বিরল খনিজ বা রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনা চলছে। হালে এ নিয়ে প্রকাশ্য নানা আলোচনা হলেও বিষয়টি কিন্তু বহু আগে থেকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়ে আসছে। এ নিয়ে বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যেও লড়াই চলছে। কেন? উত্তর হচ্ছে এই বিরল খনিজকেই ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জ্বালানি হিসেবে মনে করা হচ্ছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাট এই বিরল খনিজ নিয়ে নিবন্ধ প্রকাশ করেছে ২০২২ সালে। এ নিয়ে ঠান্ডা লড়াই চলছে তারও আগে থেকে। ২০১৭ সালেই নিজের প্রথম মেয়াদে এ নিয়ে নির্বাহী আদেশও জারি করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। দ্বিতীয় মেয়াদে এসে এ ক্ষেত্রে আরেক ধাপ এগিয়ে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে নেওয়ার মতো নানা আলাপ উঠছে। এমনকি ইউক্রেন যুদ্ধের ‘গ্রহণযোগ্য সমাধান’ প্রশ্নেও মার্কিন স্বার্থটি ঘুরপাক খাচ্ছে এই বিরল খনিজ নিয়েই।
এ বিষয়ে আলোচনায় ঢোকার আগে একটা গৌরচন্দ্রিকা দেওয়া যাক। আমার ‘নয়া বিশ্ব’ নিয়ে ধারাবাহিক নিবন্ধে বর্তমান বৈশ্বিক কাঠামো সম্পর্কিত আলোচনায় বারবার ঘুরেফিরে সামনে এসেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি জড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপারটি। সেই জড়িয়ে যাওয়ার ঘটনাটি ঘটেছিল একটি হামলার মধ্য দিয়ে। ১৯৪১ সাল। জাপান যুক্তরাষ্ট্রের পার্ল হারবারে হামলা চালায় এবং যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
প্রশ্ন হলো জাপান কী কারণে পার্ল হারবারে হামলা করল? যে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিচ্ছিল না, তাকে যুদ্ধের ময়দানে কেন টেনে আনল? সে কি জানত না এটি বৃহত্তর পশ্চিমা ঐক্য গড়ে দিতে সহায়তা করবে? জানত। কিন্তু তার উপায় ছিল না। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র জাপানে এমন এক কাঁচামালের রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল, যা দেশটি উৎপাদন করতে পারে না। সেই কাঁচামালটি ছিল জ্বালানি তেল। এই এক জ্বালানি তেলের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা জাপানের সাম্রাজ্য বিস্তারের খায়েশে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছিল। ফলে পার্ল হারবারে হামলা না করে তার কোনো উপায় ছিল না।
হামলা হলো এবং যুক্তরাষ্ট্র জড়িয়ে পড়ল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। তৎকালীন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো ততদিনে নিজেদের সঙ্গে যুদ্ধ করে আগেই খর্বশক্তির হয়ে গেছে। যুদ্ধের ফল এল। বিবদমান দুই পক্ষের বাইরে থেকে যুক্তরাষ্ট্রই তুলল বিজয়ের পতাকা। এখন এমনই এক লড়াই চলছে। এও জ্বালানি নিয়েই। তবে এটি আর তেল নয়। বরং শুরুতে উল্লিখিত বিরল খনিজ।
এই সময়ে এসেও এই নয়া জ্বালানি নিয়ে বেশ ঘোলাটে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে এবার আর জাপান নয়, প্রাপ্যতার বিচারে এবং সম্ভাব্য রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা বিবেচনায় শঙ্কার মুখে আছে খোদ যুক্তরাষ্ট্রই। আর এই বিশেষ উপাদানের মজুত ও উৎপাদনে ধরতে গেলে একক কর্তৃত্ব স্থাপন করে বসে আছে চীন, যে কিনা যুক্তরাষ্ট্রের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। তাও শুধু এই সময়ে এসে নয়, সেই ১৯৮৫ সাল থেকেই।
