এক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে গুরুত্বারোপ একান্ত আবশ্যক। এই পর্বে তারই কয়েকটি নিয়ে আলোচনা যাক।
জাতীয় ক্রীড়ানীতি
এই বিষয়টা কী, এর প্রয়োজনীয়তাই‑বা কতটুকু এবং আদৌ সেটা কোনোদিন আমাদের ক্রীড়াঙ্গন পরিচালনায় ছিল কিনা, তা বেশির ভাগ কর্মকর্মতাই বলতে পারবেন বলে মনে হয় না। বিগত দুই ক্রীড়ামন্ত্রীর কাছে সর্বশেষ ক্রীড়ানীতি কবে হয়েছিল এবং নতুন ও সময়োপযোগী ক্রীড়ানীতি বাস্তবায়ন কবে হবে, সে বিষয়ে জানতে চেয়ে কোনো সদুত্তর মেলেনি।
এজন্য সবার আগে চাই জাতীয় ক্রীড়ানীতি। নতুবা গত ৫৩ বছরের মতো কাণ্ডারিহীন নৌকার মতই চলবে এই ক্রীড়াঙ্গন। তর্কের খাতিরে বলা যেতে পারে আমাদের জাতীয় ক্রীড়ানীতি ছিল। কিন্তু সেই আলোকে কোনো কাজ কি হয়েছে? প্রথম জাতীয় ক্রীড়ানীতি ৮৯-এর খসড়া অনুমোদনের পর ১৯৮৯ সালের ১২ জুলাই জারি করা হয়। ক্রীড়ানীতি ১৯৮৯-কে ভিত্তি হিসেবে নিয়ে ১৯৯৫ ও ১৯৯৬ সালে জাতীয় ক্রীড়া সম্মেলনের সুপারিশমালার আলোকে জাতীয় ক্রীড়ানীতি ১৯৯৮-এর খসড়া প্রণীত হয় এবং পরে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে অনুমোদিত হয়। এরপর ক্রীড়ানীতি ২০২১-এর খড়সা প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি করা হয়। কিন্তু সেই কমিটি কী কাজ করেছে, সেটা স্পষ্ট নয়। ২০২২ সালেও একটা কমিটি হয়। সেটাও আলোর মুখ দেখেনি। ২০২৩ সালেও একটি কমিটি করা হয় এবং সেই কমিটি তুলনায় সময়োপযোগী একটি খসড়া প্রণয়ন করে।
এর জন্য যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কমনওয়েলথ সচিবালয়ের সহযোগিতা চায়। তারা লন্ডন থেকে ব্রিটিশ স্পোর্টস কাউন্সিলের সদস্য তিন বিশেষজ্ঞকে ঢাকায় পাঠায়। ওই ত্রয়ী ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও অন্যান্যদের সঙ্গে বৈঠকও করেন। এরপর আর কোনো অগ্রগতির কথা শোনা যায়নি। এমনকি ক্রীড়ানীতি ২০২৩-এর চূড়ান্ত অনুমোদন না পাওয়ায় বাস্তবায়নেরও প্রশ্ন ওঠেনি। তবে এই ক্রীড়ানীতি আমাদেরকেই প্রণয়ন করতে হবে। বিদেশিরা এখানে কিছু করতে পারবে না। সেটা তারাও বলে গেছে।
১৯৯৮ থেকে ২০২৩ মোট তিনটি ক্রীড়ানীতি পর্যালোচনার পর অবাক করা বিষয় হলো, কোথাও জবাবদিহির কোনো উল্লেখ নেই; ব্যক্তি, ফেডারেশন, বোর্ড, ক্লাব বা সরকারি সংস্থা কারোই না। বাস্তবায়িত হোক বা না হোক স্বেচ্ছাচারিতা তাদের কাছে এজন্যই হয়তো নৈমিত্যিক চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রীড়াঙ্গনের প্রশাসনিক খোলনলচে পাল্টাতে সবার আগে প্রয়োজন জাতীয় ক্রীড়ানীতি প্রণয়ন। যেনতেন প্রকারের একটা দাঁড় করানোর অবকাশ নেই। আগের খসড়া নীতিমালা প্রণয়ন কমিটিতে রাখা হয়েছে কেবলই ক্রীড়াঙ্গন-সংশ্লিষ্ট কিছু চেনামুখ ও পদের মানুষকে। এদের অনেকেরই যোগ্যতা প্রশ্নসাপেক্ষ। সেজন্য এই ঘেরাটোপের বাইরে গিয়ে সীমাকে প্রসারিত করে বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করতে পারলে তবেই যথাযথ ক্রীড়ানীতির প্রণয়ন সম্ভব; যেখানে প্রতি পাঁচ বছর পর পরিমার্জন, পরিবর্ধন ও বিয়োজনের বিধান থাকা আবশ্যক।
সংস্কারের সময়কাল
