আমরা প্রায়ই দুটি শব্দ শুনি–‘নির্মোহ’ এবং ‘সততা’। কিন্তু বাস্তব জীবনে কতজন মানুষকে আমরা সত্যিই নির্মোহ ও পরিশুদ্ধ রূপে দেখতে পাই? কথায় নয়, জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সততা বজায় রাখেন–এমন মানুষ কি আমাদের চোখে পড়ে? আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি; কারণ, আমি সেই বিরল মানুষকে চোখে দেখেছি, কথা বলেছি, হাসতে ও চলতে দেখেছি। তিনি হলেন জনাব বদরুদ্দীন উমর।
সততার প্রতীক এক কিংবদন্তি
বদরুদ্দীন উমর শুধু বাংলাদেশের নন, তিনি ছিলেন বিশ্বের এক কিংবদন্তি চিন্তাবিদ। তাঁর সততা, প্রজ্ঞা এবং নিরপেক্ষ অবস্থান জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অটুট থেকেছে। কোনো রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত বা সামাজিক স্বার্থ কখনো তাঁর অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারেনি। এ কারণেই তাঁর লেখা, তাঁর বক্তব্য এবং তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও সময়ের পরীক্ষায় আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে।
আমরা প্রায়ই দেখি, অনেকেই লেখেন এক রকম, বিশ্বাস করেন আরেক রকম, আর ব্যক্তিজীবনে চলেন সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে। এই বৈপরীত্য তাঁদের চিন্তাভাবনার গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কিন্তু বদরুদ্দীন উমর ছিলেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি ছিলেন চিন্তা ও কর্মে এক অবিচ্ছিন্ন সঙ্গতি। এ কারণেই তিনি আলাদা, ব্যতিক্রমী এবং বিরল।
বহুমাত্রিক পরিচয়
বদরুদ্দীন উমর আবুল হাশিমের পুত্র। কিন্তু এই পরিচয়েই তাঁকে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তিনি ছিলেন একাধারে বুদ্ধিজীবী, গবেষক, কলাম লেখক, রাজনীতিবিদ, দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ। তবে তাঁর পরিচয়ের প্রকৃত উচ্চতা কোনো একক বিশেষণে ধরা যায় না।
বদরুদ্দীন উমরের বিশ্লেষণ ছিল ধারালো, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ছিল গভীর এবং তাঁর দর্শন ছিল সময়ের ঊর্ধ্বে। তাঁকে পড়তে বা বুঝতে গেলে নিজেকেও এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে হয়। আর এটাই তাঁকে আলাদা করেছে আমাদের সমকালীন চিন্তাবিদদের কাছ থেকে।
বাংলাদেশের সীমার বাইরে
দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশ তাঁকে পুরোপুরি বুঝতে পারেনি। অনেক সময় তাঁর প্রজ্ঞা, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণ মানুষের কাছে জটিল মনে হয়েছে। অথচ তাঁর প্রতিটি বই, প্রতিটি লেখা আসলে বিশ্বমানের চিন্তার সম্পদ। এগুলো বাংলার গণ্ডি পেরিয়ে মানবতার সম্পদ হওয়ার যোগ্য।
তাঁর বইগুলোর অনুবাদ হওয়া আজ সময়ের দাবি। কারণ, বদরুদ্দীন উমর কেবল বাংলাদেশের নন, তিনি বিশ্বচিন্তার অংশ। ভবিষ্যতে তাঁর রচনাই হবে সেই জানালা, যার মাধ্যমে বিশ্ব বাংলাদেশকে নতুনভাবে চিনবে।
আগামী দিনের অনুপ্রেরণা
একদিন বাংলাদেশে আবারও বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা জেগে উঠবে। একদিন সততা, সত্য ও প্রজ্ঞা এই সমাজে ফিরে আসবে। একদিন এখানে উচ্চমানের মানুষ তৈরি হবে। সেদিন বদরুদ্দীন উমরকে আরও গভীরভাবে সম্মান জানানো হবে। তখন বোঝা যাবে–তিনি কেবল একজন মানুষ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান, একটি আলোকবর্তিকা।
আজকের বাংলাদেশে যখন মূল্যবোধের সংকট, রাজনৈতিক ভাঙন ও বুদ্ধিবৃত্তির অবক্ষয় দেখা যাচ্ছে, তখন বদরুদ্দীন উমরের জীবন ও চিন্তাধারা আমাদের জন্য শিক্ষণীয় উদাহরণ। তাঁর জীবনী আমাদের মনে করিয়ে দেয়–সততা, প্রজ্ঞা এবং নির্মোহ অবস্থান কোনো বিমূর্ত শব্দ নয়; সেগুলো বাস্তব জীবনে বাঁচিয়ে রাখা যায়, যদি সত্যিই তার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া যায়।
অসম্পূর্ণতা ও অপূর্ণতা
আজ তাঁর মৃত্যুতে আমরা শুধু একজন মানুষকে হারাইনি, আমরা হারিয়েছি এক জীবন্ত প্রজ্ঞার উৎসকে। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রজ্ঞার বাতিঘর। তাঁর বই না পড়লে, তাঁর চিন্তা না বুঝলে আমাদের জ্ঞান অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
তাঁর চলে যাওয়া আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। কিন্তু একইসঙ্গে এটি আমাদের জন্য দায়িত্বও তৈরি করে। তাঁর চিন্তা, লেখা ও দর্শনকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমাদের কর্তব্য। তাঁর জীবন থেকে শিখে নেওয়া আমাদের প্রয়োজন–যেন সততা, সত্য ও প্রজ্ঞা শুধু ইতিহাসের অংশ না হয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যতেরও বাস্তবতা হয়।
শেষ কথা
বদরুদ্দীন উমর আজ আর আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর লেখা, তাঁর চিন্তা, তাঁর সততা আর তাঁর নির্মোহ জীবনের মধ্যে। তাঁকে সম্মান জানানো মানে কেবল একজন মানুষকে স্মরণ করা নয়, বরং আমাদের সমাজে বুদ্ধিবৃত্তি, সত্য ও প্রজ্ঞার পুনর্জাগরণের শপথ নেওয়া।
জনাব বদরুদ্দীন উমর বাংলাদেশেরই নয়, মানবজাতির এক গৌরবময় সম্পদ। তাঁকে সম্মান জানানো মানে মানবতারই সম্মান রক্ষা করা। তাই আজ তাঁর প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা–তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, কীভাবে সততা ও প্রজ্ঞা একসঙ্গে ধারণ করে বাঁচতে হয়।
লেখক: মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]