বাঙালি হিন্দু বা মুসলমানের ধর্মীয় উৎসব ঘিরে উত্তেজনা, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ–এগুলো থেকে পশ্চিমবঙ্গ অনেকদিন আগে নিজেদের মুক্ত করে নিতে পেরেছিল। ১৯৬৪ সালে কাশ্মীরের শ্রীনগরে পবিত্র হজরত বাল মসজিদে চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতসহ গোটা উপমহাদেশে এক বিধ্বংসী দাঙ্গা হয়। সেই দাঙ্গার প্রভাব সদ্য ভাগ হওয়া দুই বাংলার ওপরে যথেষ্ট পড়েছিল। পরবর্তী সময়ে একটা দীর্ঘ কাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের বুকে বাঙালি হিন্দু বা বাঙালি মুসলমানের কোনো ধর্মীয় উৎসব ঘিরে বড় কোনো রকমের বিভাজনের অবস্থা তৈরি হয়নি। ছোটখাটো উত্তেজনা যে কোথাও হয়নি–এ কথা বললে সত্যের অপলাপ হবে। কিন্তু কংগ্রেস, যুক্তফ্রন্ট, আবার কংগ্রেস, তারপর দীর্ঘকাল বামফ্রন্ট–যারাই যখন ক্ষমতায় থেকেছে এই রাজ্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাকে কোনোভাবে বাড়তে না দেওয়ার উদ্দেশে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে সেসব রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
যুক্তফ্রন্ট সরকার গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষ দিকে অজয় মুখোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী আর জ্যোতি বসু উপমুখ্যমন্ত্রী। হুগলির চন্দননগর সন্নিহিত তেলনীপাড়া এলাকায় দাঙ্গা লাগল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে জ্যোতিবাবু কালবিলম্ব না করে সংশ্লিষ্ট এলাকায় চলে গেলেন। পুলিশকে সুনির্দিষ্টভাবে নির্দেশ দিলেন ,দল-মত কোনো কিছু না দেখে, ধর্মীয় বিভাজন না দেখে, দাঙ্গাকারী মাত্রই গ্রেপ্তার করার। তাঁর নিজের রাজনৈতিক দলকেও দাঙ্গা মোকাবিলায় সবরকমভাবে প্রয়াসী হতে নির্দেশ দিলেন তিনি।
পরবর্তীকালে জ্যোতি বসু যখন সাতের দশকের মধ্যভাগ থেকে একটা দীর্ঘ সময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বা তাঁর অবসর গ্রহণের পর, দশ বছরের অল্প কিছু সময় বেশি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তাঁদের সময়কালে এই পরিস্থিতি বজায় ছিল।
ইন্দিরা গান্ধীকে হত্যার পর গোটা ভারতে দাঙ্গা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও দাঙ্গার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু জ্যোতিবাবু সেই ঐতিহাসিক উক্তি: সরকার না চাইলে দাঙ্গা হয় না–তার এক বাস্তবানুগ প্রয়োগ আমরা পশ্চিমবঙ্গে দেখেছি। একই অবস্থা হয়েছিল ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরবর্তী সময়কালেও। পশ্চিমবঙ্গের বুকে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছাড়ানোর অনেক চেষ্টা সেই সময় হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি করলেও পুলিশ-প্রশাসন এবং শাসকদলের সদিচ্ছায় সাম্প্রদায়িকদের অভিসন্ধি শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়েছিল।
আরও পড়ুন:
পশ্চিমবঙ্গ ওলট-পালট হয়ে গেছে ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর। এখন বাঙালির প্রতিটি ধর্মীয় উৎসবে একটা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি হওয়া এই রাজ্যের স্বাভাবিক ধারাপাতে পরিণত হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একই সঙ্গে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়েরই ধর্মান্ধ মৌলবাদী শক্তিকে বিগত তেরো বছর ধরে যেভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। তার জেরে পশ্চিমবঙ্গ সাম্প্রদায়িকতার জতুগৃহে পরিণত হয়েছে। মমতা যেভাবে ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক শক্তি আরএসএস এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিকে এই রাজ্যে সামাজিক, রাজনৈতিকভাবে পা রাখার সুযোগ করে দিয়েছেন এবং দিচ্ছেন, তাতে পশ্চিমবঙ্গে এখন একাধারে সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরুদের মাঝে যারা সংখ্যালঘু তারা সবাই অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে শুরু করেছে।