মূলত প্রযুক্তির সম্প্রসারণের কারণেই চিরাচরিত জ্বালানি তেলের জায়গাটি দখল করতে যাচ্ছে বিরল খনিজ। ২০১৭ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট থাকার সময় ‘জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির’ জন্য গুরুত্বপূর্ণ আখ্যা দিয়ে ‘ক্রিটিক্যাল মিনারেলস’‑এর নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিতে কৌশল গ্রহণে একটি নির্বাহী আদেশে সই করেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই ‘ক্রিটিক্যাল মিনারেলস’‑এ নানা ধরনের খনিজ উপাদান তালিকাভুক্ত হলেও মূলে রয়েছে বিরল খনিজ। ২০২০ সালে মার্কিন সিনেটর টেড ক্রুজ এ সম্পর্কিত একটি আইন প্রস্তাব করেন। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বিরল খনিজ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সহায়তা ও ভর্তুকি দেওয়ার প্রস্তাব ছিল সেটি। জো বাইডেন ক্ষমতায় এসে প্রেসিডেন্টের প্রথম ১০০ দিনের কর্মযজ্ঞের মধ্যে যে তিনটি শিল্পের সরবরাহ ব্যবস্থা পর্যালোচনার উদ্যোগ নেন, তার একটি এই বিরল খনিজ। কিন্তু টেড ক্রুজের প্রস্তাবিত আইনটি পাস হয়নি সে সময়।
যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন সময়ে এই বিরল খনিজের মালিকানা পেতে নানা উদ্যোগ নিলেও তাতে প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা ছিল। গত কয়েক বছর ধরে এ নিয়ে তারা বেশ তৎপর হয়েছে। এবারের মার্কিন প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ভূমিকায় প্রযুক্তি মোঘলদের সংযুক্তি এ বিষয়ে তাদের নজরকে বেশ স্পষ্ট করে। সর্বশেষ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে যেভাবে বিরল খনিজ সম্পর্কিত চুক্তিতে বাধ্য করা হলো, তাতে এটা নিশ্চিত যে, যুক্তরাষ্ট্র এখন জেরবার হয়ে গেছে।
মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার বিষয়টি সরাসরি এই বিরল খনিজের প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর করছে। এর প্রাপ্যতায় ছেদ পড়া মানেই হলো প্রযুক্তি খাতে পিছিয়ে যাওয়া, যা দেশটির অর্থনৈতিক, ভূরাজনৈতিক, প্রাযুক্তিক, সামরিক–সকল বিচারেই প্রতিযোগিতা সামর্থ্যকে খর্ব করবে। ফলে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র এখন সেই দশায় আছে, যে দশায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান ছিল। তার সাম্রাজ্য টেকাতে হলে সংঘাত হোক বা অন্য কোনো উপায়–এই বিরল খনিজের মালিকানা তাকে পেতেই হবে।
উৎপাদন ও মজুত উভয় ক্ষেত্রেই প্রতিদ্বন্দ্বী চীন থেকে পিছিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র। ঠিক কী পরিমাণে? বিনিয়োগ সম্পর্কিত তথ্যভিত্তিক ওয়েবসাইট ইনভেস্টিংনিউজ‑এর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বিরল খনিজের মজুত ও উৎপাদন দুই বিচারেই শীর্ষে আছে চীন। সাধারণত যেসব দেশে কোনো খনিজের মজুত বেশি থাকে, সেসব দেশই সেই খনিজের উৎপাদনে এগিয়ে থাকে। আর সেই খনিজ যদি অতি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়, তবে তো কথাই নেই। কিন্তু বিরল খনিজের ক্ষেত্রে বিষয়টি এমন নয়। এ ক্ষেত্রে ব্রাজিলের কথা বলা যায়। মজুতের বিবেচনায় বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ দেশ ব্রাজিল। কিন্তু উৎপাদনে দেশটি অনেক পিছিয়ে। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও কৌশল এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। আবার মিয়ানমারে বিরল খনিজের মজুত সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া না গেলেও দেশটি গত বছর উৎপাদনে দ্বিতীয় শীর্ষ দেশ ছিল। মিয়ানমার সম্পর্কে আমরা আলাদাভাবে পরে আলোচনা করব। বরং এখন দেখা যাক প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কোন দেশে কী পরিমাণ বিরল খনিজের মজুত আছে।
চীন
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার দেওয়া তথ্যমতে, চীনে বিরল খনিজের মজুত আছে ৪ কোটি ৪০ লাখ মেট্রিক টন। উৎপাদনের বিচারেও দেশটি সবার ওপরে। ২০২৪ সালে দেশটি ২ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন বিরল খনিজ উৎপাদন করেছে।
