‘মালয়েশিয়ায় আবার লোক নেবে।’–একটি বাক্যই যথেষ্ট। খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয় হিসাব। কত টাকা লাগবে? কার মাধ্যমে যাওয়া যাবে? ভিসা কবে হবে? পরিচিত কেউ আছে কি না?
একজন তরুণ হয়তো তখনই ভাবতে শুরু করেন, কীভাবে টাকা জোগাড় করবেন। কেউ ঋণ নেবেন। কেউ জমি বিক্রির কথা ভাববেন। আর কেউ খুঁজবেন একজন ‘বিশ্বস্ত’ দালাল।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য খুলতে পারে। এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় সুযোগ। কিন্তু অভিবাসন নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, অভিবাসন সুযোগের খবর যত দ্রুত ছড়ায়, সঠিক তথ্য তত দ্রুত ছড়ায় না। আর তথ্যের এই ঘাটতিই তৈরি করে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। কারণ তখন ফ্যাক্টের সঙ্গে মিথের লড়াই শুরু হয়। চলুন, এমন কিছু ফ্যাক্ট ও মিথ নিয়ে আলোচনা করা যাক।
মিথ: মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় খুলেছে। ২ লাখ শ্রমিক যেতে পারবে।
ফ্যাক্ট: পুনরায় খোলার প্রক্রিয়া চলছে।
সম্প্রতি একজন প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে জানা গেছে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে ছয় মাসে বাংলাদেশের দুই লাখ কর্মী যেতে পারবে। যদিও মালয়েশিয়ায় আগামী ছয় মাসে প্রায় ২ লাখ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের যে দাবিটি বাংলাদেশ সরকার করেছে; সেটি কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নয় বলে জানিয়েছে মালয়েশিয়া সরকার।
মালয়েশিয়া সরকারের মুখপাত্র দাতুক সেরি ফাহমি ফাদজিল বলেন, ‘বাংলাদেশের এক প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া এই বক্তব্যকে বাংলাদেশ সরকারের সরকারি অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।’ মালয়েশিয়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নিউ স্ট্রেইটস টাইমস এ তথ্য জানিয়েছে। কতজন কর্মী যাবে, কোন খাতে যাবে এবং কী প্রক্রিয়ায় যাবে, এসব বিষয়ে সরকারি চূড়ান্ত নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বা দালালের কথাকে সত্য ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
মিথ: দালালের কাছেই সবচেয়ে ভালো তথ্য।
ফ্যাক্ট: প্রথমে সরকারি তথ্য বা বিজ্ঞপ্তি দেখুন।
একজন সম্ভাব্য অভিবাসী হয়তো জানেন না, কোন এজেন্সি বৈধ। জানেন না, সরকারি খরচ কত। জানেন না, চাকরির চুক্তি কীভাবে যাচাই করতে হয়।
কিন্তু গ্রামের পরিচিত একজন এসে বলেন, ‘ভাই, মালয়েশিয়ার ভিসা জোগাড় করে দিতে পারবো। পাঁচ লাখ টাকা লাগবে।’ তখন ওই ব্যক্তি শুধু মধ্যস্থতাকারী থাকেন না, তিনি হয়ে ওঠেন তথ্যের প্রধান উৎস। এই জায়গাতেই নিরাপদ অভিবাসনের বড় চ্যালেঞ্জ।
অনিবন্ধিত মধ্যস্বত্বভোগী ও দালালের ওপর তথ্যের নির্ভরতা কমাতে হবে। প্রথমে সরকারি তথ্য দেখুন। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, বিএমইটি ও বোয়েসেলের তথ্য যাচাই করুন। প্রয়োজনে প্রবাসবন্ধু কল সেন্টার ১৬১৩৫-এ যোগাযোগ করুন।
মিথ: ভিসা মানেই চাকরি নিশ্চিত।
ফ্যাক্ট: ভিসা পাওয়া মানেই চাকরির নিশ্চয়তা নয়।
কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি। চাকরির পদ কী? বেতন কত? কর্মঘণ্টা কত? ওভারটাইম আছে কি? থাকা ও খাবারের ব্যবস্থা কে করবে?
