রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত ৪০৭ দিনে গড়িয়েছে। এই সংঘাত কবে শেষ হবে, আদৌ শেষ হবে কি-না, কেউ বলতে পারে না। সবাই তো, বিশেষ করে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন সাহেব হয়তো ভেবেছিলেন “ভিনি, ভিসি, ভিডি” অর্থাৎ “আসলাম, দেখলাম, জয় করলাম”। কিন্তু বিষয়টা এতটা সহজ হয়নি বা হবে না- এটাই বাস্তব। ফলে এই সংঘাতের শেষ ঠিক কোথায়, তা বলতে যাওয়াটাও অতি বড় পণ্ডিতের জন্যও মহা মূর্খামি হয়ে যাবে।
অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র, ততধিক প্রশিক্ষিত বাহিনী, মহা মহা ক্ষমতাধর বন্ধুদের নিয়ে ২০ বছরের বেশি আফগানিস্তানে কাটিয়ে থোতা মুখ ভোঁতা করে দেশে ফিরতে হয়েছে মহাশক্তিধর আমেরিকাকে। আমেরিকার এই নাকে খত দেওয়া থেকে পুতিন সাহেব কোনো শিক্ষা নিয়েছেন, তার প্রমাণ এখনো মেলেনি। বরং রুশদের রণদর্পী অহমকে কাজে লাগিয়ে এই অকাম চালিয়ে যেতে তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তাতে আমাদের মতো আমজনতার তেমন কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু মুশকিলটা হয়েছে, উলুখাগড়ার মতো প্রাণটা আমাদেরই যাচ্ছে, একটু অন্যভাবে। বাজারে আগুন, এটা নেই, ওটা নেই, এতে উনি মাইন্ড করেন, ওটা করলে আরেকজনের আঁতে ঘা লাগে- আর এ সবেরই কারণ হিসেবে হাজির করা হচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতকে। তাতে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে আমরা কি এভাবে প্রাণ দিতে থাকব? নাকি মরার মতো বেঁচে থাকব? প্রশ্নটা শুনতে বেশ সোজা, কিন্তু বর্তমান ভূরাজনীতির বাস্তবতায় উত্তরটা আপতত সবারই অজানা। কারণ একেকজনের হিসাব একেক রকম। এই ইউরোপের কথাই ধরুন। বিশেষ করে পশ্চিম ইউরোপের। কী শান্তিতেই না এখানকার দেশগুলো দীর্ঘসময় কাটিয়েছে! ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর তারা তেমন কোনো সংঘাতের মুখোমুখি হয়নি। বরং অন্যের (বলা ভালো আমেরিকার) সঙ্গী বা মিত্র হিসেবে দূর দেশে টন টন বোমা ফেলে এসেছে। হাজার হাজার সৈন্য পাঠিয়েছে। কিন্তু নিজেদের দেশে কোনো আঁচড় লাগতে দেয়নি। বাহ, বেশ মজা না?
আফগানিস্তানে আমেরিকার নাকে খত দেওয়া থেকে ভ্লাদিমির পুতিন কোনো শিক্ষা নিয়েছেন, তার প্রমাণ এখনো মেলেনি। ছবি: পিক্সাবে
কিন্তু বিপত্তিটা বাধালেন সাবেক কেজিবির গুপ্তচর পুতিন সাহেব। দীর্ঘ দিন ধরে পশ্চিম ও পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশ রাশিয়ার অঢেল গ্যাস সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। প্রচণ্ড শীতে ঘর গরম রাখার জন্য রাশিয়ার গ্যাসই ভরসা। কিন্তু বড় ভাই-এর নির্দেশ মেনে নিষেধাজ্ঞা দিতে গিয়ে তারাই পড়ল সবচেয়ে বিপদে। এবারের এই শীত ইউরোপের বহু মানুষ কীভাবে কাটিয়েছেন, তা আমাদের সবারই প্রায় অজানা। কারণ পশ্চিমা গণমাধ্যমের কাছে হয়তো এর কোনো সংবাদ মূল্য নেই। ফলে আমরা যারা পশ্চিমা গণমাধ্যমের রঙিন চশমায় দুনিয়াটা দেখি, তাদের কাছে ছবিটা বরাবরের মতো প্রশান্তিরই থেকেছে। দ্বিতীয় আরেকটি বিষয়ের দিকে যদি আমরা নজর দিই, তাহলে দেখব, ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো একজন, যিনি আমেরিকার রাজনীতির জগতে একবারে অচেনা-অজানা ছিলেন, তিনি কিনা সটান খেলতে নেমেই দেশটির প্রেসিডেন্ট হয়ে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে আমেরিকার মিডিয়া চিল চিৎকার জুড়ে দিল, ভোটে নিশ্চয় বড় ধরনের কোনো জালিয়াতি হয়েছে। কিন্তু কীভাবে? শেষমেষ অতি কষ্টে সন্ধান পাওয়া গেল বটে- রাশিয়া। রুশ গোয়েন্দারা নাকি সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্য নিয়ে সেটিকে সুচারূভাবে ব্যবহার করে (যাকে সমালোচকদের পরিভাষায় বলে ম্যানিপুলেশন) মার্কিন ভোটারদের প্রভাবিত করেছেন। সেই সঙ্গে শ্বেতাঙ্গ প্রভুত্ববাদ আর আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্বের মিশেল দিয়ে এমন সুন্দর ককটেল রুশরা বানিয়েছে যে, মার্কিন আমজনতা তা গোগ্রাসে গিলেছে।
