যুগ-যুগান্তরের সংগ্রামী বীর চট্টলার ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে ২ মাস ধরে তালা ঝুলছে। প্রেস ক্লাবের চাবি সেনাবাহিনীর হাতে- এ কথাটি কেউ-কেউ জানলেও অনেকে চুপ। দেশের বৃহত্তম বন্দর নগরীর চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব ২৮৪ জন কলম সৈনিকের বাতিঘর। কে কখন কীভাবে ক্লাব খুলবে কেউ জানে না। অথচ এর আগে দেশের নানা দুর্যোগের সময় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব একদিন বন্ধ রাখার নজির নেই।
দীর্ঘ ৬৫ বছরে তিলে তিলে গড়ে তোলা চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব, অগ্রজ শ্রদ্ধেয়জনদের (যাদের অনেকে মারা গেছেন) ত্যাগের ফল। মহান রব তাঁদের সবাইকে ওপারে শান্তিতে রাখুন।
বাক-স্বাধীনতার এই শতাব্দীতে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে গেল ৫ আগস্ট। নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার মৃত্যুর মিছিলের খবরে জনতার উত্তাল ঢেউ আঁচড়ে পড়ে রাজধানী ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের প্রতিটি জনপদে। বাংলাদেশের ইতিহাস রাজনৈতিক ইতিহাস। দীর্ঘ প্রভূ-ভৃত্যের শাসনের বিরুদ্ধে লাখ তরুণের মৃত্যুর মিছিলের শেষ চোখটিও অন্ধ করার পরিকল্পনার উপর হঠাৎ রাষ্ট্র হিসেবে খুঁজে পাওয়া- নতুন এক বাংলাদেশ।
ইন্টারনেট টাইমআউট হওয়ার কারণে দেশের খবর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আড়াই কোটি প্রবাসী বাংলাদেশির দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম। এসময় লাল-সবুজের বাংলাদেশে বৈষম্যহীন স্বাধীনতাকামী মানুষের চিৎকার সারা দুনিয়া উপলব্ধি করেছিল। এ গণঅভ্যুত্থান দেখে পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিমের থিং-ট্যাংকগুলো নড়ে-চড়ে বসেছে। চট-জলদি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে অনেক দেশ। ফলে দেশব্যাপী ছাত্র-জনতার অকল্পনীয় বিপ্লবের মধ্য দিয়ে নতুন দেশের যাত্রা শুরু হয়েছে।
শুনতে পেলাম- ঐদিন রাতে আমার প্রিয় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে হামলা করে ভাংচুর করা হয়েছে। সাথে-সাথে চট্টগ্রামের সাংবাদিক সমাজ এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে। চট্টগ্রামের সবকটি খবরের কাগজ অভিন্ন সম্পাদকীয় লিখে জানিয়েছে এ ঘটনার নিন্দা। এটি গণতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যা করার ষড়যন্ত্র বলে চট্টগ্রামের সাংবাদিক-জনতা মনে করে। ইতোমধ্যে ক্লাব খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে ২৮৪ জন কর্মরত সাংবাদিক স্বাক্ষর সমেত স্বারকলিপী পাঠিয়েছেন। চট্টগ্রামের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বীর প্রতিক, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকসহ সবার কাছে এ ব্যাপারে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ বারবার ধর্ণা দিয়েও কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারেননি।
দূর পরবাসে থেকেও প্রিয় শহরের চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবকে কোনোমতে ভুলতে পারিনি। একজন সংবাদকর্মী হিসেবে জীবনের স্বর্ণালী দিনগুলো কাটিয়েছি এ শহরে। চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। গ্লোবাল কনেকটিভিটির ধারণায় চট্টগ্রামকে বিশ্বমানের শহর ব্রান্ডিং করতে হলে সংবাদপত্র-সাংবাদিকতার বিকল্প নেই। শুধুমাত্র অপরিকল্পিত কিছু ফ্লাইওভার ও দালানকোঠা দিয়ে মানসন্মত আদর্শ শহর গড়া যায় না। এ শহরের ফুটপাত, খেলার মাঠ, স্কুল-কলেজ হোটেল-বিনোদন স্পটসহ মানুষের জীবনযাত্রার মান বিশ্বমানের হতে হবে।
