গণদাবির বিস্ফোরণ ও জনদুর্ভোগ

বিগত সরকারের পতনের পর যে ব্যাপারটা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে, তা হলো গণদাবির বিস্ফোরণ। যে যেখানে আছে, সেখান থেকে দাবি পেশ করছে। একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের কাছে দাবি‑দাওয়া পেশ করলে সরকার সেদিকে সজাগ দৃষ্টি দেবে–এটাই কাম্য। তাহলে অসুবিধা কোথায়? অসুবিধা হচ্ছে, যেভাবে এই দাবিগুলো করা হচ্ছে, তা নিয়ে। এ পর্যন্ত নাকি দুই শতাধিক দাবির মীমাংসা করছে সরকার। আরও কিছুদিন গেলে দাবি পূরণের বিশ্ব রেকর্ড অথবা গিনেস বুক অব রেকর্ডসে নাম লেখাবে। এটা এখনো চলছে। 
একটা ব্যাপার হলো, এটা কোনো স্থায়ী সরকার না। দ্বিতীয়ত, এই সরকারের হাতে কোনো আলাদিনের চেরাগ নেই যে, ঘষলেই দৈত্য বেরিয়ে এসে সব সমাধান করে দেবে। একজন কৌতুক করে বলছিলেন, এখন শুধু ভিক্ষুকরাই বাকি আছে। তারা ন্যূনতম ন্যায্য ভিক্ষার দাবিতে ঢাকা শহর অচল করে দেবে। কথাটা কৌতুককর মনে হলেও অবস্থা সেই দিকেই যাচ্ছে। সর্বশেষ যে দাবি নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে রীতিমতো আন্দোলন শুরু হয়েছে, সেটা হলো–সচিবালয়ের কর্মচারীদের আন্দোলন। সরকারি চাকরি অধ্যাদেশ অনুযায়ী, শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করা যাবে স্বল্পতম সময়ে, আর আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ থাকবে না। 
আইনটা নিয়ে একটু চিন্তা‑ভাবনার দরকার আছে বলে আমি মনে করি। এর আগে ক্রসফায়ার আর ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের বহু অপপ্রয়োগ হতে আমরা দেখেছি। তাই এই আইনেরও অপপ্রয়োগ হবে না–এর নিশ্চয়তা কোথায়? বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলো অভ্যাসই হলো এগুলো করা। তাই প্রতিবাদ হওয়া স্বাভাবিক। তবে এখানে কিন্তু আছে। এক হলো, এখন সরকার বেকায়দায় আছে বিভিন্ন দিক থেকে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর দিক থেকে। যদিও ভাগ্য ভালো বলতে হবে যে, অন্তত অর্থনৈতিক দিক থেকে আগের চেয়ে অনেক ভালো অবস্থানে আছে দেশ। মুল্যস্ফীতি এখন এককের ঘরে নেমে এসেছে। ব্যাংকগুলো আগের অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। রেমিটান্স প্রবাহ স্বাভাবিক আছে। তাই অর্থনৈতিক দিক দিয়ে মোটামুটি স্বস্তিদায়ক অবস্থায় আছে। 
এবার মূল কথায় আসি। সরকারি কর্মচারীরা আন্দোলন করে রাজনৈতিক দলের মতো সবকিছু অচল করে দেওয়ার হুমকি দেবে, প্রধান ফটকে তালা লাগিয়ে স্লোগান দেবে–এটা কি প্রত্যাশিত? এক কথায় উত্তর হচ্ছে, কখনোই না। কেননা, তা হলে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে। যেকোনো সরকারকে হেনস্তা করার এর চেয়ে মোক্ষম অস্ত্র আর হতে পারে না। আর জনদুর্ভোগ যে কোন অবস্থায় পৌঁছেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এটা শুধু এই সরকারের না, যেকোনো সরকারের জন্যই বিপজ্জনক। এই প্রথা চালু হয়ে গেলে কথায় কথায় তারা সরকারকে জিম্মি করতে পারবে।

পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশেই এই ধরনের রাজনৈতিক ধাঁচের কর্মসূচি বা কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ সরকারি কর্মচারীদের নেই। সচিবালয় হচ্ছে একটা দেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর কার্যালয়। এটা কোনো চাকরি বা পেশাজীবীদের সংগঠন নয় যে, তারা বাধ্য হয়ে সরকারের হস্তক্ষেপের প্রত্যাশী হবে। সচিবালয়ের কর্মচারীরা সরকারের অংশ। তাই তাদের দাবি-দাওয়া খুব সহজেই সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপস্থাপন করা যেতে পারে। মূলত এই প্রথা প্রথম চালু হয় একজন বিতর্কিত সরকারি কর্মকর্তার জনতার মঞ্চ গঠনের মধ্য দিয়ে। এই ভদ্রলোকই প্রথম সচিবালয়ের, তথা সরকারি কর্মচারীদের শৃঙ্খলা ভঙ্গের পথপ্রদর্শকের আসন অলংকৃত করেন। বিগত সরকার সরকারি কর্মচারীদের নিজস্ব রাজনীতিতে লাগামহীনভাবে ব্যবহার করে। সবচেয়ে বেশি কুখ্যাতি অর্জন করে পুলিশ আর প্রশাসনের কর্মচারীরা।