চীন এ বিষয়ে অনেক আগে থেকেই সতর্ক। ১৯৮৭ সালে চীনের তৎকালীন নেতা দে শিয়াও পিং বলেছিলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের আছে জ্বালানি তেল। চীনের আছে বিরল খনিজ।’
ফলে বোঝাই যাচ্ছে যে, দেশটি এই বিরল খনিজ এবং এর ভবিষ্যৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে বহু আগে থেকেই সতর্ক ছিল। এরই আরেক উদাহরণ পাওয়া যায় যখন ২০১২ সালে চীন সরকার বিরল খনিজের মজুত কমে যাচ্ছে মর্মে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সে সময় থেকে বাণিজ্যিক ও জাতীয় পর্যায়ে দেশটি বিরল খনিজের মজুত রক্ষায় সচেষ্ট হয়, যা কার্যকর হয় ২০১৬ সাল নাগাদ। মনে রাখা ভালো যে, ততদিনে চীনের প্রেসিডেন্ট হয়ে গেছেন শি জিনপিং। প্রযুক্তি পণ্য তৈরি ও টেকসই জ্বালানি উৎপাদনের সাথে যুক্ত নানা সরঞ্জামের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত এই বিরল খনিজের রপ্তানিনীতিতেও বেশ কয়েকবার সংরক্ষণমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে দেশটি। ২০০৮ সালের মহামন্দার মাত্র দুই বছরের মাথায় দেশটি প্রথম এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়।
স্বাভাবিকভাবেই প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চীনের এই সুবিধাজনক অবস্থান মাথাব্যথার কারণ। এ নিয়ে তাদের মধ্যে ছায়াযুদ্ধ হয় প্রায়ই। বাণিজ্যযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের মেয়াদে বিরল খনিজ সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রযুক্তি রপ্তানি স্থগিত করেছিল দেশটি। সর্বশেষ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বিরল খনিজ থেকে চুম্বক তৈরিতে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল দেশটি।
চীন যে শুধু উৎপাদন করছে, তা নয়। গত কয়েক বছর ধরে বিপুল পরিমাণ বিরল খনিজ আমদানিও করছে। কার কাছ থেকে? এখানেই চলে আসে মিয়ানমার প্রসঙ্গটি। বিরল খনিজ উৎপাদনে দ্বিতীয় শীর্ষ দেশটি তার উৎপাদনের পুরোটাই রপ্তানি করে চীনে।
ব্রাজিল
মজুতের বিবেচনায় দ্বিতীয় শীর্ষ দেশ ব্রাজিল। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্যমতে, ব্রাজিলে বিরল খনিজের মজুতের পরিমাণ ২ কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টন। তবে এখনো দেশটি মজুতের বিপরীতে সেভাবে উৎপাদন করতে পারছে না। যদিও এ চিত্র দ্রুতই বদলে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই সময়ে নয়া জ্বালানি বলে পরিচয় পাওয়া বিরল খনিজ নিয়ে বেশ ঘোলাটে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রাপ্যতার বিচারে এবং সম্ভাব্য রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা বিবেচনায় শঙ্কার মুখে আছে খোদ যুক্তরাষ্ট্রই। আর এই বিশেষ উপাদানের মজুত ও উৎপাদন ধরতে গেলে একক কর্তৃত্ব স্থাপন করে বসে আছে চীন, যে কিনা যুক্তরাষ্ট্রের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। তাও শুধু এই সময়ে এসে নয়, সেই ১৯৮৫ সাল থেকেই।ইনভেস্টিংনিউজ‑এর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এরই মধ্যে বিরল খনিজ কোম্পানি সেরা ভারদে দেশটির পেলা এমা এলাকায় থাকা খনি থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করেছে। ২০২৬ সাল নাগাদ এ উৎপাদন বছরে ৫ হাজার মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছে কোম্পানিটি।
এখানে পেলা এমা খনির সম্পর্কে কিছু কথা বলতেই হয়। চীনের বাইরে এটিই একমাত্র খনি, যেখানে একসঙ্গে মিলছে চারটি বিরল খনিজ–নিওডিমিয়াম, প্রাসিওডিমিয়াম, টারবিয়াম ও ডিসপ্রোসিয়াম।
ভারত
