টাকা হলেই কালো, কেন সবার লাগে ভালো?

দুনিয়ায় সাদা ও কালো–এই দুটি রংকে নানা কিছুর প্রতীক হিসেবে দেখানোর চল আছে। সবচেয়ে জনপ্রিয় যেটি, সেটি হলো সাদা ভালোর প্রতীক। আর মন্দের প্রতীক কালো। একইভাবে শুভ ও অশুভকেও একই প্রক্রিয়ায় উপস্থাপন করা হয় সচরাচর। যদিও এই উপস্থাপন কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। তারপরও সমাজ বাস্তবতায় দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কোনো ক্লিশে বিষয়কে সহজে পাশ কাটানো যায় না। বরং স্রোতের তোড়ে ভেসে যাওয়াই যেন ভবিতব্য হয়ে দাঁড়ায়!

তেমনই একটি হলো টাকার প্রকারভেদ। আমাদের দেশে টাকা মোটা দাগে দুই প্রকার। একটি হলো ‘সাদা’, আরেকটি ‘কালো’। এদের মধ্যে আবার রূপান্তর প্রক্রিয়াও আছে। সাদা টাকার কালো হয়ে যাওয়া নিয়ে ঢের কথা শোনা যায় না। তবে কালো টাকার সাদা হওয়া নিয়ে অনেক অনেক শব্দ খরচ হয়েছে এই দেশে। বিশেষ করে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে। এরপর পদ্মা‑মেঘনায় কিউসেক কিউসেক জল বয়ে গেছে। রাস্তায় রক্ত ও প্রাণ–দুটোই ঝরেছে। আন্দোলন হয়েছে। এই দেশের সরকার বদলে গেছে গণঅভ্যুত্থানে। তারপরও এই দেশ থেকে কালো টাকাকে যথেচ্ছ সুবিধা দেওয়া এবং এ নিয়ে সমালোচনা বন্ধ করা গেল না। সঠিকভাবে বলতে গেলে, বন্ধ করতে দেওয়া হলো না!

এবারের জাতীয় বাজেট প্রস্তাব আকারে উপস্থাপিত হয়েছে। এই বাজেট অনেক দিক থেকেই ভিন্ন। একে তো এটি কোনো নির্বাচিত সরকারের দেওয়া নয়। আবার এটি কোনো রাজনৈতিক দলের সরকারও প্রণয়ন করেনি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দিয়েছে এই বাজেট। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বাজেট ঘোষণা করেছেন। এবারের বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। এ হিসেবে গত অর্থবছরের চেয়ে বাজেটের আকার কমেছে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। আর ২০২৫‑২৬ অর্থবছরের বাজেটে গতবারের মতোই কালোটাকা সাদা করা করার সুযোগ থাকছে। এ ছাড়া অপ্রদর্শিত অর্থ প্রতিরোধে, প্রকৃত মূল্যে রেজিস্ট্রেশন নিশ্চিতে করহার এলাকাভেদে ৮, ৬ ও ৪ শতাংশের পরিবর্তে কমে হচ্ছে যথাক্রমে ৬, ৪ ও ৩ শতাংশ।

অর্থাৎ, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার শুধু যে আগের কালোটাকা সাদা করার মেশিন চালু রেখেছে, তাই নয়। বরং সেই সাথে ওই মেশিনে কালো রঙ বদলে সাদা করার খরচও কমিয়ে দিয়েছে। বুঝুন তাহলে! কালোটাকার মালিকদের বগল বাজানো এবার থামাবে কে!

প্রতীকী ছবি: ইনডিপেনডেন্ট

কালোটাকা সাদা করার সুযোগকে সাধারণভাবেই দেখা হয়, দেশের অপ্রদর্শিত এবং অবৈধ আয় থেকে টাকার পাহাড় বানানো অসৎ মানুষদের পিঠ চাপড়ে দেওয়ার মতো করে। দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অর্থনীতি নিয়ে কাজ করা সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলো এর বিরোধিতা করে আসছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি, বরং আরও তীব্র হয়েছে।

বাজেট ঘোষণার পরপরই এমন সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও সমালোচনা করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। এক বিবৃতিতে টিআইবি বলেছে, বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত সরকার ঘোষিত রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কারের লক্ষ্যের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ অব্যাহত রাখার এ সিদ্ধান্তকে অনৈতিক, বৈষম্যমূলক ও সংবিধান পরিপন্থী বলে অভিহিত করেছে টিআইবি। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র সংস্কার, বিশেষ করে দুর্নীতিবিরোধী সংস্কারের মূল উদ্দেশ্যকে রীতিমতো উপেক্ষা করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

ড. ইফতেখারুজ্জামান যে অভিযোগটি করেছেন, সেটি বেশ গুরুতর। এতটাই যে, এরপর আর কিছু বলার সুযোগও থাকে খুব কম। অন্যদিকে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মন্তব্য করেছে এই বলে যে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাবিরোধী। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, কালো টাকা সাদা করার উদ্যোগ সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করবে। প্রস্তাবটি বাজেট থেকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে সিপিডি।

অর্থাৎ, একটি বিষয় স্পষ্ট যে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে কালো টাকার মালিকদের ‘উৎসাহ’ দেওয়ার বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে অন্তত কেউ দেখছে না। সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে আমলে নিলে বলতে হয়, তারা এ ক্ষেত্রে ঘরপোড়া গরু। তারা আগে দেখেছে যে, নির্বাচিত সরকারগুলো তাদের সততাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অসততাকে প্রণোদনা দিচ্ছে। এবার জনতা বুঝল, নির্বাচিত হোক বা অনির্বাচিত–সব সরকারের কাছেই ‘অসততা’ খুবই আদরণীয়!

সততা আসলে এমন একটি গুণ, যা একদা অর্জন করলেও চিরকাল ঝুলিতে থাকে না। এই গুণ ধরে রাখার জন্য বারংবার পরীক্ষা দিয়ে যেতে হয়। কোনো মানুষই অসৎ হয়ে জন্মায় না। সততার পরাকাষ্ঠা হয়েও না। একটি শিশু তা-ই শেখে, যা তাকে শেখানো হয়। এই শেখানোর প্রক্রিয়া সর্বোৎকৃষ্ট হয়, যখন শিশুটির চারপাশের পরিবেশ সেই সততার চর্চার সহায়ক হয়। শিশুটি যখন ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে, তখন একটা সময় সৎ থাকার সংগ্রামটা একান্তই তার নিজের হয়ে দাঁড়ায়। ওই সময়টায় যদি সে দেখে সততার জন্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে পুরস্কৃত হওয়ার ব্যবস্থা আছে, তখন সৎ থাকার আকাঙ্ক্ষা স্বাভাবিকভাবেই উৎসাহিত হয়। আর এভাবেই একটা সমাজ, একটা রাষ্ট্র বা একটা জাতি একসময় পরিপূর্ণ সৎ হয়ে উঠতে পারে। কারণ, তখন সেখানে সৎ মানুষের সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটে।

অথচ আমাদের দেশে সততার মাত্রা বৃদ্ধির পথটাই যেন রুদ্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এবং সেই প্রক্রিয়াটিও আবার সরকারি। পুরো বিষয়টি হচ্ছে অনেকটা অবৈধ কাজকে বৈধতা দেওয়ার মতো এবং একটা দেশে যখন এক যুগের বেশি সময় ধরে লাগাতার এমন সুবিধা আসতে থাকে, তখন বুঝতে হবে সরকারগুলো আসলে সৎ ও অসৎ–এর মাঝখানে থাকা সীমারেখায় আর ভারসাম্য রাখতে পারছে না। ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে যেন বলা হচ্ছে, যেকোনো উপায়ে পয়সা কামাও, পরে দেখা যাবে পরের বিষয়!

স্বাভাবিক যুক্তিতে বলতেই হয় যে, কেউ বা কোনো পক্ষ যদি একটি অন্যায়কে ন্যায়ে রূপান্তরের বৈধ প্রক্রিয়া তৈরির চেষ্টায় থাকে, তাহলে অবশ্যই ওই ব্যক্তি বা পক্ষের তাতে কোনো সুবিধাপ্রাপ্তির সুযোগ থাকে। লাভ না থাকলে কেউ কোনো কাজ করবে কেন? এখন আগের রাজনৈতিক সরকার যখন এমন অন্যায্য সুবিধা দিয়ে গেছে, তখন ইঙ্গিত দিয়ে বলা হয়েছে, মূলত কালোটাকার মালিকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা দিতেই এমন সিদ্ধান্ত। কিন্তু বর্তমানের অন্তর্বর্তী সরকার তো বৈষম্য নিরসন করতেই ক্ষমতায় আসীন হয়েছে বলে জোর দাবি করে থাকে। এই সরকার রাজনৈতিক নয়, সেই দাবিও করা হয়। এই সরকারের মুখপাত্ররা দম্ভভরে বলেন, তাদের নাকি সবকিছু করার ম্যান্ডেট আছে! তা, কালোটাকা সাদা করার সুযোগ রহিত করে সৎ করদাতাদের বা সৎ মানুষদের একটা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে কি ওই ম্যান্ডেট কাজ করে না? নাকি সদিচ্ছাই নাই? নাকি সৎ মানুষদের সঙ সাজানোতেই সব আনন্দ?

ছবি: ইনডিপেনডেন্ট

এবারের বাজেট নিয়ে কথা বলেছেন বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেছেন, বিগত সরকারের জঞ্জাল পরিষ্কার করতেই কাজ করছে সরকার। ভঙ্গুর অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার চেষ্টার কথাও বলেছেন তিনি। স্বীকার করতেই হবে যে, বর্তমান সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা নিজ নিজ ক্ষেত্রে অত্যন্ত যোগ্য দুজন ব্যক্তি। তাঁরা দীর্ঘদিন ধরেই এ দেশের অর্থনীতিকে সঠিক পথে রাখতে ‘প্রেশার গ্রুপ’ হিসেবে কাজ করেছেন। এমনকি গত বছরের ঠিক এই সময়ে নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) ও সম্পাদক পরিষদ আয়োজিত ‘অর্থনীতির চালচিত্র ও প্রস্তাবিত বাজেট ২০২৪-২৫’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছিলেন যে, অর্থনীতিতে নেই আস্থার পরিবেশ। অবাধে কালোটাকার সঞ্চালন হচ্ছে। পাচার হচ্ছে অনেক টাকা। তিনি আরও বলেছিলেন যে, ‘আমরা একটি নৈতিকতাহীন অর্থনৈতিক অবস্থার দিকে এগোচ্ছি।’ ওই সময় অর্থনীতিতে নৈতিকতা নিয়ে আলোচনা হওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছিলেন তিনি।

কিন্তু কালোটাকা সাদা করার সুযোগ অব্যাহত রেখে কি অর্থনীতিতে নৈতিকতার চর্চা নিয়ে আর আলাপ তোলা যাবে? বিগত সরকারের এই জঞ্জালটি কি ঝেঁটিয়ে বিদায় করা যেত না? উপযুক্ত ঝাঁটার অভাব, নাকি পরিচ্ছন্ন হওয়ার ইচ্ছার?

প্রশ্ন আসলে অনেক। সমস্যা হলো, উত্তর অজানা। সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমরা যখন দেখব, এককালের সোচ্চার কণ্ঠগুলোও ক্ষমতার উত্তাপে ম্রিয়মাণ বা চুপ হয়ে যাচ্ছে বা কণ্ঠের সুর বদলে যাচ্ছে, তখন আসলে হতাশ হওয়া ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। দিনশেষে সাধারণেরই তো যত জ্বালা। তাহারা যে বরাবরই সুখের লাগি চাহে প্রেম, কিন্তু প্রেম মেলে না!

তাই প্রায় রিক্ত হস্তে বসে থাকা সাধারণের কপালে প্রেমের বদলে থাকে কেবল ভ্যাট‑ট্যাক্সের বোঝা। তাদের ঘাড়ে কাঁঠাল ভেঙেই চলে রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক নামের যত খেলা। সেই খেলায় ব্যবহৃত হতে হতেই সাধারণেরা দেখতে পান, তাদের সততাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলে অসততার ‘সরকারি’ তোষণ। সাধারণেরা মুখ পুড়িয়ে আবার বোঝে–খেলোয়াড় বদলালেও, খেলা আসলে আগেরটাই!

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]