আমাদের সামনে একটা বিরাট বিপর্যয় আসবে, এটা প্রায় নিশ্চিত। আর এই বিরাট বিপর্যয় হলো, সম্ভবত আমরা পৃথিবীর এক নম্বর শক্তি আমেরিকা ও বিশ্বের এক নম্বর উদীয়মান শক্তি চীনের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব দেখতে পাব। আগামী দশকে এই প্রতিযোগিতা যে আরও তীব্র হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই আমি আমার বই ‘হ্যাজ চায়না ওয়ান’-এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছি।
আমার আজকের বক্তব্যে আমি আপনাদের কাছে এই মার্কিন-চীন ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করতে চাই। কিন্তু আমি যখন তা করছি, তখন আমি বিশেষ করে আমার এশীয় বন্ধুদের, যারা বিশ্বের জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, তাদের প্রতি জোর দিয়ে বলতে চাই যে, আপনারা নিষ্ক্রিয় থাকবেন না, চুপ করে থাকবেন না। কথা বলুন। জোরে ও স্পষ্টভাবে কথা বলুন। আমেরিকা ও চীন এই দ্বন্দ্বে লিপ্ত হওয়ার আগে তাদের আরও বিজ্ঞতার পরিচয় দিতে বলুন। কারণ এটি কেবল আমেরিকান ও চীনাদের ওপর প্রভাব ফেলবে না, এটি এশিয়াসহ সমগ্র বিশ্বকে প্রভাবিত করবে। এই কারণেই আমাদের এই দ্বন্দ্বটি বুঝতে হবে। বোঝার পরে, আসুন আমরা কথা বলি। আজ আমার মন্তব্যের লক্ষ্য হলো, এই দ্বন্দ্বের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করা। আমি পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দিতে যাচ্ছি। প্রথম প্রশ্ন: এই দ্বন্দ্বের কাঠামোগত কারণগুলো কী কী? দ্বিতীয় প্রশ্ন: এই দ্বন্দ্বে আমেরিকা ও চীন কী ভুল করেছে?
তবে আমার সন্দেহের তৃতীয় প্রশ্নটি হলো, যেটি সম্পর্কে আপনারা সকলেই সবচেয়ে বেশি আগ্রহী। আমেরিকা ও চীনের মধ্যেকার এই দ্বন্দ্বে কে জিতবে? চতুর্থ প্রশ্নের উত্তর আমি দেব, এই মার্কিন-চীন দ্বন্দ্বে অন্যান্য দেশ ও অঞ্চল কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে? এবং পরিশেষে, আমরা এ ব্যাপারে কী করতে পারি? আমরা কীভাবে এটি সামলাব? আমি আবারও আমার বক্তব্যটি পুনর্ব্যক্ত করতে যাচ্ছি যে, আমাদের এ ব্যাপারে কথা বলা উচিত। কিন্তু এর প্রতিক্রিয়ায় বুদ্ধিমত্তা ও চিন্তাভাবনা করেই কথা বলতে হলে, আমাদের বুঝতে হবে কেন এটি ঘটছে। এটি আসলে আমাকে আমার প্রথম প্রশ্নের দিকে নিয়ে যায়। এই মার্কিন-চীন ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কাঠামোগত কারণগুলো কী কী?
এটি আসলেই হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা ভূ-রাজনৈতিক অভিঘাতের ফসল। সুতরাং এটি দেখিয়ে দেয় যে, ভূ-রাজনীতি শুধু ব্যক্তিত্বের বিষয় নয়, এটি মূলত গভীর কাঠামোগত শক্তির ভূমিকা সম্পর্কিত। তাই যখন আমেরিকা চীনকে এক নম্বর হওয়া থেকে বিরত রাখার জন্য উঠেপড়ে লাগে, তখন এটি সেই পুরানো ভূ-রাজনৈতিক অভিঘাতেরই ফল হিসেবেই বিবেচিত হয়। তবে আরও দুটি কাঠামোগত শক্তি রয়েছে। প্রথমটি সম্পর্কে সবাই কথা বলে। দ্বিতীয়টি সম্পর্কে কেউ কথা বলে না। কারণ এটি সম্পর্কে কথা বলা রাজনৈতিকভাবে ভুল।
আর এটাই হলো পশ্চিমা কল্পনায় হলুদ বিপদের (পশ্চিমারা বিশেষত চীনাদের ‘ইয়োলো’ বলে অভিহিত করে) ভয়। আট শ বছর আগে মোঙ্গলরা ইউরোপকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পর থেকে এই ভয় চলে আসছে। এখন এটি এমন একটি বিষয়, যা পশ্চিমের কেউ কখনো আপনার কাছে বলবে না। তবে এশিয়ার বাসিন্দা হিসেবে আমাদের স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে যে, আবেগসঞ্জাত কারণেই এটি বেশ কার্যকরভাবেই মার্কিন-চীন দ্বন্দ্বে জড়িয়ে আছে। আর চীনের বিরুদ্ধে অযৌক্তিক পদক্ষেপ নেওয়া কেন হয়েছে তা-ও লুকিয়ে আছে এই হলুদ বিপদে।
আপনাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো ভাবছেন, এটা সত্য হতে পারে না। নিশ্চয়ই বড় দেশগুলো হলুদ বিপদের ভয়ের মতো স্থূল আবেগ দ্বারা পরিচালিত হয় না। আমি আপনাদের মনে করিয়ে দিচ্ছি যে, ১৩০ বছর আগে, মার্কিন কংগ্রেসে চাইনিজ রেসিয়াল এক্সক্লুশান অ্যাক্ট নামে একটি আইন পাস করেছিল। এটিই প্রমাণ দেয় যে হলুদ বিপদ বাস্তব এবং আমাদের এটি মোকাবিলা করতে হবে। এই দ্বন্দ্বে তৃতীয় কাঠামোগত শক্তি হলো আমেরিকার কিছুটা অস্বাভাবিক দ্বিদলীয় ঐক্যমত্য যে, চীন তাদের দেশকে হতাশ করেছে।
আমার এক বন্ধু, কার্ট ক্যাম্পবেল ফরেন অ্যাফেয়ার্স ম্যাগাজিনে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। সেখানে তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, আমেরিকা আশা করেছিল চীন তাদের মতোই হবে। কিন্তু এটা স্পষ্ট চীন খুব শিগগিরই একটি উদার গণতন্ত্রে পরিণত হবে না। যে আমেরিকানরা এতে হতাশ, আমি প্রায়শই যথেষ্ট বিনয়ের সাথে তাদের বলি, কেন এটা হবে না। আমেরিকা একটি তরুণ রাষ্ট্র, যার বয়স ২৫০ বছরেরও কম। আর চীনের সভ্যতা হাজার হাজার বছরের। আমেরিকার জনসংখ্যা চীনের এক‑চতুর্থাংশ। ফলে কীভাবে আমেরিকার মতো একটি তরুণ দেশ বিশ্বাস করতে পারে যে, তারা চারগুণ জনসংখ্যার এবং চার হাজার বছরের সভ্যতাকে পাল্টে দিতে পারবে?
আমেরিকান মনের সম্পূর্ণ অবাস্তব ধারণার এটি একটি উদাহরণ। ঠিক এ কারণেই আমাদের এশীয়দের কথা বলা এবং আমেরিকানদের একটি মৌলিক সত্য জানানো প্রয়োজন। চীন চীনই হবে। চীন তার দীর্ঘ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে বিকশিত হয়েছে ও হবে। আমেরিকার উচিত, চীনকে বদলানোর ভ্রান্ত ধারণা ত্যাগ করা। কিন্তু আপনি দেখতে পাচ্ছেন যে, এই কাঠামোগত শক্তিগুলোই এই দ্বন্দ্বকে চালিত করছে। তারা আরও তীব্রতর হয়েছে।
কিন্তু আপনারা জানেন যে, ২০২০ সালে ট্রাম্প যখন বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করেন, তখনো আমেরিকান ব্যবসায়ীরা ক্ষুব্ধ ছিল। তারা স্পষ্টতই এই ভেবে বিরক্ত হয়েছিল যে, তারা চীনে তাদের ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি হারিয়েছে। কারণ আমেরিকা থেকে চীনা সংস্থাগুলোতে প্রযুক্তি হস্তান্তরের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। যেখানে সমান সুযোগ ছিল না। এই অভিযোগগুলো পরিচিত। আপনি সাংহাই ও বেইজিংয়ের মার্কিন চেম্বার অব কমার্সের ওয়েবসাইটে এগুলো খুঁজে পেতে পারেন। এটা চীনাদের একটা ভুল।
কিন্তু আমেরিকা যে ভুলটি করেছিল, তা কিছু দিক থেকে আরও মৌলিক। আমেরিকা কোনো কৌশল ঠিক না করেই চীনের বিরুদ্ধে ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে জড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন আপনি বিবেচনা করেন, যেখানে আমেরিকায় বিশ্বের সেরা স্ট্রাটেজিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্বের সেরা ও পরিচিত কুশলী চিন্তক আছেন, তাঁদের কোনো কৌশল থাকবে না? তা কি হয় কখনো! কিন্তু সেটাই হয়েছে। ২০১৮ সালের মার্চে ড. হেনরি কিসিঞ্জার আমাকে এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন। ওই সময় আমার বই ‘হ্যাজ চায়না ওয়ান?’ লেখার জন্য আলাপ করতে তাঁর সাথে একান্তে মধ্যাহ্নভোজ করেছিলাম। আমি আসলে বইটিতে এ কথা লেখার জন্য তাঁর অনুমতি পেয়েছিলাম যে, আমেরিকার কোনো কৌশল বা পরিকল্পনা নেই।
আসলে, আমেরিকানরা হেরে যাওয়ার আশঙ্কা কল্পনাও করতে পারে না। আর এখানে আমরা ও আমি, যারা নিজেকে অনেক দিক থেকে আমেরিকার বন্ধু মনে করি, তাদের সকলের জন্য বিষয়টি একই। আসলে আমাদের আমেরিকান বন্ধুদের বুঝতে সাহায্য করা উচিত যে, তাদের হেরে যাওয়ার আশঙ্কার কথা বিবেচনা করা উচিত। কেন এমন হয়? উত্তরটি খুবই জটিল। আমি সত্যিই দুঃখিত। আমি আপনাকে এটি সম্পর্কে কেবল একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা দিতে পারি। তবে আমি আশা করি, আপনি যখন আমার বইটি হাতে নেবেন, তখন আপনি এটি সম্পর্কে আরও পড়বেন।
