দেশে ফিরলে শেখ হাসিনার কী হতে পারে? আইন, বিচার ও রাজনৈতিক বাস্তবতা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ক্ষমতাচ্যুত হয়ে প্রায় দুই বছর ভারতে অবস্থানের পর দেশে ফিরে তাঁর আত্মসমর্পণের বার্তায় নতুন করে সামনে এসেছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—দেশে ফিরলে তাঁর ভাগ্যে কী ঘটতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, বরং বাংলাদেশের প্রচলিত আইন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায় এবং পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই নিহিত। তবে শেখ হাসিনার আত্মসমর্পণের কোনো সুযোগ নেই। কারণ, দণ্ডিত হওয়ার কারণে দৃশ্যপটে আসা মাত্রই তিনি গ্রেপ্তার আসামি হিসেবে বিবেচিত হবেন। মুক্ত মানুষ হিসেবে আদালতে তাঁর আত্মসমর্পণের সুযোগ থাকবে না।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের অনুকূলে তাঁদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশও দিয়েছে। ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেছে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী হিসেবে নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকাণ্ডের ওপর তাঁদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ছিল এবং সেই দায়িত্বে অংশ হিসেবেই তাঁদের অপরাধমূলক দায় নির্ধারিত হয়েছে।

এই রায়ের ফলে দেশে ফিরে শেখ হাসিনার সামনে প্রথমেই যে বাস্তবতা দাঁড়াবে, তা হলো গ্রেপ্তার। তাঁর বিরুদ্ধে জারি হওয়া পরোয়ানা অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁকে হেফাজতে নেবে এবং সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনাল বা আদালতে হাজির করবে। সরকারের পক্ষ থেকেও স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, দেশে ফিরলেই তাঁকে আইনের আওতায় আনা হবে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনে আপিল ও রায় কার্যকরের বিধান সাধারণ ফৌজদারি মামলার চেয়ে ভিন্ন। International Crimes (Tribunals) Act, 1973-এর ২১ ধারায় বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে দণ্ডিত ব্যক্তি রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল বিভাগে আপিল করতে পারবেন। এই সময়সীমা অতিক্রম করলে আইনে আর নিয়মিত আপিলের সুযোগ থাকে না। তবে দেশে ফিরে গ্রেপ্তারের পর তিনি আপিল বিভাগে বিলম্ব মার্জনার (condonation of delay) আবেদন করতে পারবেন। আদালত যদি তাঁর বিলম্বের কারণকে যথেষ্ট ও গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন, তাহলে বিলম্ব মার্জনা করে আপিল শুনানির সুযোগ দিতে পারেন। কিন্তু আদালত যদি বিলম্ব মার্জনার আবেদন গ্রহণ না করেন, তাহলে ট্রাইব্যুনালের দণ্ড কার্যকরে উচ্চ আদালতের পৃথক কোনো ডেথ রেফারেন্স বা অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না। অর্থাৎ, এ ক্ষেত্রে আইনে নির্ধারিত বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সরকার দণ্ড কার্যকরের পদক্ষেপ নিতে পারে।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিচার নয়; এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, আইনের শাসন ও রাষ্ট্রের জবাবদিহিতার একটি বড় পরীক্ষা। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো সাবেক সরকারপ্রধান মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। ফলে এই বিচার দেশীয় রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলেও গভীর আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে শেখ হাসিনা নিজে অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হবেন। তাঁর দাবি, মামলাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে রাষ্ট্রপক্ষের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের মতে, এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়; বরং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার একটি বিচারিক প্রক্রিয়া।

রাজনৈতিকভাবে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের বার্তা নিঃসন্দেহে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে তাঁর গ্রেপ্তার ও বিচারকে সরকার আইনের শাসনের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছে; অন্যদিকে তাঁর সমর্থকেরা বিচারিক প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। ফলে আদালতের প্রতিটি আদেশ, প্রতিটি শুনানি এবং প্রতিটি আইনগত পদক্ষেপ দেশ-বিদেশে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষিত হবে।

সবশেষে বলা যায়, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং সেই রায়কে কীভাবে তিনি আইনি প্রক্রিয়ায় মোকাবিলা করবেন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, শেষ কথা বলে বিচারব্যবস্থাই। আর সেই কারণেই শেখ হাসিনার দেশে ফেরা শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসেরও এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

লেখক: ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]