নারীমুক্তি আন্দোলনের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ১৯০৫ সালে ‘সুলতানার স্বপ্ন’ নামে একটি কালজয়ী উপন্যাস লিখেছিলেন। ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত সেই গ্রন্থে পুরুষের সহায়তা ছাড়াই নারীদের দ্বারা শাসিত এক ভূখণ্ডের গল্প বলা হয়েছিল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, উপন্যাসটি প্রকাশের ৮৬ বছর পর বেগম রোকেয়ার (১৮৮০-১৯৩২) স্বদেশে একজন ‘সুলতানা’ বা নারী শাসকের অভিষেক ঘটে বেগম খালেদা জিয়ার মাধ্যমে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। হয়তো এভাবেই বাস্তবে রূপ নেয় বেগম রোকেয়ার সেই স্বপ্ন।
দেশপ্রেমিক এই ‘সুলতানা’র জন্ম ১৯৪৫ সালে। রাজনৈতিক ও ব্যক্তিজীবনের অসংখ্য ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে ৮০ বছর বয়সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর ২০২৫) ভোরে তিনি ইহকাল ত্যাগ করেন। তিনি বিদায় নিলেও রেখে গেছেন তাঁর অসামান্য অবদান ও কীর্তি, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে বেঁচে থাকবে।
খালেদা জিয়ার এই সফলতা ভাগ্যনির্ধারিত ছিল না; বরং তা অর্জিত হয়েছে বহু বছরের সংগ্রাম এবং মাতৃভূমির মানুষের প্রতি অবিচল ভালোবাসার মধ্য দিয়ে। তিনি ছিলেন এমন এক নারী, যাঁর দৃঢ়তা প্রতিটি পরীক্ষায় আরও শাণিত হয়েছে। যেখানে অন্যরা হোঁচট খেয়েছে, সেখানে তিনি মানিয়ে নিয়েছেন; যেখানে অন্যরা ভীত হয়েছে, সেখানে তিনি সাহসের সঙ্গে এগিয়ে গেছেন।
যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ব্যক্তিজীবনের এই গভীর বেদনা খালেদা জিয়াকে মানসিকভাবে অত্যন্ত দৃঢ় করে তোলে। এই দৃঢ়তাই তাঁকে পরবর্তী সময়ে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন নেতৃত্ব দিতে ও কর্তৃত্ববাদকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সাহায্য করে। ১৯৮২ সালে দলের হাল ধরার মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে তাঁর অনড় নেতৃত্ব তাঁকে দেশবাসীর কাছে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর ১৯৯৬ (স্বল্প মেয়াদে) এবং ২০০১ সালে আবারও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি যেসব আসনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, তার একটিতেও কখনো পরাজিত হননি।
২০০৭ সালের জরুরি অবস্থা থেকে শুরু করে পরবর্তী দীর্ঘ সময় তাঁকে চরম প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলায় কারাবরণ করতে হলেও তিনি মাথা নত করেননি। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতনের পর সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে এসব মামলা থেকে খালাস দেন এবং মামলাগুলোকে ‘বিদ্বেষপূর্ণ’ বলে অভিহিত করেন।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তিনি স্বনির্ভরতার ওপর জোর দিয়েছিলেন। তাঁর সময়েই ১৯৯৩-৯৪ অর্থবছরে প্রথম ‘ভ্যাট’ বা মূল্য সংযোজন কর প্রবর্তিত হয় এবং উন্নয়ন বাজেটে দেশীয় সম্পদের অংশ ২১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশে উন্নীত হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন এবং সার্ক-এর চেয়ারপারসন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
বিরূপ সমালোচনা কিংবা রাজনৈতিক অশালীন মন্তব্যের মুখেও খালেদা জিয়া সবসময় ধৈর্য ও মার্জিত আচরণ বজায় রেখেছেন। তাঁর সৌম্য ও শান্ত অবয়ব তাঁকে শালীনতার এক অনন্য প্রতীকে পরিণত করেছিল। জীবনের শেষ প্রান্তে তিনি দলীয় ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় ঐক্যের এক অবিসংবাদিত প্রতীকে পরিণত হন।
তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোকের মধ্য দিয়ে আজ দেশবাসী তাঁকে স্মরণ করছে। খালেদা জিয়ার প্রয়াণে বাংলাদেশের রাজনীতির এক মহাকাব্যিক অধ্যায়ের ইতি টানল। তাঁর দেশপ্রেম ও আদর্শের প্রতিধ্বনি শোনা যাবে আগামীর বহু প্রজন্ম পর্যন্ত।
(নিবন্ধটি ইংরেজি থেকে অনূদিত)
লেখক: সহযোগী সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]