এই বিষয়ে আগেই আলোকপাত করা হয়েছে। সংস্কারের সময়কাল নির্ধারিত হওয়া দরকার: ১৯৯১ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। এই ৩৩ বছরে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়েছে ফেডারেশন। বর্তমানে ক্রীড়া ফেডারেশন, অ্যাসোসিয়েশন ও সংস্থা ৫৫টি। বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ), বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ছাড়া বাকিগুলোর সভাপতি সরকার মনোনীত। এই সংখ্যা ৫৫। এদের কোনো জবাবদিহির বিধান কোথাও চোখে পড়ে না। এটা ক্রীড়ানীতিতে যেমন দেখা যায় না, নেই জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ আইন ২০১৮-তেও। এজন্য অচিরেই একটা সময়সীমা বেঁধে দিয়ে (সেটা ৩০ কার্যদিবসের বেশি নয়) প্রতিটি ফেডারেশনের আমূল হিসাব নিরীক্ষণ করা প্রয়োজন। শুরু হবে ১৯৯১ সালের জুন থেকে। এই সময়সীমা সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। যেহেতু অনেক ফেডারেশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পরে। তাই কোনো ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত জুন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ অডিট রিপোর্ট দিতে হবে। এই হিসাব মানে কেবল সরকারের বরাদ্দ বাজেটের হিসাব নয়, বরং সার্বিক আয়-ব্যয়ের হিসাব। এর সঙ্গে আরও থাকতে হবে এতদিনের সাফল্য-ব্যর্থতা, উদ্যোগ, উন্নয়নসহ একটি পূর্ণাঙ্গ নীরিক্ষা প্রতিবেদন।
এটা কেবল ফেডারেশন, অ্যাসোসিয়েশন, সংস্থা বা বোর্ড নয়, বিকেএসপি, মহিলা ক্রীড়া সংস্থা, ক্রীড়া পরিদপ্তর ও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদকেও এই জবাবদিহির আওতায় আনা আবশ্যক।
মন্ত্রণালয়
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেই মূলত যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় অভিন্ন। বাংলাদেশও সেই ধারায় চলছে। তবে অন্য সব দেশে বিশেষত ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপালে যুব কার্যক্রম খেলাধুলাকেন্দ্রিক। বাংলাদেশে সেটা নয়; বরং বাজেট বরাদ্দ ক্রীড়ার থেকে যুবতে অনেক বেশি। ওই অংশের কার্যক্রমে আবার ক্রীড়ার স্থান নেই।
ক্রীড়ায় বাজেট প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই, যেখানেই মধু সেখানেই মৌমাছির বিচরণ অধিক। এজন্য বাংলাদেশের ক্রীড়া উন্নয়নে পৃথক ক্রীড়া মন্ত্রণালয় হতে পারে সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ও ক্রীড়া পরিদপ্তর
উভয় সংস্থাই ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এদের গঠনতন্ত্রে চোখ রাখলে অভিন্ন উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম চোখে পড়ে। অথচ তাদের কার্যকর ও উল্লেখযোগ্য কিছুই দৃশ্যমান নয়। বরং সবকিছুই গতানুগতিক। বিশেষত ক্রীড়া উন্নয়নের চেয়ে ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নেই বেশি আগ্রহ ও তৎপরতা দেখা যায় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের। এজন্য উভয় সংস্থার কার্যক্রম নিরূপণ করে এদের প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনার দাবি রাখে।
বিকেন্দ্রিকরণ
বাংলাদেশের উন্নয়নে বিকেন্দ্রিকরণের বিকল্প নেই। ক্রীড়াও এর বাইরে নয়। সবকিছু রাজধানীকেন্দ্রিক করে রাখা কিছু প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হাত থেকে ক্রীড়াঙ্গনকে বের করে আনাটা চ্যালেঞ্জ হলেও অসম্ভব নয়। এই অদৃশ্য শক্তির জোট ভেঙে সঠিক অর্গানোগ্রাম তৈরিই হবে যুগোপযোগী পদক্ষেপ। যেখানে কেন্দ্রের সঙ্গে বিভাগ, বিভাগের সঙ্গে জেলা, জেলার সঙ্গে উপজেলা একসূত্রে গাঁথা থাকবে। কেউ ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়ার সুযোগ পাবে না। উপজেলাকে অনোন্যপায় না হলে কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগেরই প্রয়োজন পড়বে না।
(চলবে)
লেখক: সাংবাদিক
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]