যে কথাকার নিজের জীবনকে পুঁজির কঠিন যূপকাষ্ঠে সমর্পণ করেও, মানুষের অস্তিত্বকে নিরাভরণ গদ্যের তীব্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে সবার সামনে উন্মোচিত করেন, তাঁর নাম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬)। তিনি কেবল আটাশ বছরের সাহিত্যিক যাত্রাপথের এক দ্রষ্টা নন; বাংলা কথাসাহিত্যের সেই অদম্য শিল্পী— যিনি মনের অতলান্ত গহ্বর থেকে আদিম প্রবৃত্তি আর সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তিভূমি থেকে শ্রেণি-সংগ্রামের কঠিনতম সত্যটুকু তুলে এনেছেন।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখালেখিকে নিছক গল্প বলা মনে করা ভুল; কারণ তা হলো জীবনের সেই সুনির্দিষ্ট নকশা, যা নিয়তি, প্রকৃতি, আর পুঁজির অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা মানুষের অমোঘ পরিণতিকে বারবার মনে করিয়ে দেয়। এই কারণেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৃষ্টিকর্ম এক গভীর দার্শনিক দলিল হিসেবে বিবেচিত, যা তাঁর সমকালীনদের ছাপিয়ে বিশ্ব সাহিত্যের আঙিনায় ফ্রয়েডীয় মনোবিশ্লেষণের ও মার্কসীয় বাস্তববাদের পতাকা বহন করে।
মানিক যখন লিখতে এলেন, তখন বাংলা সাহিত্যের সমসাময়িক প্রেক্ষাপট ছিল এক গভীর সন্ধিক্ষণে। একদিকে তখনও রবীন্দ্রনাথের রোমান্টিক ঔজ্জ্বল্য বিরাজমান, অন্যদিকে শরৎচন্দ্র মধ্যবিত্তের আবেগ ও পারিবারিক বন্ধনের কাহিনিতে বিপুল জনপ্রিয়। কিন্তু এই দুই মহান সাহিত্যিকের ছায়া পেরিয়েই জন্ম নিয়েছিল ‘কল্লোল’ গোষ্ঠীর বিদ্রোহ।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এই বিদ্রোহের স্রোতধারাতেই যুক্ত হলেন, তবে তার পথ ছিল স্বতন্ত্র ও তীক্ষ্ণ। তিনি সেই সময়েই সাহিত্যে নিয়ে এলেন ফ্রয়েডীয় মনোবিশ্লেষণ এবং মার্কসীয় সমাজ-পর্যবেক্ষণ, যা সেই সময়ের পাঠকদের কাছে ছিল সম্পূর্ণ নতুন এক নান্দনিক চ্যালেঞ্জ। তাঁর এই সাহিত্যিক উত্থান ঘটেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রাক্কালে, যখন বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা এবং ঔপনিবেশিক শাসনের জীর্ণতা সমাজে এক তীব্র নৈতিক অবক্ষয় সৃষ্টি করেছিল।
তাঁর শিল্পসৃষ্টির শুরুতেই যে গভীর চিন্তাধারাটি আমাদের কাছে ধরা দেয়, তা হলো মানুষের ভেতরের ‘আমি’ বা সত্তার জটিলতা। ‘দিবারাত্রির কাব্য’ (প্রকাশকাল: ১৯৩৫) উপন্যাসটিই তাঁর প্রথম জোরালো প্রমাণ, যেখানে প্রেম ও সম্পর্কের বিশ্লেষণ খুবই নির্মোহ, প্রায় বৈজ্ঞানিক। সুপ্রিয়ার মনের সেই টানাপড়েন যেন আমাদেরই আদিম ইচ্ছা এবং বিবেক বা সামাজিক চেতনার মধ্যে চলা এক সূক্ষ্ম সংঘাত। এই চরিত্রগুলিতে আমরা অবদমিত বাসনা-র এক কাব্যিক প্রকাশ দেখি। এই পর্বেই ‘জননী’ বা ‘আত্মহত্যার অধিকার’-এর মতো উপন্যাসগুলিতে তিনি দেখান, কীভাবে অর্থনৈতিক চাপ একটি পরিবারের সব সম্পর্ককে নাড়িয়ে দেয়, কিন্তু এই বাস্তবতার মধ্যেও ব্যক্তির একাকিত্ব ঢাকা থাকে না।