ইউএসজিএসের তথ্যমতে, ভারতে বিরল খনিজের মজুতের পরিমাণ ৬৯ লাখ মেট্রিক টন। ২০২৪ সালে দেশটি ২ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন বিরল খনিজ উৎপাদন করেছে। সমুদ্র সৈকত ও বালিতে থাকা খনিজের মধ্যেও বিরল খনিজ থাকে। এ ধরনের উৎস বিবেচনায় বিশ্বের ৩৫ শতাংশের মালিকানা ভারতের।
ভারতও এই খনিজ উৎপাদনে বেশ সতর্ক। ২০২২ সালেই দেশটির পরমাণু শক্তি কমিশন এ সম্পর্কিত উৎপাদন ও সক্ষমতা সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশ করে। ২০২৩ সালে বিরল খনিজ সম্পর্কিত গবেষণা ও এ‑সংক্রান্ত প্রকল্প উন্নয়নে নীতিসহায়তা দিতে আইন তৈরির উদ্যোগ নেয় ভারত সরকার। পাশাপাশি ২০২৪ সালের অক্টোবরে ভারতে প্রথম বিরল খনিজ, আকরিক ও চুম্বক তৈরির কারখানা গড়ার ঘোষণা দেয় ট্রাফালগার নামে দেশটির একটি প্রতিষ্ঠান।
অস্ট্রেলিয়া
তালিকায় চতুর্থ স্থানটি অস্ট্রেলিয়ার দখলে। ইউএসজিএসের তথ্যমতে, দেশটিতে বিরল খনিজের মজুত আছে ৫৭ লাখ মেট্রিক টন। উৎপাদনেও দেশটির অবস্থান চতুর্থ। গত বছর দেশটি ১৩ হাজার মেট্রিক টন বিরল খনিজ উৎপাদন করে।
খনি থেকে বিরল খনিজ উৎপাদন শুরু করেছিল ২০০৭ সালে। কিন্তু খুব দ্রুততার সঙ্গে এ ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া। দেশটির মাউন্ট ওয়েল্ড খনিতে বিরল খনিজ উত্তোলনের কাজ করে লিনাস রেয়ার আর্থস কোম্পানি, যা চীনের বাইরে থাকা বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান। অস্ট্রেলিয়া তো বটেই খনি থেকে তোলা কাঁচামাল থেকে বিরল খনিজ উৎপাদনে মালয়েশিয়াতেও প্রতিষ্ঠানটির কারখানা আছে।
রাশিয়া
রাশিয়া এ ক্ষেত্রে তালিকায় পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে। ২০২৪ সালের সর্বশেষ তথ্যমতে, দেশটিতে বিরল খনিজের মজুতের পরিমাণ ৩৮ লাখ মেট্রিক টন। যদিও এর আগের তথ্যমতে, রাশিয়াতে এই মজুতের পরিমাণ ছিল ১ কোটি মেট্রিক টন। কিন্তু ২০২৪ সালে দেশটির সরকার ও দেশটিতে সক্রিয় বিভিন্ন কোম্পানি এই মজুতের পরিমাণ পুনঃনিরীক্ষা করে জানায়, এ মজুত ৩৮ লাখ মেট্রিক টন। গত বছর দেশটি আড়াই হাজার মেট্রিক টন বিরল খনিজ উৎপাদন করেছে।
রাশিয়া যে বিরল খনিজের মজুত ও এর উৎপাদন নিয়ে অনেক বেশি সচেতন, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে ২০২০ সালে দেশটি যখন ১৫০ কোটি মার্কিন ডলারের পরিকল্পনা ঘোষণা করে। বিরল খনিজ নিয়ে ঘোষিত এই পরিকল্পনার লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয় চীনকে।
ভিয়েতনাম
ভিয়েতনামে বিরল খনিজের মজুত আছে ৩৫ লাখ মেট্রিক টন। দেশটির উত্তর‑পশ্চিমাঞ্চলীয় চীন সীমান্তে এবং পূর্বের উপকূল অঞ্চলে একাধিক খনি আছে। তবে দেশটিতে ২ কোটি ২০ লাখ টনের মজুত আছে বলে জানিয়েছে ওয়ার্ল্ড পপুলেশন সার্ভে। যদিও এই মজুতের পরিমাণ নিয়ে বিতর্ক আছে। দেশটির মজুত এই মানের হলে তালিকায় দেশটির অবস্থান দ্বিতীয়তে উঠে আসবে।
তবে ২০২৪ সালে ভিয়েনাম সরকারের নানা দপ্তর থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ইউএসজিএস জানিয়েছে, দেশটিতে বিরল খনিজের মজুত ২২ লাখ মেট্রিক টনের মতো। প্রতি বছর দেশটি ৩০০ মেট্রিক টনের মতো বিরল খনিজ উৎপাদন করে। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে এ উৎপাদন ২০ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেছে দেশটির প্রশাসন। ২০২৩ সালে এই পরিকল্পনা প্রকাশের পর এ সম্পর্কিত সংস্থা ভিয়েতনাম রেয়ার আর্থের চেয়ারম্যানসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত ও গ্রেপ্তার করা হয়। ফলে এই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র
তালিকায় সপ্তম স্থানে আছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে বোঝাই যাচ্ছে যে, বিরল খনিজ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র এতটা উদ্বিগ্ন কেন? কেন তারা দেশে দেশে এ নিয়ে নানা তৎপরতা চালাচ্ছে?
