ফুটবলে কোচদের চাকরির অনিশ্চয়তা কতটা, সেটা বোঝাতে মজার একটা উক্তি বেশ প্রচলিত–কোচ দুই ধরনের, একজন যিনি চাকরি হারিয়েছেন, আরেকজন যিনি হারাতে যাচ্ছেন। নেপালে প্রধানমন্ত্রীর পদের জন্যও সম্ভবত কথাটা খেটে যায়।
২০০৮ সালে রাজতন্ত্রের অবসানের পর থেকে এ পর্যন্ত ক্যালেন্ডারে যাপিত বছর আর নেপালের প্রধানমন্ত্রীর পদে পরিবর্তনের সংখ্যা যে প্রায় কাছাকাছি! ১৭ বছরে ১৪ বার প্রধানমন্ত্রিত্বে বদল দেখেছে নেপাল, একজন প্রধানমন্ত্রীও পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। কিন্তু এবারের মতো পরিবর্তন এর আগে হয়নি।
এর আগে যত বদল হয়েছে প্রধানমন্ত্রিত্বে, তার বেশির ভাগই কোয়ালিশন সরকারে সঙ্গীদের সমর্থন হারিয়ে ফেলায়। কয়েক দফা বদল হয়েছে সাংবিধানিক প্রয়োজনে। দু-একবার হাইকোর্টের রায়ে। রাজপথে উত্তেজনা ছড়ানোর জেরে সরকারের পতন এর আগেও চারবার হয়েছে, যার মধ্যে দুটি এবার আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করে সেনাবাহিনীর আশ্রয়ে যাওয়া প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলিরই আগের দুই মেয়াদে। তবে সেসব ক্ষেত্রে কখনো রাজপথে নেমেছে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, কিংবা রাজপথ ছাপিয়ে সংবিধান বা আদালতের রায়ই শেষ পর্যন্ত হয়ে গেছে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের কারণ। এবারের মতো দল-মত ছাপিয়ে এত মানুষের রাস্তায় নেমে আসা এবং জনতার চাপেই প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ করে পালাতে বাধ্য হওয়ার ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি।
এর বাইরে পাকিস্তান আর মিয়ানমার তো আছেই, কিছু না কিছু নিয়মিতই ঘটছে! সে দুই দেশেও সর্বশেষ পরিবর্তনগুলো সাম্প্রতিক–২০২২ সালে ইমরান খানকে উৎখাতের পর থেকে পাকিস্তানে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে, মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধের শুরু ২০২১ সালে সামরিক বাহিনীর ক্যু-র পর।
সবগুলো যোগ করে নিন, এশিয়াকে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়াকে ‘রেড হট জোন’ মনে হবে। কিন্তু কেন? শুধুই ভেতরকার দ্বন্দ্ব, নাকি বাইরের বড় পক্ষের দাবার বোর্ডের ঘুঁটি হয়ে উঠছে এশিয়ার একের পর এক খর্বশক্তির দেশ?
সরলভাবে দেখলে ভেতরকার দ্বন্দ্বের কথাই আগে আসবে। এই সবগুলো দেশের ভেতরকার সমস্যাগুলোকে প্রায় কাছাকাছি বর্ণনায়ও বাঁধা যাবে–মাত্রাছাড়া দুর্নীতি, তরুণদের কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠা বেকারত্ব, অর্থনীতির ভেতরটা ফাঁপা হয়ে পড়া, ধারের জন্য বিদেশি শক্তির কাছে হাত পেতে থাকা, মূল্যস্ফীতি... সব মিলিয়ে সরকারের প্রতি অনাস্থা।
তা সরকার পতন ও এরপরের ‘খিচুড়ি’ হয়ে যাওয়া পরিস্থিতিতে সেসব অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো না হয় ‘ডাল’ আর ‘চাল’-এর ভূমিকা নিয়েছে। আগুন হিসেবে কাজ করেছে জেন জি-র ক্ষোভ। কিন্তু খিচুড়ি রান্নার জন্য খুন্তিও তো নাড়তে হবে! খুন্তিটা নেড়েছে কে? শ্রীলঙ্কা থেকে শুরু করে নেপাল পর্যন্ত–এশিয়ায় প্রতিটা দেশে সরকার পতনের পেছনে এই খুন্তি নাড়ানোর ভূমিকায় বারেবারে এসেছে বাইরের শক্তির কথা।
এটা বুঝতে তো আর রাষ্ট্রতত্ত্ব কপচানো লাগে না যে, বাইরের শক্তি শুধু তখনই প্রভাব ফেলার সুযোগ পায়, যখন দেশের ভেতরে অন্তর্দ্বন্দ্ব জোরালো হয়। গণঅভ্যুত্থান দেখা প্রতিটি দেশই ভেতর থেকে ছিল ফাঁপা। ওঁত পেতে থাকা বাইরের শক্তি সেটার সুবিধা নিতে চেষ্টা না করার কোনো কারণ তো নেই! শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, মিয়ানমার বা নেপাল–প্রতিটি দেশেই বিনিয়োগে, ধারে, দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে, মানবাধিকারের ঘোমটায় নিজেদের দাপট ও নেটওয়ার্ক বাড়ানোর উদ্দেশ্যে পাঠানো অনুদানে বিদেশি শক্তিগুলোর ছিল সরব উপস্থিতি। কমজোর অর্থনীতি আর দুর্নীতিপরায়ণ প্রশাসন জিইয়ে রাখা সরকারগুলোও ছিল বিদেশি শক্তির মুখাপেক্ষী। এরপর বাকি কাজ তো সহজ। দাবার বোর্ডে কখন কোন ঘুঁটি চালতে হবে, সেটা বনে যায় ওই বিদেশিদের লাভ-ক্ষতির হিসাব, বিশ্বজোড়া প্রতিযোগিতায় অন্য শক্তিকে হারিয়ে দেওয়ার সমীকরণ। আঁচ বুঝে খুন্তি নাড়ো!