আরএসএস বিজেপির ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িকতাকে পরিপুষ্ট করবার লক্ষ্যে, তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সফল করবার লক্ষ্যে, পশ্চিমবঙ্গে শাসন ক্ষমতায় আসবার আগে থেকেই মমতা প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার আশ্রয় নিয়েছেন। পরবর্তীকালে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর সেই প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতাকে মমতা এবং তাঁর দল এমন একটা জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে, যার জেরে খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে কলেজে আইন পড়েছেন বলে দাবি করেন, সেই কলকাতার যোগেশচন্দ্র কলেজ কলকাতার একটি নামকরা আইন কলেজ। সেখানে সরস্বতী পুজোকে কেন্দ্র করে অনভিপ্রেত ঘটনা যা ঘটল, তার নিন্দা করার ভাষা নেই। মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেসের ছাত্র শাখার কয়েকজন সেই কলেজে সরস্বতী পুজো ঘিরে কিছু প্ররোচনামূলক কথাবার্তা বলে। আশ্চর্যের বিষয়, তৃণমূল কংগ্রেসের ছাত্র শাখার সেইসব দুর্বিনীত ব্যক্তিদের মধ্যে যে নেতা, সে জন্মসূত্রে মুসলমান। কলেজের অধ্যক্ষের ভূমিকাও যে খুব ধর্মনিরপেক্ষ ছিল, তা বলা যায় না। খানিকটা প্ররোচনামূলক ভূমিকা অধ্যক্ষও গ্রহণ করেছিলেন। বিষয়টি হাইকোর্ট অবধি গড়ায়। হাইকোর্টের নির্দেশে পুলিশ পাহারায় ওই কলেজে সরস্বতী পুজো অনুষ্ঠিত হয়।
এখানেই যে ব্যাপারটা শেষ হয়ে গেল, তা কিন্তু নয়। ঠিক বিজেপি যেটা চাইছিল, আরএসএস যেটা চাইছিল, পশ্চিমবঙ্গের শাসক তৃণমূল কংগ্রেস সেটাই কিন্তু করল। আরএসএস-বিজেপির পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গ ঘিরে অভিযোগ; মমতা নাকি এমনই ‘মুসলমান তোষণ’ করেন এখানে, যার জেরে হিন্দুদের পুজোআচ্চা প্রায় বন্ধ হওয়ার জোগাড় হয়েছে।
এই বিষয়টি গত বছর লোকসভা নির্বাচনের সময় বিভাজনের রাজনীতিকে জোরদার করবার লক্ষ্যে, বিজেপির পক্ষ থেকে আরএসএসের পক্ষ থেকে এবং তাদের হাজার রকমের শাখা সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রচার করা হয়েছিল। যার প্রভাব বিশেষভাবে পড়েছিল মুর্শিদাবাদ জেলায়। সেখানে আরএসএসের অন্যতম একটি শাখা সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের লেবাস নিয়ে, যে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রদায়িক কার্যক্রম ভারতজুড়ে চলছে, সেই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে, তাদের একজন ব্যক্তি, যিনি নিজেকে সন্ন্যাসী বলে দাবি করেন, অথচ সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং প্ররোচনার সঙ্গে তিনি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকেন। এমন ব্যক্তি, এই মমতার শাসনকালে মুসলমানদের বাড়াবাড়ির জন্য হিন্দুরা পশ্চিমবঙ্গের বুকে পুজো করতে পারছে না, ধর্মাচারণ করতে পারছে না–এ অভিযোগ তুলে বিভাজনের খেলায় মেতেছিলেন। যার জেরে বিজেপির স্বাভাবিক মিত্র তৃণমূল কংগ্রেস মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে সিপিআই (এম)-এর মহ. সেলিম এবং কংগ্রেসের অধীর চৌধুরীকে লোকসভার ভোটে হারিয়ে দিতে সক্ষম হয়।
আরও পড়ুন:
সরস্বতী পুজোকে কেন্দ্র করে কলকাতার যোগেশচন্দ্র কলেজে যে ঘটনা ঘটল এবং তাকে ঘিরে খোদ রাজ্য প্রশাসনের যে ভূমিকা, তাতে এই জায়গাটা খুব পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে, পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের জন্য হিন্দুদের ধর্মাচারণ সংকটের মধ্যে রয়েছে–আরএসএস ও বিজেপি বা গোটা হিন্দুত্ববাদী শিবিরের এই প্রচার আরো যাতে বেগবান হয়, সেজন্য ঘটনাটি খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দলের কর্মতৎপরতায় সরস্বতী পুজোকে কেন্দ্র করে ঘটানো হয়েছে।