একসময় চট্টগ্রাম অঞ্চলে বৃহত্তর পরিসরে অপরাধ-অপরাধী হাতধরাধরি করে চলত। অপরদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্র উপকূল অঞ্চল চট্রগ্রাম বরাবরই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। সেসময় অপর্যাপ্ত ইন্টারনেট সেবা-নিরাপত্তাহীনতার ভেতর দিয়ে পাহাড়-সমতল চষে সংবাদ কুঁড়িয়ে এনেছিলাম। গুরুত্বপূর্ণ জাতীয়-আন্তর্জাতিক সংবাদ তুলে আনতে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও সাংবাদিকতার উজ্বল দৃষ্টান্ত রেখেছেন চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব সাংবাদিকবৃন্দ।
স্বাধীনতাত্তোর কাল থেকে চট্টগ্রামের সাংবাদিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে চলেছেন। কালের বিবর্তনে এ আই-য়ের এই যুগে সাংবাদিকতা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন সামাজিক যোগাযোগের (ইনফরমেশন-ডিস-ইনফরমেশন) সুবাধে সংবাদের নির্যাসে অবিশ্বাস-সন্দেহ সারা বিশ্বে প্রকট আকার ধারণ করেছে। তবুও চট্টগ্রামের মূলধারার সংবাদকর্মীরা যেখানে ঘটনা-দুর্ঘটনা, সেখানে ছুটে চলে অবিরাম।
যতদূর জানা যায়, ষাটের দশকে দেশের বনেদী পত্রিকার অন্যতম চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদীর হাত ধরে কিছু তরুণ বন্দনগরী থেকে সাংবাদিকতার যাত্রা শুরু করেন। ষাটের দশকে সাংবাদিকতার ক্ষেত্র তৈরি করতে কোহিনূর ইলেক্ট্রনিক প্রেস থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজাদী প্রাতিষ্ঠানিক সাংবাদিক সৃষ্টিতে তরুণ সাংবাদিকদের মধ্যে অদম্য প্রাণশক্তি জুগিয়েছিলেন।
চট্টগ্রামের ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে সাহিত্যিক ও সাংবাদিক মরহুম মাহবুব উল আলমের লেখায় ইংগিত পাওয়া যায়, সংবাদকর্মীদের জন্য প্রেস ক্লাবের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে অধ্যাপক মোহাম্ম্দ খালেদ, মঈনুল আলম, ওবায়দুল হক, এবিএম আজাদ ইসলামাবাদী, হাবিবুর রহমান খান, সাধন কুমার ধর, আবুল কাশেম সন্দীপ, নজীর আহমদ, নুরুল ইসলামসহ চট্রগ্রামের অগ্রজ সাংবাদিকদের অবদান রয়েছে। তারপর থেকে প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠার চিন্তা-অবয়বে রুপ নেয়। সে সময়ের ইংরেজি পত্রিকা পাকিস্তান অবজার্ভার চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান মরহুম ফজলুর রহমান গণতান্ত্রিক ছাত্র-আন্দোলনের একজন কান্ডারী ছিলেন।
চট্রগ্রাম প্রেস ক্লাবকে কেন্দ্র করে ১৯৬১ সালে চট্রগ্রামে সামরিক আইন ভঙ্গ একুশ ফ্রেব্রুয়ারি পালন, ’৬২ সালে শরীফ শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ছাত্র আন্দোলন-অতপর হরতাল পালনসহ ধাপে-ধাপে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভূমিকা রাখেন চট্রগ্রামের সাহসী সাংবাদিকবৃন্দ। দেশের অনেক বোদ্ধাজনকে বলতে শুনেছি, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব দেশের একমাত্র প্রাইভেট ক্লাব যেখানে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সাংবাদিক নেতা নির্বাচিত হয়ে থাকে। যুগ-যুগ ধরে প্রতি দুবছর পর ৩০ ডিসেম্বর সাধারণ সভা এবং ৩১ ডিসেম্বর ক্লাবের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
লেখক: আমেরিকা প্রবাসী সাংবাদিক
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]