নয়া বিশ্ব: শি, পুতিন, মোদি বনাম নিঃসঙ্গ ইউরোপ

অনেক বিরোধের পরও ব্রিকস গঠিত হয়েছে। এশিয়ার দেশগুলোর বৃহত্তর জোট হিসেবে তারা আত্মপ্রকাশ করেছে। এআইআইবি, সিএফআর ও এনডিবি গঠন হয়েছে। এর মধ্যে এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের (এশিয়ান ইনফ্রাস্টাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক–এআইআইবি) বর্তমান সদস্য সংখ্যা ১১০, যার সদর দপ্তর বেইজিংয়ে। শুধু তাই নয়, নামে এশীয় হলেও এই উদ্যোগের সঙ্গে এখন পর্যন্ত যুক্ত হয়েছে এশিয়ার ৪২, আফ্রিকার ২২, ওশেনিয়ার ১০, দক্ষিণ আমেরিকার ৮ এবং এমনকি ইউরোপের ২৬ ও উত্তর আমেরিকার ২ দেশও। এই ব্যাংকের প্রাথমিক প্রস্তাবটিও কিন্তু এসেছিল ২০০৯ সালে। যদিও এটি বাস্তবে রূপ নেয় ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে। ফলে বুঝতে কষ্ট হয় না যে, এই উদ্যোগগুলো বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন অর্থনৈতিক অস্ত্রাগারগুলোকে আতঙ্কিত করবে। করেছেও তাই। এরই ফল হিসেবেও কিন্তু রাশিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিন, চীনে শি জিনপিংকে পাঠ করা যেতে পারে, যা মাইকেল কিমেজ এড়িয়ে গেছেন।

সে যাক। রাশিয়া, চীন, ভারত ও ব্রাজিলে যথাক্রমে ভ্লাদিমির পুতিন, শি জিনপিং, নরেন্দ্র মোদি এবং কিছু পরে ব্রাজিলে জায়ের বোলসোনারোর হাজির হওয়াটা তাই একসূত্রেই গাঁথা। বিবদমান পক্ষগুলোয় যখন এমন উত্থান হয়, তখন একমেরুর কেন্দ্র কোন আশায় বসে থাকবে? সেখানেও উত্থান ঘটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের, যিনি মাঝের এক মেয়াদ পেরিয়ে এখন ভীষণভাবেই বাস্তব।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৬ সালেই ‘মেক আমেরিকা গ্রেট আগেইন’ বা মাগা ও ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ স্লোগান নিয়ে হাজির হন। তাঁর কর্মপন্থা ও প্রতিশ্রুতিগুচ্ছের কেন্দ্রে রয়েছে লোকরঞ্জনবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ, বিশ্বায়নবিরোধী চেতনা। এই একই আমেরিকা ফার্স্ট ধারা কিন্তু ১৯৩০‑এর দশকেও ছিল, ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধত্তর ১৯৫০ দশকের অ্যান্টি‑কমিউনিজম স্লোগানের আড়ালেও। সেটা তখনকার দ্বিমেরু বিশ্বকাঠামোয় অবধারিত মার্কিন নীতি। প্রতিপক্ষ হিসেবে সেই স্নায়ুযুদ্ধের কালে আর কেউ ছিল না। সেই সময়েও আমরা একের পর এক সদ্য স্বাধীন দেশকে এই দুই শক্তির পকেটে ঢুকতে দেখেছি। কে কটি দেশকে পকেটে পুরতে পারবে, সেটাই ছিল মূল প্রতিযোগিতা। সাথে অতি অবশ্যই একটা তত্ত্বের প্রতিযোগিতা ছিল। একটা অর্থনৈতিক কাঠামো, একটা আদর্শের লড়াই ছিল সেটা। সেই কালেও আমরা বিধিবদ্ধ ও নীতিচালিত কাঠামোর পরাজয় দেখেছি। এই একই পদ্ধতি ও কৌশল কি এখনো চলছে না? নয়া বিশ্বব্যবস্থার যাত্রা ও তার সাথে চলা লড়াই কোনো ক্ষেত্রে যদি যুদ্ধকে, তা কোনো ক্ষেত্রে গৃহযুদ্ধ, আবার কোথাও অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা বা বিপ্লব নামে হাজির হয়ে ওলট‑পালট করে দিতে চাইছে।

ফেরা যাক চলমান আলোচনায়। ২০১২ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যেই বিশ্ব মোটামুটি তার ভবিষ্যৎ নির্ধারক শক্তির মুখগুলোকে পেয়ে গেছে। এই মুখগুলো বিদ্যমান ব্যবস্থাকে নবায়নের নামে নতুন রাজত্বের ভাগ‑বাটোয়ারায় মেতেছে। বিভিন্ন দেশে তাদের প্রযোজিত পরিবর্তন বা পরিবর্তনকামী আন্দোলন বা অভ্যুত্থান বা বিপ্লব মুখ্যত রক্ষণশীলতাই ডেকে আনছে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় ঐতিহ্য, গৌরব, সাম্প্রতিক ইতিহাসের বাঁকবদলের চেয়ে আরও পুরোনো ইতিহাসের মাটি খুঁড়ে দেখা, ধর্মীয় ও জাতিতাত্ত্বিক জাতীয়তাবাদের আগুনে ঘি ঢালছে।