এই মনোবিশ্লেষণ যখন বৃহত্তর সমাজ জীবনের প্রেক্ষাপটে আসে, তখনই জন্ম নেয় তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিগুলি। তাঁর প্রধান উপন্যাসগুলির মধ্যে অন্যতম হলো—‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ (১৯৩৬), ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ (১৯৩৬) এবং ‘অহিংসা’ (১৯৪১)। এই তিন ক্যানভাসে তিনি মানবজীবনের মৌলিক সমস্যাগুলি উন্মোচন করেন। ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’-র শশী ডাক্তার যেন জীবনের অর্থহীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এক নায়ক; গ্রামীণ জীবনের মায়া ও বন্ধনের মধ্যেও তার বিচ্ছিন্নতা তীব্রভাবে প্রকট। মানুষ এখানে প্রকৃতির নিয়তি ও অর্থনৈতিক চক্রের হাতে বাঁধা এক পুতুল মাত্র— এই দার্শনিক দৃষ্টিকোণ তাঁকে সার্ত্রে বা আলবেয়ার কামু-র ‘Absurdity’ (অবাস্তবতা)-র ধারণার কাছাকাছি নিয়ে আসে।
অন্যদিকে, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’-তে কুবের, কপিলা ও হোসেন মিয়ার জীবনপ্রবাহে ফুটে ওঠে শ্রেণী-বৈষম্যের কঠিন বাস্তবতা। এখানে জীবন শুধু প্রকৃতির নয়, পুঁজিরও শিকার। এই উপন্যাসে আমরা মার্কসীয় ধারণার অর্থনৈতিক ভিত্তি কীভাবে মানুষের সামাজিক উপকাঠামো-কে নিয়ন্ত্রণ করে, তারই তীব্র শিল্পরূপ দেখি। কুবেরের মায়াদ্বীপের কল্পনাকে কেবল স্বপ্ন না বলে, অর্থনৈতিক শোষণের মুখে ‘মিথ্যা চেতনা’ (False Consciousness)-র এক কাব্যিক প্রকাশ হিসেবে বিশ্লেষণ করা যায়। সমালোচকরা তাঁর এই জীবনচিত্রণকে ইউরোপীয় এমিল জোলা-র ন্যাচারালিজম-এর সঙ্গে তুলনীয় বলে মনে করেন। এই পর্বেই ‘দর্পণ’ (১৯৪৫), ‘শহরতলী’ (১৯৪০), ‘শহরবাসের ইতিকথা’ (১৯৪৬)-এর মতো উপন্যাসগুলিতে তিনি মন্বন্তর ও যুদ্ধের আঘাতে সৃষ্ট শহুরে মধ্যবিত্তের ক্ষয় ও মানবিক সম্পর্কের জটিলতা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তুলে ধরেন।
তবে, তাঁর ছোটগল্পগুলিতে এই শৈলী আরও নির্মম এবং তীক্ষ্ণ। ‘প্রাগৈতিহাসিক’, ‘সরীসৃপ’, ‘মিহি ও মোটা কাহিনী’, ‘সমুদ্রের স্বাদ’, ‘ফেরিওলা’— এমন অসংখ্য সংকলনে তিনি সভ্যতার আবরণ সরিয়ে মানুষের আদিম ক্ষুধা ও কামনাকে কোনো রকম সাজসজ্জা ছাড়াই প্রকাশ করেছেন। এই রূঢ় বাস্তববাদ তাঁর সাহিত্যকে এক অসাধারণ মাত্রা দেয়। এই পর্যবেক্ষণ এতোটাই নিরাবেগ যে তা অনেক ক্ষেত্রেই ডকুমেন্টারি শিল্পের মর্যাদা পায়। এই দৃষ্টিকোণ তাঁকে রুশ সাহিত্যিক ফিওদোর দস্তয়েভস্কি-র মতো লেখকদের কাছাকাছি নিয়ে যায়, যিনি সমাজের ‘ভূগর্ভস্থ মানুষ’ -এর অন্ধকার দিকটি অনুসন্ধান করেছিলেন।