এসব না জেনে শুধু ‘ভিসা হয়েছে’ শুনে টাকা দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
২০২৩ সালে প্রকাশিত ব্র্যাকের একটি গবেষণায় দেখা যায়, আইনগত পথে মালয়েশিয়ায় যাওয়া শ্রমিকদের ৫৪ শতাংশ চুক্তিতে উল্লেখ করা কাজ পাননি। মাত্র ৪ শতাংশ শ্রমিক তিন দিনের প্রাক্-প্রস্থান প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন। আর ৭১ শতাংশের প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ঘাটতি ছিল। এই পরিসংখ্যান পুরোনো হলেও এখনো প্রাসঙ্গিক। চুক্তি পড়ুন, বুঝুন, তারপর স্বাক্ষর করুন।
মিথ: বিদেশে গেলেই আয় হবে।
ফ্যাক্ট: নির্দিষ্ট দক্ষতা ও ভাষা জানা জরুরি।
বিদেশে যাওয়ার আগে কাজ শিখতে হবে। প্রয়োজনীয় সনদ নিতে হবে। ভাষা জানতে হবে। নিজের অধিকার বুঝতে হবে। অর্থাৎ প্রস্তুতি শুরু করতে হবে এখন থেকেই।
এবার তথ্যের বাজারে সরকার ও এনজিওর দায়িত্ব অনেক
সময় যতো গড়াচ্ছে, অপতথ্যের ঝুঁকি ততো বাড়ছে। ক্রমবর্ধমান সামাজিক মাধ্যমের গুজবের ভীড়ে সঠিক তথ্য প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়াই চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে সরকার-এনজিও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা জরুরি। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে গুজব ছড়ানোর আগেই তথ্য পৌঁছে দিতে হবে মানুষের কাছে। কোন খাতে কর্মী নেওয়া হবে? কতজন নেওয়া হবে? খরচ কত? কারা নিয়োগ করবে? কীভাবে আবেদন করতে হবে?
সব তথ্য দিতে হবে সহজ বাংলায়। শুধু ওয়েবসাইটে বিজ্ঞপ্তি দিলেই হবে না। তথ্য যেতে হবে গ্রামের হাট বাজারে, চায়ের দোকানে, প্রশিক্ষণকেন্দ্রে, মোবাইল ফোনে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
নিরাপদ অভিবাসনের মূল আচরণগুলো বদলাতে হবে-
শুনলেই বিশ্বাস নয়।
যাচাই ছাড়া টাকা নয়।
রসিদ ছাড়া লেনদেন নয়।
চুক্তি না পড়ে স্বাক্ষর নয়।
সরকারি তথ্য ছাড়া সিদ্ধান্ত নয়।
সাগর পথে বিদেশ নয়।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুললে বাংলাদেশ উপকৃত হবে। কর্মসংস্থান বাড়বে। রেমিট্যান্স বাড়বে। অনেক পরিবারের জীবন বদলাতে পারে। কিন্তু পুরোনো ভুল ফিরলে নতুন সুযোগ পুরোনো ক্ষত বাড়াবে। তাই সাফল্যের মাপকাঠি শুধু কতজন কর্মী গেলেন তা হওয়া উচিত নয়। দেখতে হবে, কতজন সঠিক চাকরিতে গেলেন। কত কম খরচে গেলেন। কতজন চুক্তি অনুযায়ী বেতন পেলেন। কতজন প্রশিক্ষণ নিয়ে গেলেন। কতজন প্রতারণার শিকার না হয়ে নিরাপদে পৌঁছালেন।
দরজা খোলার খবর গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশের আগেই ঘরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
লেখক: সাহস মোস্তাফিজ, উন্নয়ন যোগাযোগকর্মী।