বাম পাশ থেকে ভ্লাদিমির পুতিন, নরেন্দ্র মোদি ও শি জিনপিং। ফাইল ছবিসেটা কী রকম। মাইকেল কিমেজ একটি জায়গা বেশ ভালো চিহ্নিত করেছেন। তিনি তাঁর নিবন্ধে বলছেন, ১৯৯০‑এর দশকের শুরুতে ‘সভ্যতার সংঘাত’ বইয়ে স্যামুয়েল হান্টিংটন কথিত সভ্যতার সংঘাত কিংবা ‘ইতিহাসের মৃত্যু’ ইত্যাদিকে এই নেতারা আবার সামনে এনে হাজির করেছেন। অনেকে সভ্যতার সংঘাতের পরবর্তী অধ্যায়ে ‘ইসলাম বনাম অন্যরা’ বলে যাকে চিহ্নিত করেছিলেন এবং যার প্রমাণ হিসেবে তাঁরা ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’‑কে হাজির করেছেন, তাঁরা এবার একটু মত বদলাবেন হয়তো। এক নয়া সভ্যতার সংঘাতের ব্যবস্থাপত্র যে হাজির।

অর্থোডক্স রাশিয়া অর্থোডক্স ইউক্রেনে অভিযান চালিয়েছে, কোনো মুসলিম অধ্যুষিত দেশে নয়। এ ক্ষেত্রে রুশ কর্তৃপক্ষ নিজেদের ‘সিভিলাইজেশন স্টেট’ পরিচয় সামনে হাজির করে ইউক্রেনে আধিপত্য ও বেলারুশকে নিজের বলয়ে টানার অজুহাত দিয়েছে। ২০২৪ সালে গণতন্ত্র সম্মেলনে মোদি গণতন্ত্রকে ‘ভারতীয় সভ্যতার রক্তপ্রবাহ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর হাতে আছে চিরপরিচিত ‘হিন্দুত্ববাদী’ কার্ড। উত্তরপ্রদেশ থেকে সারা ভারতে ছড়িয়ে এখন তা পশ্চিমবঙ্গেও হাজির প্রায়। এই তো কিছুদিন আগেই দিল্লি দখল সম্পন্ন হলো। ২০২০ সালে এরদোগান তুরস্কের ‘সভ্যতাকে হুমকির’ মুখে বলে ঘোষণা দিয়েছেন। ২০২৩ সালে শি জিনপিং চীনকে একমাত্র সভ্যতা, যা রাষ্ট্র হিসেবে এখনো অব্যাহত ও অবিচ্ছিন্ন বলে মন্তব্য করেছেন।

অর্থাৎ, এই সরকার ও রাষ্ট্র প্রধানেরা সবাই কোনো না কোনোভাবে একটা সিভিলাইজেশন স্টেটের কথাই বলছেন। শুধু বলছেন না, এর পক্ষে আবার এই দাবির সমর্থনে নানা চিহ্নসমষ্টিকেও হাজির করার চেষ্টা করছেন। বিশ্বব্যবস্থার নবায়ন সম্পর্কিত যাবতীয় বিষয়াদি এখন এই সভ্যতাকেন্দ্রিক ভাষ্য ও পাল্টা ভাষ্যের সংঘাত ও সংশ্লেষের ওপর নির্ভর করছে।

পর্যাপ্ত উত্তাপ ও চাপে যেমন শিমুল বীজ ফেটে তুলা বেরিয়ে আসে, ছড়িয়ে যায় চারপাশে। ঠিক তেমনি বৈশ্বিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কেরও নবরূপটি ধরা দেবে এই সভ্যতাকেন্দ্রিক সংঘাত এবং তা থেকে উদ্ভূত উত্তাপ ও চাপের হিসাব মেনে। এ ক্ষেত্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ নিশ্চিতভাবেই একটা বড় ভূমিকা নেবে। কারণ, মার্কিন ব্লকের ক্ষয়িষ্ণু প্রভাববলয় পুনরুদ্ধারের পথে ট্রাম্পের গৃহীত নীতিই আসলে বাকি পক্ষগুলোকে পথ দেখাবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প এরই মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর মার্কিন প্রস্তাবিত ও অনুসৃত বিশ্বব্যবস্থাকে খারিজের পথে হাঁটছেন। তিনি বিদ্যমান ব্যবস্থায় অনুসৃত নীতি বা বিধিমালাকে পায় পিষছেন। তিনি ও তাঁর প্রশাসন বলছে, কোনো একক নীতি নেই। ফলে আঙ্কারা, বেইজিং, নয়াদিল্লি, ওয়াশিংটনসহ অপরাপর মাঝারি শক্তির দেশগুলোও একই ভাষ্যকে সামনে আনছে। ফলে ‘পশ্চিম’ বলতে যে ধারণা ও তার যে আধিপত্য, তা ক্রমে ক্ষয় হতে শুরু করবে। এরই মধ্যে তার লক্ষণগুলো প্রকট হতে শুরু করেছে। 