আর ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হয়ে আমেরিকার দুই শ বছরের প্রচলিত ধারা বা হেজিমনিকে কীভাবে নাস্তানাবুদ করেছেন, তা তার চার বছরের শাসনে স্পষ্ট। আগামী ২০২৪ সালে যে তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে পারবেন না বা জিততে পারবেন না- এমন কথা জোর দিয়ে বলার মতো একজন মার্কিন পণ্ডিতও পাওয়া যাবে না। যদিও তার নামে একাধিক নারী কেলেঙ্কারীর পাশাপাশি আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও আছে। যে কারণে ইতিহাসে তিনিই প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি গ্রেপ্তার হয়ে আদালতের কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। আবার জামিনে বেরিয়ে এসে সদম্ভে পরবর্তী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন। ট্রাম্পের নারী বা আর্থিক কেলেঙ্কারীর ইতিহাস অনেক পুরোনো। প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে সবাই তা জানত। এমন একজন লোকের প্রেসিডেন্ট হওয়া ঠেকাতে পারেনি মার্কিন আইন, প্রশাসনিক কাঠামো, সর্বোপরি ভোটারেরা। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ট্রাম্প কতবার মিথ্যা বলেছেন বা কতবার বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন, তার হিসাব রেখেছিল সে দেশের বিখ্যাত দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্ট। তাদের হিসাব অনুযায়ী, চার বছরের জমানায় ৩০ হাজার ৫৭৩ বার মিথ্যা বলেছেন বা বিভ্রান্তিকর দাবি করেছেন ট্রাম্প। আরেক বিখ্যাত সংবাদপত্র নিউইয়র্ক টাইমস প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ট্যাক্সের প্রায় দেড় লাখ পৃষ্ঠা নথি পর্যালোচনা করে জানিয়েছিল, তিনি কী বিপুল পরিমাণ কর ফাঁকি দিয়েছেন। আর এমন একটি লোককে আমেরিকানরা প্রেসিডেন্ট পদে বসিয়েছে, ভোট দিয়ে। সেই ট্রাম্পকে জব্দ করার জন্য তার টুইটার ও ফেসবুক পেজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এখন অবশ্য খুলে দেওয়া হয়েছে। এহেন কীর্তিমান ট্রাম্প সাহেব এখনো আসরে বহাল তবিয়তেই আছেন, যদিও আইনি পথে তাকে নির্বাচনে অযোগ্য করার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। অযোগ্য না হলে কী হবে, বলা মুশকিল। যাই হোক, ভবিষ্যতে কী হবে তা আপাতত ভবিষ্যতের ওপর ছাড়া থাক।
গ্রেপ্তারের পর দেওয়া বক্তব্যে আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা জানিয়েছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: পিক্সাবে
আবার ব্রেক্সিটের কথাই ধরা যাক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঘর পোড়া গরুর মতো ইউরোপের দেশগুলো বুঝেছিল, এক হয়ে চলতে না পারলে কী বিপদটা হবে। বিশেষ করে (সাবেক) সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো দৈত্যাকার শক্তির পাশে বাস করে। ফলে অনেক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তারা ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ইইউ নামে একটি সংঘের কাঠামো গড়ে তোলে। যেখানে ইউরোপের বাসিন্দাদের মধ্যে দেশীয় পরিচয়ের বাইরে একটা ইউরোপীয় পরিচয় গড়ে তোলার চেষ্টা ছিল। এর অবশ্য আরেকটি দিক ছিল, যা কিনা ছিল তৎকালীন সোভিয়েত ব্লকের অর্থাৎ পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোকে সুখী-সমৃদ্ধ জীবনে প্রলুব্ধ করার আশায় ঘি ঢালার দাওয়াই। ফলে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্ত হতেই ওয়ারশ জোট ভেঙে বেরিয়ে আসা পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে ইইউ জোটে যোগ দেওয়ার হিড়িক পড়ে যায়। অনেকের সহজে সদস্য পদ জুটেও যায়। স্বাভাবিকভাবে