জীবনের শেষ দিকে, রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়ার পর তাঁর উপন্যাসে শ্রেণি-সংঘাত আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘চিহ্ন’ (১৯৪৭) বা ‘স্বাধীনতার স্বাদ’ (১৯৫১)-এর মতো লেখায় সমাজতান্ত্রিক আদর্শের প্রতি তাঁর বিশ্বাস ও শ্রেণি-মুক্তির আহ্বান স্পষ্ট। এই সময়ের ‘চতুষ্কোণ’ বা ‘হরফ’-এর মতো উপন্যাসগুলিতেও তিনি সামাজিক অসঙ্গতি এবং গণমানুষের জাগরণের সুর ধরে রাখেন। তাঁর এই বিশ্লেষণগুলি তৎকালীন দেশভাগ-পূর্ববর্তী সমাজে ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িক জটিলতারও এক প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দেয়।
আসলে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে যখন আমরা রবীন্দ্রনাথের রোমান্টিক সৌন্দর্য এবং শরৎচন্দ্রের সহজ আবেগ-এর বিপরীতে দেখি, তখন তাঁর কাজের মৌলিক পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়। তিনি ছিলেন সেই শিল্পী, যিনি বিশ্বাস করতেন যে মানুষের জীবন ও ভাগ্য তার অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু তাঁর এই বাস্তববাদ কেবল স্থানীয় নয়, তা সার্বজনীন। আজকের পৃথিবীতে যখন নব্য-উদারবাদী অর্থনীতির কারণে বিশ্বজুড়ে সম্পদের বৈষম্য চরম আকার ধারণ করেছে এবং জলবায়ু সংকটের ফলে প্রান্তিক মানুষের জীবন আরও দুর্বিষহ হচ্ছে— তখন ‘পদ্মা নদীর মাঝি’-র কুবেরের সংগ্রাম বা তাঁর অন্যান্য উপন্যাসের শ্রেণি-সংঘাত আমাদের বর্তমান পৃথিবীর সমস্যাগুলিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। তাঁর সাহিত্য মানবমনের গোপন কুঠুরি এবং শোষণের অদৃশ্য রজ্জু—উভয়কেই উন্মোচিত করে। তিনি তাঁর সকল সাহিত্যকর্মের নান্দনিক ঐশ্বর্য দিয়ে প্রমাণ করে গিয়েছেন যে, কালের স্রোত পেরিয়েও তিনি তাঁর সময়ের এবং আমাদের সময়ের অমোঘ দার্শনিক ভাষ্যকার।
এভাবেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তাঁর স্বল্পকালীন জীবনে, বাংলা সাহিত্যের চিরাচরিত পথে এক বিপ্লবী বাঁক সৃষ্টি করে যান। তাঁর গদ্যের প্রতিটি পঙক্তি কেবল বাক্য নয়, যেন কঠোর বাস্তবের অভিজ্ঞতা ও গভীর মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধানের এক একটি তীক্ষ্ণ শলাকা। তিনি আমাদের শিখিয়ে গিয়েছেন— মানুষের স্বপ্ন, প্রেম, এমনকি ক্রোধও শেষ পর্যন্ত তার ক্ষুধা ও অর্থনৈতিক অবস্থানের কাছে নতজানু। এই সত্যের নির্ভীক উচ্চারণই তাঁকে কেবল একজন ঔপন্যাসিক বা গল্পকার হিসেবে নয়, বরং মানবজাতির অস্তিত্ববাদী সংকটের একজন অন্যতম প্রধান ব্যাখ্যাকার হিসেবে বিশ্বমঞ্চে স্থায়ী আসন করে দিয়েছে। শতবর্ষ পরেও তাঁর সাহিত্য আজও আমাদের নীরব জিজ্ঞাসা করে— আমরা কি আজও সেই অদৃশ্য পুঁজির সুতোয় বাঁধা পুতুল হয়েই আছি, নাকি সেই বাঁধন ছিন্ন করার সাহস অর্জন করেছি?
১৯৫৬ সালের ৩ ডিসেম্বর এই মহান শিল্পী তাঁর পার্থিব জীবন থেকে যতি টানলেও, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্য সেই সাহসেরই জন্ম দেয়, যা যুগ পেরিয়েও আমাদের মনন ও সমাজকে নিরন্তর জাগিয়ে রাখে।
লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
b_golap@yahoo.com, 01712070133
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]