ইউরোপ কি আসলেই একলা হয়ে পড়বে?
মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গোটা ইউরোপ ওয়াশিংটনের ছায়াতলে (নিরাপত্তা গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা অর্থে) গিয়ে যেভাবে আশ্রয় নিয়েছিল এবং এই আশ্রয়-প্রশ্রয়কে যূথবদ্ধভাবে যেভাবে তারা ‘পশ্চিমা বিশ্ব’ বলে প্রচার করত, তা আর আগের মতো নেই। এরই মধ্যে সেই যৌথায়নের গাটছড়ায় ছেদ ঘটে গেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের মীমাংসা খুঁজতে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের গৃহীত উদ্যোগের মধ্যেই এই ছেদের চিহ্ন রয়েছে। ইউরোপ এই চিহ্নটি যথাযথভাবে পাঠ করতে পেরেছে বলতে হবে। এ কারণেই তারা মুরব্বি রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের হাত তুলে নেওয়ার পর নিজেরা ইউক্রেনের সহায়তায় এগোনোর চিন্তা করছে। একের পর এক বৈঠক করছে। এর মূলে আছে আতঙ্ক। কী সেই আতঙ্ক?

আতঙ্কটি হলো–যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র হয়ে উঠতে চাইছে। পশ্চিম বলতে কোনো একক ধারণাকে পুষতে তারা আর রাজি নয়। ফলে ইউরোপ একলা হয়ে পড়তে চলেছে। বাকি বিশ্বে একের পর এক গজিয়ে ওঠা শক্তি এবং নিজেদের প্রান্ত বলে মনে করা রাশিয়ার বিশ্বমঞ্চে ফিরে আসার ইঙ্গিতে তারা প্রমাদ গুনছে। তারা বুঝতে পারছে যে, ওয়াশিংটন এই পথে পুরোপুরি হাঁটা শুরু করলে বিধিবদ্ধ বিশ্বব্যবস্থা বলে আর কিছু থাকবে না, যা দিয়ে তারা বাকি বিশ্বকে এক অর্থে পরোক্ষ শাসন করত।

ফাইল ছবিওয়াশিংটনের ওপর তার দীর্ঘদিনের নির্ভরতার ফল হচ্ছে এখন না আছে তার উৎপাদন, না আছে বিশ্ব শাসনের মতো সমর শক্তি। এমনকি এই মস্কো, বেইজিং, ওয়াশিংটন, নয়াদিল্লিসহ শক্তিধর দেশগুলোর নেতাদের চোখে চোখ রেখে কথা বলবার মতো দৃঢ়চেতা নেতৃত্বও তাদের নেই।

তবে এ ক্ষেত্রে মনে রাখা জরুরি যে, বিদ্যমান ঘোষিত ব্যবস্থার মুরব্বি হিসেবে যে ‘পশ্চিমা বিশ্ব’, ‘পশ্চিমা সভ্যতা’ বা ‘পশ্চিমা ধারণা’ সামনে আছে, তা নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর যে আবেগ, তাতে তাদের যে এখতিয়ার, তা কিন্তু মার্কিনিদের নেই। যুক্তরাষ্ট্র এখানে অনেকটাই বহিরাগত বলা যায়। জার্মানি, ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি, পর্তুগাল, গ্রিস, নেদারল্যান্ডস ইত্যাদি দেশের রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী ইতিহাস। রয়েছে নিজ নিজ জাতিগত গৌরব, যাতে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বশাসনের বদৌলতে ভাগ বসিয়েছে মাত্র।

এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে মাইকেল কিমেজ তাঁর নিবন্ধে ওয়াশিংটনকে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলছেন, বেশ কিছু বছর ধরে যে নয়া বিশ্বব্যবস্থার পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে, তা বাস্তবায়নের সক্ষমতা ট্রাম্প প্রশাসনের রয়েছে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে তাঁকে ও তাঁর প্রশাসনকে কূটনীতির প্রতি বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত। কারণ, বেশ কিছু শক্তিধর দেশ একই পথে একটা নয়া ব্যবস্থার জন্ম দিতে আগ্রহী। ফলে দেশে দেশে জাতীয়তাবাদের উত্থান এক নয়া ও বিস্তৃত সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করবে। এ ক্ষেত্রে কূটনীতিতে যুদ্ধংদেহী মনোভাব যুক্তরাষ্ট্রকে বিপাকে ফেলতে পারে। নিশ্চিতভাবেই কিমেজের এই পরামর্শকে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। (চলবে)

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন 

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]

আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন
ক. নয়া বিশ্ব: ডোনাল্ড ট্রাম্প আসলে পৃথিবীটা কেমন চান