বিদেশি শক্তি বলতে কাদের বোঝানো হচ্ছে, সেটাও সম্ভবত অনুমান করা কঠিন কিছু নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্ব কয়েক দশক যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা মোড়লগিরি দেখেছে। আজ এই যুদ্ধ, কাল ওই নিষেধাজ্ঞার ধকল মিলিয়ে রাশিয়া একলা তাদের সঙ্গে পেরে উঠছে না। মাঝে মাঝে ‘তৃতীয় শক্তি’ হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দিলেও জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরবের মতো দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্বকেই ‘সাইনবোর্ড’ বানায়। কিন্তু মুদ্রার উল্টো দিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে দাঁড়িয়ে গেছে চীন।
সত্তরের দশকে অর্থনীতির কৌশলে বদল আনার পর থেকে ক্রমেই এগোতে থাকা চীন এখন এমন অবস্থায় যে, এখনই যুক্তরাষ্ট্রের সমানে-সমান তাদের বলা না গেলেও যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত্যকে তারা চোখ রাঙায়। সেটার স্বীকৃতি যুক্তরাষ্ট্রের চীনবিষয়ক কূটনীতিতেই মেলে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০১৮ সালে চীনের সঙ্গে ‘ট্রেড ওয়ারে’র ঘোষণা দেওয়া যুক্তরাষ্ট্র ২০২২ সালের অক্টোবরে তাদের ‘জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে’ চীন সম্পর্কে সরাসরিই লিখেছে, ‘একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী যারা বৈশ্বিক ব্যবস্থা বদলে দিতে কাজ করছে, পাশাপাশি সেটা করে দেখানোর মতো অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক, মিলিটারি ও প্রযুক্তিগত শক্তিও ক্রমেই বাড়ছে।’ চীনের সঙ্গে রাশিয়ার মাখামাখি যুক্তরাষ্ট্রের মাথাব্যথা আরও বাড়াচ্ছে।
কে কাকে কোথায় কুপোকাত করবে, এ নিয়ে তাই বিশ্ব দেখছে যুক্তরাষ্ট্র আর চীনের কুরু-পাণ্ডবের যুদ্ধ। সেটা মধ্যপ্রাচ্যে বলুন, আফ্রিকায় বলুন কিংবা ইউরোপে। চীনই যেখানে এশিয়ার দেশ, এশিয়া বাদ যাওয়ার তো কোনো কারণই নেই!
নেপালে কমিউনিস্ট পার্টিগুলোতে চীনের প্রভাব স্পষ্ট, তিব্বত ইস্যুতে তারা চাপ প্রয়োগ করে। মিয়ানমারে জান্তা সরকারকে তারা সমর্থন জানায়, যদিও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোতেও তাদের অর্থায়নের গুঞ্জন শোনা যায়। তবে এর বাইরে চীন সাধারণত কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সরাসরি নাক গলায় না। অন্তত প্রকাশ্যে নয়। মূলত ব্যবসা দিয়েই সুতোয় বাঁধে একেকটি দেশকে। তাদের বেল্টস অ্যান্ড রোডস ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রকল্পে এই অঞ্চলের প্রায় সব দেশই জড়িয়ে। যুক্তরাষ্ট্র ‘গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট’ পর্যায়ে এই অঞ্চলে দ্বিপক্ষীয় ব্যবসায়ে তেমন আগ্রহী নয়। তারা অনুদান দেয়, আমদানি করে এসব দেশ থেকে। তাদের প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগও হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র।
শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, মিয়ানমার—এশিয়ার যে ছয়টি দেশের কথা বলা হচ্ছে এখানে, প্রতিটিতেই চীনের বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক বেশি। বাংলাদেশেই যেমন, ২০১৬ সাল থেকে শুরু করলে বিআরআই প্রকল্পের মাধ্যমে চীনের প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ২৬ থেকে ৩৮ বিলিয়ন ডলারের মতো। যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি বিনিয়োগ ৩-৪ বিলিয়ন ডলার, তবে ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তারা বাংলাদেশে বিভিন্ন খাতে সাহায্য করেছে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার–দক্ষিণ এশিয়ায় দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। নেপালেও চিত্রটা একই। চীন যেখানে বিআরআইয়ের মাধ্যমে বিনিয়োগ করছে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের মতো, যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের অঙ্ক ২০-২৫ কোটিতে থাকলেও তারা সেখানে প্রভাব খাটায় তাদের ৫০ কোটি ডলারের ‘মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোরেশনে’র অনুদানের মাধ্যমে।
এ ক্ষেত্রে চীনা ও মার্কিন বিনিয়োগের ধরনে যেমন, তেমনি প্রাপ্যতা প্রশ্নেও একটা পার্থক্য আছে। চীন সাধারণত অবকাঠামো প্রকল্প ধরে বিনিয়োগ করে। লক্ষ্য বোঝাই যাচ্ছে যে, বিআরআই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তার বিনিয়োগ ছড়িয়ে দেয় সরকারি‑বেসরকারি নানা অংশীদারি প্রকল্প ধরে। এর আওতায় নিরাপত্তা থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবাধিকার–সবই পড়ে। ফলে সরকারের বাইরেও তার অংশীজনের জাল অনেক দূর পর্যন্ত ছড়ানো থাকে।
বিশ্বের অন্য অঞ্চলের তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলও এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ক্যাম্প আছে, অস্ত্রের ব্যবসা আছে। ইউরোপে দেশগুলোর সঙ্গে তারা ন্যাটোসহ নানা চুক্তিতে আবদ্ধ। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায়? না সেই অর্থে ক্যাম্প আছে, না তারা অস্ত্রের ব্যবসায়ে এখানে রাশিয়া-চীনকে ছাপিয়ে একতরফা দাপট দেখাতে পারছে। এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব মূলত অনুদান আর রাজনৈতিক দল, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও সুশীল সমাজের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে।
নেপালে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর উৎখাত হওয়ার পেছনে অদৃশ্য কলকাঠি–বা খুন্তি বলতে পারেন–নাড়ানোর প্রভাবক হিসেবেও তাই যুক্তরাষ্ট্রের নাম আসছে গুঞ্জনে। সেটা অবশ্য দুইয়ে‑দুইয়ে চার মেলানোর মতো মনে হতে পারে। নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলির দল সিপিএম-ইউএমএল সবসময়ই ছিল চীনপন্থী। এদিকে অলির উৎখাতের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে শপথ নিতে যাওয়া সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কির ভূমিকাও দুইয়ে‑দুইয়ে চার মেলাতে উৎসাহ জোগায়। ২০১৭ সালে সুশীলা কার্কির অভিশংসনের প্রস্তাব পার্লামেন্টে এনেছিল সেই সময়ের জোট সরকার। সেই জোট সরকারে কারা ছিল? মাওবাদী সেন্টার–যারা চীনপন্থী, আর নেপালি কংগ্রেস–যারা ভারতপন্থী। চীন আর ভারত বাদ গেলে বাকি থাকে কে!
ট্রাম্পের ট্যারিফ-খেয়াল, গাজা ইস্যুতে ইসরায়েলের প্রতি তাঁর অন্ধ সমর্থন, ইউক্রেন-ইস্যুতে ন্যাটোর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ‘থার্মোমিটারে’ অধোগামী পারদ…সব মিলিয়ে একদিকে যুক্তরাষ্ট্র মিত্র হারাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। অন্যদিকে কোয়াড বনাম ব্রিকস ইস্যুতে ভারত ঝুঁকছে যুক্তরাষ্ট্রের উল্টোদিকে। চীন আর যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের উত্তাপ ‘বয়েলিং পয়েন্টে’র দিকে যাচ্ছে, এটা অনুমান করে নেওয়াই যায়। সেটা যত উত্তাপ ছড়াবে, ভারতের কোয়াড বা ব্রিকসের মধ্যে কোনো এক নৌকায় দুই পা-ই তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের চাপ বাড়বে। ভারত কোন দিকে যায়, তার ওপর হয়তো নির্ভর করবে এই অঞ্চলের পরিস্থিতি।
শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপালের পরিস্থিতির পর যে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠে গেছে–এরপর কারা? এবং সেখানে মালদ্বীপের পাশাপাশি অনুমানে ভারতের নামটিও যে আসছে, সেটাকে একেবারে অমূলক কি বলা যায়?
লেখক: সাংবাদিক
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]
আরও পড়ুন:
ক. বিরল খনিজে শীর্ষে চীন, যুক্তরাষ্ট্র অনেক পিছিয়ে
খ. চীন‑মার্কিন দ্বন্দ্ব তবে বিরল খনিজ নিয়ে?