বিরোধী দল কিংবা ভিন্নমত দমনে মামলা-হামলা, গুম, অপহরণ আর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড—ফ্যাসিবাদের সাড়ে ১৫ বছর এসব ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে বাংলাদেশ। আর সেসব অমানবিক জুলুম-নিপীড়নের মুখে সর্বাধিক ভুক্তভোগী ছিলেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। সেই অনিশ্চিত দিনগুলোতে নিপীড়নের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের আশার বাতিঘর ছিলেন নির্বাসিত তারেক রহমান, আর দেশের ভেতর শেষ আশ্রয়স্থল ছিলেন সদ্যপ্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা, তৎকালীন সরকার কর্তৃক বেআইনি গৃহবন্দিত্ব, গ্রেপ্তার ও কারাবরণের ঝুঁকি সত্ত্বেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে খালেদা জিয়ার দৃঢ়তা ছিল সারাদেশের নেতাকর্মীর কাছে অনুপ্রেরণা।
কারাবরণের সেই ঝুঁকি পরে সত্য হয় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। সে সময় দীর্ঘ দুই বছরের বেশি সময় তিনি কারান্তরীণ ছিলেন। অথচ তখন তাঁর শারীরিক অবস্থা এমন এক পর্যায়ে ছিল যে, উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিয়ে যাওয়া ছিল জরুরি।

খালেদা জিয়া তাঁর দীর্ঘ ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনে বেশিরভাগ সময় গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করে গেছেন, সোচ্চার থেকেছেন আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে। বলা যায়, বরাবরই তিনি দেশ ও জনগণকে মাতৃতুল্য স্নেহে আগলে রেখেছিলেন। স্বৈরাচারী হাসিনার রক্তচক্ষু ও তাঁর অনুচরদের নানা অপপ্রচারের মুখে তিনি বলেছিলেন, ‘এই দেশ ছেড়ে, এই দেশের মানুষকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না। এই দেশই আমার একমাত্র ঠিকানা।’
এই কথাই প্রমাণ করে যে, খালেদা জিয়া শুধু বিএনপি চেয়ারপারসন ছিলেন না, ছিলেন গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী। দেশ যতবার গণতান্ত্রিক সংকট বা স্বৈরাচারের কবলে পড়েছে, ততবারই তিনি তাঁর গণতান্ত্রিক আদর্শের দীক্ষায় সংগ্রাম করেছেন। আজ তাই তিনি বিশ্বমঞ্চেও গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামী এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব।
গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাস নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘ভয়েস অব আমেরিকা’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ একটা গরিব দেশ, সমস্যা অনেক। সেজন্য আমাদের মধ্যে যদি সুসম্পর্ক না থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবে সেই দেশের মানুষের কল্যাণ করা অত্যন্ত কঠিন। প্রতি পদে পদে যদি বাধা আসে, তাহলে কিন্তু আপনার যত সুন্দর পরিকল্পনাই থাকুক, সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারবেন না।’

এমনকি ১৯৯৬ সালের যে নির্বাচন নিয়ে নিন্দুকেরা খালেদা জিয়ার সমালোচনা করেন, সেই নির্বাচনের কয়েক দিনের মাথায় কিন্তু তিনি পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার কাঠামো অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, যা গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাবোধ ও বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ।
শুধু গণতন্ত্র নয়, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধেও আজীবন সোচ্চার ছিলেন খালেদা জিয়া। ভারত কর্তৃক একতরফা ফারাক্কা বাঁধ ও গঙ্গা চুক্তি নিয়েও তিনি ছিলেন প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর, যা দেশের মানুষকে গভীরভাবে আপ্লুত করে।
১৯৯৭ সালে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘সারা পৃথিবীতে যেখানেই যখন গিয়েছি, গঙ্গার পানি নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। আমরা তাঁদের বলেছি—তোমরা ভারতকে বলো, তারা যে কাজটি করছে, এটি ঠিক করছে না। শুধু পানি সমস্যা নয়; পানির সঙ্গে এটি মানবাধিকারের সম্পর্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ আমার ৪-৫ কোটি লোক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এই গঙ্গার পানি ও ফারাক্কার জন্য। এবং আপনারা দেখছেন আজ সারা বাংলাদেশে আর্সেনিক সমস্যা, তা এই ফারাক্কা থেকে সৃষ্টি হয়েছে।’
আজ মহান নেত্রী খালেদা জিয়া পরলোকগত। ৩১ ডিসেম্বর তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে আনা হয়েছিল লাল-সবুজের পতাকা মোড়ানো কফিনে। গোটা দেশ তখন শোকাচ্ছন্ন। অশ্রুসিক্ত নয়নে তাঁর জানাজায় অংশ নিয়েছেন লাখ লাখ মানুষ। সেই জনসমুদ্র দেখে বলতে হয়—খালেদা জিয়া, আপনি লাল-সবুজের পতাকা মোড়ানো অশ্রুবিন্দু; কাঁদছে বাংলাদেশ।
লেখক: সাংবাদিক
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]