সরকারি কর্মচারীরা আন্দোলন করে রাজনৈতিক দলের মতো সবকিছু অচল করে দেওয়ার হুমকি দেবে, প্রধান ফটকে তালা লাগিয়ে স্লোগান দেবে–এটা কি প্রত্যাশিত? সংগৃহীত ছবি
কেউ কেউ সমস্ত বিধি‑নিষেধ, এমনকি চক্ষুলজ্জা বিসর্জন দিয়ে সেই দলের নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেয়, যেটা কোনো দেশে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এমনকি খোদ বিচার বিভাগও নেমেছিল নির্লজ্জ রাজনীতি চর্চায়। এদের মধ্যে বিচারপতি মানিক সাহেব সবচেয়ে বেশি সুনাম অর্জন করেন। তাঁর এই সুখ্যাতির চড়া মূল্যও তাঁকে মেটাতে হয়েছে। তাঁর দলের ক্ষমতা হারানোর অব্যবহিত পরে তিনি ভারতে পালানোর সময় সীমান্তে জনতার হাতে ধরা পড়েন। বিক্ষুব্ধ জানতা তাঁকে মাঝারি ধরনের গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করে। একজন বিচারকের কতখানি লজ্জাজনক পরিণতি হতে পারে, চিন্তা করলে লজ্জায় মাথা হেট হয়ে আসে। নির্লজ্জ দলবাজি যে কতটা নিচে মানুষকে নামাতে পারে, তার একটা উদাহরণ এটা।

বিগত সরকার প্রশাসনের সব ক্ষেত্রে রাজনীতি করার যে অবাধ সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তার ভয়াবহ মাত্রা এখন দেখা যাচ্ছে। এক শ্রেণির সরকারি কর্মচারীরা তাদের আসাধু উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য এই রাজনীতিতে নেমে পড়েছে। যে আইনের বিরুদ্ধে তারা সমস্ত বিধি‑বিধান উপেক্ষা করে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে, সেই আইন কেন করা হয়েছে? করা না হলে এরা সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়; দীর্ঘসূত্রিতার সুযোগে পার পেয়ে যায়। যারা সৎ ও নিষ্ঠাবান, তাদের তো এসব নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। আর যদি কিছু থেকে থাকে, তবে অভ্যন্তরীণভাবে আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে। কিন্তু এভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচি, আর হুমকি দিয়ে নয়। এই প্রথা যদি প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে কোনো সরকারের পক্ষেই দেশ চালানো কঠিন হবে। ভেঙে পড়বে দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা। দেশি, বিশেষ করে বিদেশি চক্রান্তকারীদের জন্য সুবর্ণ সূযোগ সৃষ্টি করবে। সুতরাং সরকারকে শক্ত হাতে এসব মোকাবিলা করতে হবে। কোনোভাবেই যেন এই প্রথা প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে, তারা যেন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর খোলসে রাজনৈতিক কর্মী অথবা অন্য দেশের এজেন্ট হিসেবে কাজ করার সুযোগ না পায়। 

ঢাকা শহরের ব্যস্ততম রাস্তা অবরোধ করে সরকারি কর্মচারী ছাড়াও প্রতিদিন নানা সংগঠন অন্দোলন করছে। মানুষের কষ্ট সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এমনিতেই ঢাকা শহর জনসংখ্যার চাপে জর্জরিত। মানুষগুলোর অসহায়ত্ব যে কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তার ইয়ত্তা নেই। অফিস, আদালত, হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ–সব খোলা। তারই মধ্যে চলছে দাবি পূরণের বন্দনা। কয়েক দিন আগে ঢাকা শহরের দক্ষিণের মেয়র হওয়ার আন্দোলন হলো। শহর অচল করে দেওয়ার হুমকি এল। চিন্তা করে দেখেন যিনি নগরপিতা হবেন, তিনি স্বয়ং আন্দোলন করে শহর অচল করছেন। তাহলে নগরপিতার আসন অলংকৃত করার পর কী কী করতে পারেন তিনি! জনদুর্ভোগ লাঘবের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব তো তাঁর। এর আগে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা আন্দোলন করেছে নানা দাবিতে। অথচ সেখানে একবারে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর পছন্দের লোককে ভিসি পদে বসানো হয়েছিল। তাই অনেকেই প্রশ্ন করেন, গত পনেরো বছর এই সব দাবি কোথায় ছিল? উত্তর সবাই জানে। এসব করতে গেলে লাশ হয়ে হাসপাতালের মর্গে পড়ে থাকতে হতো। রাস্তায় গাড়ি চালানোর স্বাধীনতা আমার আছে। তবে তা ট্রাফিক আইন মেনে। তাই মাত্রাতিরিক্ত গণতন্ত্রায়ন গণতন্ত্রের মৃত্যু ডেকে আনতে পারে–কথাটা আমাদের সবার মনে রাখতে হবে।

লেখক: বিভাগীয় প্রধান (ব্যবসায় শিক্ষা), বাংলাদেশ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মাস্কাট, ওমান

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]