এটাই তো অমিত শাহ চাইছিলেন। এটাই তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চাইছিলেন। গোটা ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক শিবির এবং প্রতিযোগিতামূলক সম্প্রদায়িক শিবির ঠিক এইভাবে ধর্মের নামে বাঙালিকে হিন্দু-মুসলমানের বিভাজিত করে পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনকে পরিচালিত করতে চান। সেই বিষয়টাই কিন্তু সরস্বতী পুজো ঘিরে যোগেশচন্দ্র কলেজে যে ধরনের কর্মকাণ্ড ঘটল শাসকদলের প্রত্যক্ষ মদদে, তা থেকে খুব পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে।
এখন থেকেই ধর্মের নামে হিন্দু-মুসলমানকে আলাদা করে দিয়ে উভয় ধর্মের ধর্মপ্রাণ, সহজ-সরল মানুষগুলোকে একদিক থেকে নিজের নিজের ধর্মের পালন ঘিরে এক ধরনের বিপন্নতার মানসিকতা তৈরি করে দেওয়া। এটা হচ্ছে মোদী-মমতার যৌথ পরিকল্পনাতে। আর তাদের আরেকটি পরিকল্পনা হলো, এই যে উভয় ধর্মের মধ্যে যারা উগ্রতায় বিশ্বাসী, মৌলবাদী সম্প্রদায়িক, ধর্মের রাজনৈতিক কারবারি–তাদেরকে পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে প্ররোচিত করে, উত্তেজিত করে, রাজনৈতিক হিংসার মধ্যে দিয়ে একটা মেরুকরণের রাস্তা তৈরি করা। মেরুকরণের প্রভাব ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটে পশ্চিমবঙ্গে পড়ুক এটাই এখন মোদী-মমতার যৌথ মিশন।
যোগেশচন্দ্র কলেজে সরস্বতী পুজোকে ঘিরে ইতোমধ্যেই হিন্দু বিপন্নতার ফাঁকা আওয়াজ সাম্প্রদায়িক শক্তি দিতে শুরু করে দিয়েছে। আর এই হিন্দু বিপন্নতার সঙ্গে সম্পৃক্ত করে দেওয়া হচ্ছে হিন্দু নারীদের বিপন্নতাকে। বলা হচ্ছে 'রেপ থ্রেটে' র কথা। এখানে ব্যবহার করা হচ্ছে যোগেশচন্দ্র কলেজের ছাত্রীদের বিপন্নতার কথা, যাতে খুব সহজে সাধারণ মানুষকে ধর্মের নাম করে উত্তেজিত করে তুলে, অপর ধর্মের মানুষ সম্পর্কে একটা ঘৃণার সাগরে তাদের নিমজ্জিত করতে পারা যায়।
আমাদের গভীরভাবে ভাবা দরকার, কেন খোদ কলকাতার বুকে একটি কলেজে সরস্বতী পুজোকে কেন্দ্র করে এমন পরিবেশ তৈরি হলো, যার জেরে আদালতকে হস্তক্ষেপ করতে হলো। সশস্ত্র পুলিশ বসিয়ে, ছাত্রছাত্রীদের পরিচয়পত্র দেখে, তাদের ঢুকতে দেওয়ার মত পরিস্থিতি তৈরি হলো? সাধারণভাবে পশ্চিমবঙ্গে সরস্বতী পুজো বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই হয়। এক স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী অন্য স্কুলে যায় প্রতিমা দর্শন করতে। কলেজের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। পরস্পরের মধ্যে একটা সৌহার্দ্যের পরিবেশ থাকে। কোথাও কখনো ছাত্রছাত্রীদের পরিচয়পত্র দেখে তাঁদের ঢুকতে দেওয়া বা অপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের ঢুকতে না দেওয়া–এমন পরিবেশ গত এক শ বছরে এ বাংলার বুকে ঘটেনি।
যোগেশচন্দ্র কলেজের এই ঘটনাটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘটতে দিলেন এই কারণেই যে, যাতে বিজেপি-আরএসএসসহ গোটা হিন্দুত্ববাদী শিবির বলতে পারে; পশ্চিমবঙ্গে বাঙালি হিন্দুদের সরস্বতী পুজো করতে মুসলমানদের জন্য সমস্যা হয়। এভাবে কেবল যে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবেশকে নষ্ট করবে তারা তা নয়। এই ঘটনার যে গোটা ভারতে টেনে এনে, গোটা ভারত জুড়ে সহ-নাগরিক মুসলমানদের সম্পর্কে বিদ্বেষের রাজনীতি করবে ধর্মান্ধ সংঘ-বিজেপি–সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। দিল্লি বিধানসভার ভোটপর্ব চলছে। চলতি বছরের শেষের দিকে বিহার বিধানসভার ভোট হতে চলেছে। বিহার বিধানসভায় নীতিবিহীন জোটের মাধ্যমে বিজেপি ক্ষমতায় থাকতে পারবে না–এটাই প্রায় নিশ্চিত হয়ে উঠছে। বামপন্থিরা নানাভাবে বিহারে তাদের রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি করেছে।
বিহার পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত লাগোয়া একটি রাজ্য। সেই কারণে মমতার এই কৌশল আরও ক্ষিপ্র হয়ে উঠেছে। যার দরুন প্রগলভ রাজনীতিক হিসেবে ভারতের খ্যাতিপ্রাপ্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ঘটনা ঘিরে এখনো পর্যন্ত একটা শব্দ উচ্চারণ করেননি।
লেখক: ভারতের পশ্চিমবঙ্গের গবেষক ও কলাম লেখক
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]