পূর্ব ইউরোপের দেশ থেকে লোকজন ভালো কাজ আর সুন্দর-নিরাপদ জীবনের আশায় ছুটতে থাকে পশ্চিমে। আর তাতেই টান পড়ে ওইসব দেশের মানুষের কাজে, ধাক্কা খায় এতদিনকার নিশ্চিত জীবন। ফলে সবচেয়ে সস্তা আবেগটি উসকে দেওয়ার সুযোগ আসে পশ্চিম ইউরোপের বিরোধী পক্ষের হাতে। আর এটি কাজে লাগানোর উত্তম দেশ অবশ্যই ব্রিটেন (বিরোধীদের বিবেচনায়), যাদের সাম্রাজ্যে কিনা দীর্ঘদিন ‘সূর্যাস্ত’ বলে শব্দটাই ছিল না। টার্গেট কতটা সফল দেখুন, শেষমেষ ব্রিটিশরাই তিন দফা গণভোটের মাধ্যমে ভেস্তে দিল অভিন্ন ইউরোপের স্বপ্ন। সে দেশের সরকার ও বিরোধী পক্ষ একজোট হয়ে এই ভাঙার বিরুদ্ধে প্রচার চালানোর পরেও তা ফলদায়ক হয়নি। সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্রিটিশ নাগরিকের ইইউ ভেঙে বেরিয়ে আসার অনঢ় সিদ্ধান্ত তারা বদলাতে পারেনি। ফলে যা হওয়ার, তাই হয়েছে। এর পর ব্রিটেনসহ ইউরোপের বড় বড় দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, গোয়েন্দা সংস্থাসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা ‘কেমনে পরিলাম না জানিতে’-এর উত্তর খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত মিলেও যায় জবাব। আবার সেই ‘রুশ গোয়েন্দা সংস্থা’ ও ‘পুতিন সাহেব প্রশাসন’। কিন্তু ভেবে আর কী হবে? ততদিনে আম-ছালা সব গেছে।
বিরক্ত পাঠক এতক্ষণে ভাবতে শুরু করেছেন, এই পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটার কী দরকার। এর সবই তো আমি জানি। কিন্তু প্রশ্ন অন্য জায়গায়, যা আজ অনিবার্যভাবে উঠে এসেছে। প্রথমে দুই ট্রিলিয়ন বা দুই লাখ কোটি ডলারের বেশি অর্থ ২০ বছর ধরে খরচ করে শেষ পর্যন্ত আফগানিস্তান থেকে পাততাড়ি গোটাতে হলো আমেরিকা ও তার মিত্রদের। এই বিপুল অর্থ ও সময় ব্যয়ে ড্রোন আর রোবোটের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ যুদ্ধ পরিচালনার পরীক্ষা কতটা সময় ধরে হয়েছে, তাও বলা কঠিন। আবার বিপুল সামরিক শক্তি নিয়ে দোর্দণ্ড প্রতাপে ইউক্রেনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল রাশিয়া। বিচ্ছিন্নতাবাদী অধ্যুষিত দুটি এলাকার দখল বাদ দিলে চারশ দিনেও সাফল্যের তালিকাটা ফাঁকাই রয়ে গেছে। অথচ দ্বিতীয় বিষয়টি দেখুন (পশ্চিমা গণমাধ্যমের হিসেবে) কোনো ধরনের লোকক্ষয়, শক্তিক্ষয় না করে, অস্ত্রের ঝনঝনানি না তুলে অন্যের অঙ্গুলি হেলনে কীভাবে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে বসে গেলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কীভাবে মূলধারার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের চাওয়াকে কলা দেখিয়ে ব্রিটিশ নাগরিকেরা ইইউ থেকে বেরিয়ে গেল? তাহলে কি আসলেই দুনিয়াব্যাপী যুদ্ধের বা জয়ের বা অন্যকে বশীভূত রাখার সংজ্ঞা ও পন্থা বদলে যাচ্ছে? এখানে আরেকটি বিষয় খেয়াল করার মতো রয়েছে। তাইওয়ান নিয়ে আমেরিকা অনেক হুঙ্কার দিলেও আরও অনেক বেশি হিসাব-নিকাশ এখনো তাদের বকেয়া থেকে গেছে। উত্তর কোরিয়া বারবার ‘পাগলামি’ করা সত্ত্বেও কেউ তার টিকিটিও ছুঁতে পারছে না। সবার জানা যে, পারমাণবিক অস্ত্রসম্ভার একাধিক দেশের রক্ষাকবচ ছিল এবং এখনো আছে। পারমাণবিক লড়াইয়ের চরম পরিণতি সর্ম্পকেও সবাই সচেতন। তারপরও শ্রেষ্ঠত্ব, আধিপত্য, প্রভুত্ব- এই শব্দগুলো দুনিয়া থেকে দূর হয়নি। বরং একটু শক্তিধর হলেই দেশগুলোর মধ্যে গেঁড়ে বসছে এসব আকাঙ্ক্ষা। সঙ্গে সঙ্গে বাঁক বদল হচ্ছে এগুলো প্রতিষ্ঠার পন্থাও। পরের লেখায় আমরা দেখব এই ভূবনগ্রামে প্রযুক্তির অচিন্তনীয় অগ্রগতির (কখনো কখনো অনাকাঙ্ক্ষিতও বটে) মধ্যে দুনিয়াটা কীভাবে বদলে যাচ্ছে। চেনা পশ্চিমা জগতের বজ্রমুষ্ঠি কীভাবে ধীরে ধীরে আলগা হয়ে পড়ছে।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ইনডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন