বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক নির্দেশনায় পুরুষ ও নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্দিষ্ট পোশাক পরার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। এই নির্দেশনায় নারীদের জন্য শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, ওড়না এবং অন্যান্য ‘শালীন’ পোশাকের কথা বলা হয়েছে। নিষিদ্ধ করা হয়েছে ছোট হাতা, ছোট দৈর্ঘ্যের পোশাক এবং লেগিংস। পুরুষদের ক্ষেত্রে জিনস ও গ্যাবার্ডিন বাদ দিয়ে ফরমাল শার্ট ও প্যান্ট পরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশ না মানলে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ আনার কথাও বলা হয়েছে।
এই খবর নতুন নয়। একইসঙ্গে সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে খবর প্রকাশ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার মুখে এই নির্দেশনা প্রত্যাহারের ঘোষণাও এসেছে। এতে অবশ্য নির্দেশনাটি একবার জারি হওয়ার বিষয়টি বদলে যায় না।
এ বিষয়ে চিন্তার গভীরে গেলে এক চিরন্তন ও চিরবিরাজমান প্রশ্ন সামনে আসে—কে কী পরবে, তা ঠিক করে দেবার ক্ষমতা বা অধিকার কার? রাষ্ট্রের? সমাজের? প্রতিষ্ঠানের? ধর্মের? নাকি সেই ব্যক্তির, যার গায়ে পোশাকটি ওঠে? কেউ যদি ছোট দৈর্ঘ্যের পোশাক এবং লেগিংস পরে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, তাহলে প্রতিষ্ঠান কেন তাতে হস্তক্ষেপ করবে? বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মীরা কাজ করে কি পোশাক দিয়ে, না জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে, শরীর খাটিয়ে?
পোশাক এমন এক বিষয় যা ব্যক্তিগত রুচি, সংস্কৃতি, ধর্ম, পরিবেশ, অর্থনৈতিক অবস্থা, এবং অনেক সময় রাজনৈতিক অবস্থান বা মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ হয়ে ওঠে। শেখ সাদির গল্পে যেমন পোশাকের প্রতি সামাজিক সম্মান দেখানো হয়েছে, কিংবা আইনস্টাইনের পোশাক-নির্বিশেষ সাদামাটা জীবনেও একই চিত্র ধরা পড়ে। একজন মানুষ কী পরছে, তা দিয়ে তার অবস্থান, শ্রেণি, রুচি, চিন্তাভাবনা, এমনকি ‘মান’ নির্ধারণ করে দেওয়ার প্রবণতা হাজার বছর ধরে সমাজে বিদ্যমান।
আসলে পোশাক কখনোই শুধু পোশাক নয়। এটি এক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অনুষঙ্গ। নারী যখন ঘরের বাইরে বের হয়, তখন তার পোশাক নিয়েই হয় অধিকাংশ সমাজের কৌতূহল, সমালোচনা, নির্দেশনা ও ফতোয়া। অথচ তার মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা, মতাদর্শ বা চিন্তাভাবনার ওপর আলোচনা হয় না বললেই চলে। কী পরবে একজন নারী—এ প্রশ্ন যেন এখনো পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোর চিরকালীন বিতর্ক। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, নারীর পোশাক রাজনীতি ও শাসনের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। কখনো ধর্মের নামে, কখনো সামাজিক অনুশাসনের নামে, কখনো রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে। কেউ বলে হিজাব পরো, কেউ বলে খুলে ফেলো। কিন্তু নারীর নিজের মতামত কী, সেটি কেউ জানতে চায় না।
ভারতবর্ষে ব্রিটিশ আমলের সময় থেকেই দেখা গেছে, পোশাককে ব্যবহার করা হয়েছে জাতি, ধর্ম ও শ্রেণিকে চিহ্নিত করতে। ব্রিটিশ সাহেবরা যখন ভারতীয় নারীদের ‘শাড়ি’ নামক পোশাক দিয়ে সাংস্কৃতিক প্রতীক বানিয়ে তুলতে চাইলেন, তখন থেকেই পোশাক হয়ে উঠল জাতিগত পরিচয়ের এক চিহ্ন। সূক্ষ্ম বাংলার তাঁতের কাপড়কে যখন কলকাতার অভিজাত সমাজ ‘অশালীন’ বলে তিরস্কার করল, তখন আর বুঝতে বাকি রইল না—পোশাক নিয়ে বিতর্ক শুধু নৈতিকতার না, এটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্যেরও প্রশ্ন।
ত্রিবাঙ্কুরের ‘ব্রেস্ট ক্লথ বিতর্ক’ ছিল এর একটি নগ্ন উদাহরণ, যেখানে সমাজ নির্ধারণ করে দিয়েছিল, কোন শ্রেণির নারী কী পরবে, কতটা শরীর ঢাকবে। এই নিয়ন্ত্রণ সামাজিক শৃঙ্খলা নামে, কিন্তু তা আসলে পিতৃতান্ত্রিক শাসনেরই ছদ্মবেশ। নারীর শরীরের ওপর এই সার্বভৌম অধিকারবোধই আমাদের সমাজকে করে তুলেছে এক গভীর সংকীর্ণ জায়গার বাসিন্দা। আধুনিক সময়েও এই মানসিকতা রয়ে গেছে—টিপ পরা নারীকে পুলিশ হেনস্তা করে, জিন্স-টপস পরা কিশোরীকে হেনস্তা করা হয়, কারণ সমাজ মনে করে—নারীর পোশাকও তার নিয়ন্ত্রণাধীন বিষয়।
আজ আমাদের সমাজে হিজাবকে ঘিরে এক প্রকার আগ্রাসী রাজনীতি গড়ে উঠেছে। হিজাব অনেক মেয়ের কাছে হতে পারে ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতীক, অনেকের কাছে নিরাপত্তা বা ফ্যাশনের অঙ্গ, আবার অনেকের ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজের চাপ। কিন্তু এখন যে হারে হিজাবকে বাধ্যতামূলক রূপে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চলছে, তা স্পষ্টভাবে এক ধরনের পিতৃতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক প্রভাবেরই বহিঃপ্রকাশ। হিজাব না পরা নারীকে ‘বেহায়া’ তকমা দেওয়া হচ্ছে, এমনকি অন্য নারীরাও এই ভ্রান্ত ধারণায় অংশ নিচ্ছেন। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে—হিজাব কি নিজের পছন্দের পোশাক, না এটা সমাজ-পরিবার-ধর্ম-রাষ্ট্রের নির্ধারিত একটা চাপিয়ে দেওয়া জিনিস?
এই সমস্যা শুধু পোশাকের নয়, এটি ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন। একজন মানুষ কী পরবে, কীভাবে চলবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা যদি তার না থাকে, তবে অন্য সব স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে পড়ে। আমাদের সমাজে ব্যক্তি যেন নিজের মতো চলতে না পারে, বরং সংখ্যাগরিষ্ঠের রুচি-ধারণা-মতামতের অনুসারী হয়ে বেঁচে থাকে। কেউ অন্যভাবে কথা বলে, ভিন্নরকম পোশাক পরে, অন্যরকম খায়—তাকে যেন সমাজই বহিষ্কৃত করে। তার স্বাধীনতা ‘আমাদের মতো’ না হওয়ায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এই একমাত্রিকতা আমাদের সমাজকে দিনে দিনে নিঃসাড় করে দিচ্ছে।
পোশাকের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে যে প্রশ্নটি বারবার উঠে আসে তা হলো, নারীর স্বাধীনতা আসলে কাদের চোখে স্বাধীন? সমাজ, রাষ্ট্র ও ধর্ম এখনো সেই নারীর কণ্ঠস্বরকে নীরব করে রাখতে চায়, যিনি তার শরীর নিয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে চান। কেউ বলে বোরকা পরতে হবে, কেউ বলে খুলে ফেলতে হবে। কিন্তু কেউই তার নিজের পছন্দ ও সিদ্ধান্তকে মূল্য দিতে রাজি নয়। পুরুষদের জন্য যেসব পোশাক ‘স্টাইল’ আর ‘ফ্যাশন’ হিসেবে দেখা হয়, নারীদের জন্য তা ‘অশালীন’ আর ‘অশ্লীলতার দায়’ হয়ে যায়। নারী যেন জন্মগতভাবে এক দায়—যে দায় সমাজ নিতে চায় না, শুধু শাসন করতে চায়।
এই শাসন পোশাকে, আচরণে, কথা বলায়, চলাফেরায় সর্বত্র। নারীর পোশাককে ব্যবহার করে সমাজ এক ‘ভালো মেয়ে’ তৈরির ছাঁচে নারীদের ফেলতে চায়, যিনি ঘরোয়া, বিনয়ী, শালীন এবং কখনোই প্রশ্ন তোলেন না। ভালো মেয়ে হওয়ার মানদণ্ড এখনো পুরুষতান্ত্রিক সমাজই নির্ধারণ করে। নারীর রুচি নয়, পুরুষের বা ‘পররুচি’ই হয়ে ওঠে নারীর পোশাকের মানদণ্ড। এইখানেই মূল সংকট।
আমাদের উচিত ছিল পোশাককে রুচি, সংস্কৃতি, স্বাচ্ছন্দ্য এবং ব্যক্তির মানসিক কাঠামোর আলোকে বোঝা। কিন্তু আমরা তাকে বানিয়ে তুলেছি নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার। রাষ্ট্র যদি নাগরিকের শরীরের ওপর বিধান জারি করে, তাহলে সে আর গণতান্ত্রিক থাকে না—সে হয়ে ওঠে এক অদৃশ্য অভিভাবক, এক পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যে বিশ্বাস করে, জনগণের সবকিছু তার ঠিক করে দেওয়া উচিত—কী পরবে, কীভাবে থাকবে, কী বলবে।
এই প্রবণতা বিপজ্জনক। কারণ এক জায়গায় শুরু হলে, তা অন্য জায়গাতেও প্রবাহিত হবে। আজ পোশাক ঠিক করছে যে প্রতিষ্ঠান, কাল ভাবনা নিয়েও নাক গলাবে। এরপর গান, ছবি, বই, নাটক, সংবাদ সবকিছুই নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় পড়বে। তখন নাগরিক আর মানুষ থাকবে না, থাকবে একরকম মুখোশধারী শ্রেণি—যাদের চেহারা আলাদা, কিন্তু রুচি, চিন্তা, আচরণ একরকম। এটাই একমাত্রিকতা, এটাই নিয়ন্ত্রণের চূড়ান্ত রূপ।
পোশাকের রাজনীতি তাই নিছক রুচির বিষয় নয়, এটি গভীরভাবে রাষ্ট্র, সমাজ ও লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতার দখলদারির ইতিহাস। স্বাধীনতার সারাংশ এখানে নয় যে সবাই একরকম হবে, বরং এখানে যে সবাই নিজের মতো হতে পারবে—তা নিশ্চিত করায়। যে সমাজ স্বাধীন পোশাককে ভয়ে, সন্দেহে, ঘৃণায় দেখে, সে আসলে নিজের আত্মপরিচয় নিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত এক শাসনের প্রতিচ্ছবি। আর এই আতঙ্কেই হারিয়ে যায় বহুত্ববাদ, হারিয়ে যায় স্বাধীনতা, হারিয়ে যায় মানুষ।
তাই এই সময়ে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো—আমরা কী এমন এক সমাজ চাই, যেখানে মানুষ নিজের মতো কথা বলতে পারে, পরতে পারে, ভাবতে পারে? নাকি আমরা সেই সমাজকেই চূড়ান্ত বলে মেনে নেব, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের রুচিই হয়ে উঠবে একমাত্র পথ? পোশাকের রাজনীতি আজ এই প্রশ্নই তোলার সময় এনে দিয়েছে—কে তোমার শরীরের মালিক? তুমি, না অন্য কেউ?
আর প্রতিষ্ঠানের মূল কাজ হওয়া উচিত স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, কার্যকারিতা, সৃজনশীলতা ও কল্যাণমূলক ভূমিকা নিশ্চিত করা, কে কী পরবে, সেটা ঠিক করা নয়।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]