আমেরিকানরা হেরে যাওয়ার আশঙ্কা কল্পনাও করতে পারে না কারণ, তারা এটিকে খুব সহজ ও স্পষ্টভাবে আমেরিকার একটি প্রাণবন্ত গণতন্ত্র এবং চীনের একটি কঠোর কমিউনিস্ট পার্টি ব্যবস্থার মধ্যেকার প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখে। আর বলে যে, গণতন্ত্র সর্বদা কমিউনিস্ট পার্টি ব্যবস্থাকে পরাজিত করে। আপনি শীতল যুদ্ধে এটিই দেখেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টিকে দুর্দান্তভাবে পরাজিত করেছিল। তাহলে এটা আর এমন বড় কথা কী? আরেকটি কমিউনিস্ট পার্টিই তো। অবশ্যই আমেরিকান গণতন্ত্র এটিকে পরাজিত করবে। আসলে কিছুটা হলেও আমি এই যুক্তির প্রতি সহানুভূতিশীল। যদি এটি আসলেই যুক্তরাষ্ট্রের একটি গণতন্ত্র এবং চীনের একটি কঠোর কমিউনিস্ট পার্টি ব্যবস্থার মধ্যকার প্রতিযোগিতা হতো, তাহলে হ্যাঁ, গণতন্ত্র জিততে পারত।
আরেকজন নোবেল বিজয়ী যেমন বলেছেন, আমেরিকান শ্রমিক শ্রেণি হতাশার সাগরে ডুবে আছে। তাই আমেরিকান গণতন্ত্র গুরুতর অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। আর সেই কারণেই যখন আপনি এত অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন, তখন চীনের বিরুদ্ধে একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া খুবই বোকামি। কারণ চীন আজ নিজেকে সঠিকভাবে বদলে ফেলেছে। আজকের চীন কার্যত বিশ্বের বৃহত্তম মেধাতন্ত্র। মেধাতন্ত্র কী? মেধাতন্ত্র একটি ব্যবস্থা এবং আমার মনে হয়, অনেক সিঙ্গাপুরবাসী এটি জানেন, যেখানে আপনি সমাজ পরিচালনার জন্য সেরা মেধাবীদের বেছে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এবং এটি সমাজের কর্মক্ষমতার দিক থেকেও প্রমাণিত হয়।
আর তাই মার্কিনিদের বন্ধু হিসেবে আমাদের বলা উচিত, ‘আরে, এই প্রতিযোগিতা শুরু করার আগে কেন তোমরা পিছিয়ে যাও না, একটি বিস্তৃত দীর্ঘমেয়াদী কৌশল তৈরি করো না?’ অপেক্ষা কর এবং বিরতি দাও। কারণ, এটি তোমার জন্য ভালো হবে। দুর্ভাগ্যবশত, অন্তত একান্তে, বেশির ভাগ দেশই এটাই বার্তা পাঠাচ্ছে। কারণ, আমার চতুর্থ প্রশ্নের উত্তরে, অন্যান্য দেশগুলো কীভাবে নির্বাচন করছে–সে ব্যাপারে আমেরিকানরা যদি যথেষ্ট সংবেদনশীল ও মনোযোগী হয়, তাহলে তারা লক্ষ্য করবে যে, এটা শীতল যুদ্ধের মতো নয় যখন এত এত দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে উৎসাহের সাথে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন করেছিল। ইউরোপীয়রা সমর্থন করেছিল। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন করেছিল। এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ঠান্ডা যুদ্ধে মিশরের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশ, পাকিস্তানের মতো, ইন্দোনেশিয়া মতো দেশও যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন করেছিল।
(আমেরিকা ও চীনের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এবং অন্যান্য দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিঙ্গাপুরে এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্য, যা ইউটিউবের সূত্রে সংগৃহীত। কিশোর মাহবুবানি বক্তব্যটি রেখেছেন ইংরেজিতে, যা কিছুটা সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশ করা হলো।)
লেখক: সিঙ্গাপুরের একজন সাবেক কূটনীতিক ও ভূ-রাজনৈতিক পরামর্শদাতা।
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]