যুক্তরাষ্ট্রে বিরল খনিজের মজুতের পরিমাণ ১৯ লাখ মেট্রিক টন বলে জানিয়েছে ইউএসজিএস। তবে দেশটি এ তুলনায় বেশ ভালো উৎপাদন করে। ২০২৪ সালে দেশটি ৪৫ হাজার মেট্রিক টন বিরল খনিজ উৎপাদন করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের মাউন্টেইন পাস খনি থেকেই এ উৎপাদন হয়। খনিটির মালিক এমপি ম্যাটেরিয়ালস খনি থেকে উত্তোলিত বিরল খনিজের আকরিক থেকে চুম্বক ও অন্যান্য উপাদান তৈরিতে আরেকটি কারখানা স্থাপন করছে কাছাকাছি এলাকায়।
যুক্তরাষ্ট্র এই বিরল খনিজের মালিকানা বুঝে নিতে নানা তৎপরতা শুরু করেছে। এটা শুধু নিজ দেশে নয়। গোটা বিশ্বেই। তবে নিজ দেশে ২০২৪ সালের এপ্রিলে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে থাকা কয়লা অবশেষ ও বাইপ্রোডাক্ট থেকে চার ধরনের বিরল খনিজ পেতে বিশেষ প্রকল্প হাতে নেয়। এ সম্পর্কিত প্রযুক্তি উন্নয়নে ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৭৫০ কোটি মার্কিন ডলার।
গ্রিনল্যান্ড
ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পরপরই গ্রিনল্যান্ড কেনার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন। এ নিয়ে বেশ কয়েকবার কথাও বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সে সময় থেকেই এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। এই আগ্রহের পেছনে ধারণা করা হয় গ্রিনল্যান্ডের বিরল খনিজের মজুত একটি বড় কারণ। অঞ্চলটিতে ১৫ লাখ মেট্রিক টন মজুত রয়েছে। তবে তারা কোনো উৎপাদনে এখনো যায়নি।
বিরল খনিজের মজুত নিয়ে এক ধরনের অনিরাপত্তায় ভুগছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের বিপরীতে লড়তে তার এর মজুত যেমন দরকার, তেমনি দরকার এর উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনও। দুই ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে। এ কারণেই ২০২৫ সালে ক্ষমতায় বসতে না বসতেই ডেনমার্কের আওতাধীন স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দেন ট্রাম্প। যদিও ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড–উভয়ের পক্ষ থেকেই এ প্রস্তাব নাকচ করে দেওয়া হয়েছে।
শীর্ষ এই ৮ দেশের বাইরে উল্লেখযোগ্য দেশগুলোর মধ্য রয়েছে–তানজানিয়া ৮ লাখ ৯০ হাজার, কানাডা ৮ লাখ ৩০ হাজার ও দক্ষিণ আফ্রিকা ৭ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন। এর সাথে গ্রিনল্যান্ডের সমরূপ ভূগঠন থাকা নর্ডিক দেশগুলোতে ভালো পরিমাণে বিরল খনিজ মজুত আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে সুইডেনে এ ধরনের একটি মজুতের সন্ধান পাওয়া গেছে, যার পরিমাণ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে সেখানে ১০ লাখ মেট্রিক টনের মজুত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর মধ্যে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ দিতে বলে হইচই ফেলে দিয়েছেন ট্রাম্প। এর বাইরে দক্ষিণ আফ্রিকা রয়েছে ব্রিকস জোটে। এর সাথে পাল্লা দিতে যুক্তরাষ্ট্র যে কোয়াড গঠন করেছে, সেখানে আবার ভারতও রয়েছে। ফলে এই দুই জোটের মধ্যেও একটা লড়াই চলছে। এ নিয়ে বিস্তারিত আলাপে পরে আসা যাবে।
আপাতত বিরল খনিজ নিয়ে বিশ্বের পরাশক্তিগুলো যে একটা বেশ ভালো রকমের যুযুধান দশায় আছে, সেটা বুঝে নেওয়াই জরুরি। এই ভবিষ্যতের জ্বালানির মালিকানা পেতে দিকে দিকে চলছে ভূরাজনৈতিক নানা সমীকরণ। সেদিকে আমরা এর আগে তাকিয়েছি কিছুটা এর আগে ‘নয়া বিশ্ব’ শীর্ষক ধারাবাহিক নিবন্ধে। এর সঙ্গে এই ধারাবাহিকটি জুড়ে নিলে পরিস্থিতি কতটা ঘোলাটে, সে বিষয়ে অন্তত আঁচ পাওয়া যাবে।
আগামীকাল পড়ুন: বিরল খনিজ কী, কেনই-বা এত গুরুত্বপূর্ণ?
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]



