বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর জারি করা জরুরি স্বাস্থ্য সতর্কতা তুলে নিয়েছে। করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ নামের এই প্রাণঘাতী ভাইরাস বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সারা বিশ্বে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করে। তিন বছর স্থায়ী এই সতর্কতা চলাকালে সংস্থাটির হিসাবে ৭০ লাখের মতো মানুষ মারা গেছে, যা বিভিন্ন দেশের সরকারের দেওয়া সংখ্যার যোগফল। যদিও এই বিশ্ব সংস্থা মনে করে, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা এর তিনগুণেরও বেশি হবে অর্থাৎ ২ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে।
পাঠক, শিরোনামের পরে শুরুটা পড়ে মনে হতে পারে, ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়া কেন? কিন্তু একটা কথা তো সবাইকে মানতে হবে, প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির কারণেই এত দ্রুত করোনার মতো মহামারি বা অতিমারীকে বাগে আনা সম্ভব হয়েছে। আর আমাদের আলোচ্য বিষয়ই হচ্ছে প্রযুক্তি। প্রযুক্তির সাথে পাল্লা দিয়ে কোথায় পৌঁছাবে মানুষ? কী করবে? বিষয়টা এমন না যে, এই চিন্তা গতকাল থেকে শুরু হয়েছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব নিয়ে আলোচনা অনেক আগেই বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে। চ্যাট জিপিটির সর্বশেষ সংস্করণ শুধু এর পালে বাতাস দিয়েছে মাত্র। বাতাসটা সাইক্লোনের রূপ নেওয়ায় সবাই একটু নড়েচড়ে বসেছে আর কি!
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রধান নির্বাহী ক্লাউস সোয়াব, ২০১৫ সালে। পরের বছর দ্য ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভ্যুলিউশন নামে ১৭২ পাতার একটা বইও লিখে ফেলেন তিনি। এরপর থেকেই সবার মুখে মুখে ফিরছে শব্দগুচ্ছটি। এই বইয়ে ক্লাউস বিভিন্ন বিষয়ের ওপর আলো ফেলেছেন, দেখার চেষ্টা করেছেন কীভাবে বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাবে। সেই বদলের তালিকায় রাজনীতি, সরকার, শাসন ব্যবস্থা - কোনো কিছুই বাদ পড়েনি।
প্রযুক্তির চলমান ঘটনাকে যখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বলা হচ্ছে, তখন নিশ্চয়ই আরও তিনটি এ ধরনের বিপ্লব আছে। সেগুলো আসলে কী?
১৭৬৩-৭৫, এই সময়কালে স্কটিশ বিজ্ঞানি জেমস ওয়াটের বাস্পীয় ইঞ্জিনের আবিস্কার, যা প্রথম মানুষের জায়গাটা দিয়ে দিয়েছিল মেশিনকে; সেই সময়কালকে বলা হচ্ছে প্রথম শিল্প বিপ্লব। এরপর এলো বিদ্যুৎ, যার আবিস্কারক হিসেবে বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন বা মাইকেল ফ্যারাডের নাম খুবই জনপ্রিয়। তবে এর আগে উইলিয়াম গিলবার্টকে ভুললে চলবে না। আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্যুতের ব্যবহার শুরু হয় ১৮৭০ সালের দিকে আমেরিকায়। এক বিদ্যুৎই শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দেয়। অনেকেই সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালি সিনেমাটা দেখেছেন। সেখানে অপু-দুর্গা দুই ভাই-বোন দূর থেকে দেখে ধোঁয়া উড়িয়ে চলা রেলগাড়িকে। বিদ্যুৎ সেই ট্রেনকে পাঠিয়ে দিয়েছে ইতিহাসের পাতায়, জাদুঘরের চার দেয়ালের মধ্যে। বিশেষজ্ঞরা এই পরিবর্তনের নাম দিয়েছেন দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লব। আর তৃতীয়টির শুরু ১৯৬৯ সালে কম্পিউটার ব্যবহারের মাধ্যমে, যা শেষ হয় তারবিহীন মোবাইল ফোন এবং সেই ফোনে ইন্টারনেট সংযোগের মধ্য দিয়ে।
এরপর আসলেই আর কী-ই বা বাকি থাকে? আছে জনাব, ফিল্ম এখনো বাকি। কিন্তু বাকি অংশের ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন আতঙ্কিত কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে যে মানুষ বিভ্রান্ত। ইলন মাস্ক, স্টিভ ওয়াজনিক, ইয়োভাল নোহা হারারি, স্টুয়ার্ট রাসেল, স্লেভয় জিজাক, এসথার পেরেল থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) গডফাদার খ্যাত জিওফ্রে হিনটনের মতো ডাকসাইটে ব্যক্তিত্বরাও আছেন সতর্কিত করার তালিকায়। ফলে সাধারণ মানুষ যেমন বিভ্রান্ত তেমনি বিভক্তও বটে, যেমনটা সব বিষয়ে আমরা হয়ে থাকি আর কি!
ছবি: পিক্সাবে
ক্লাউস সোয়াব লিখছেন, এই চতুর্থ শিল্প বিপ্লব এত দিন প্রচলিত ধারায় রাজনীতি করে আসা রাজনীতিকদের চিন্তা ও সমাজে তাঁদের ভূমিকা বদলাতে বাধ্য করবে। কারণ প্রযুক্তির অগ্রগতি ব্যক্তি মানুষকে প্রভাবশালী করে তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম দেখলেই বোঝা যায়, ঠিক-বেঠিক যাই হোক না কেন মানুষ তার মত প্রকাশ করছে। কোনো বাধা তাকে আটকাতে পারছে না। একটি মোবাইল ফোন, তাতে ইন্টারনেট সংযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম তাকে এই সুযোগ করে দিয়েছে। কী করবেন বলুন?
একবার উইকিলিকসের কথা ভাবুন তো। আমেরিকা নামক রাষ্ট্রের গোপন সামরিক নথি ফাঁস করে দিয়ে কী কেলেঙ্কারিটাই না বাঁধিয়ে দিয়েছিল। মহাশক্তিধর দেশ হয়েও আমেরিকা এখনো এর প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসেঞ্জ নামের সেই অস্ট্রেলিয় নাগরিককে নিজের দেশেই নিতে পারেনি। এখনো তিনি লন্ডনের এক কারাগারে বন্দী। এডওয়ার্ড যোশেফ স্নোডেনের নাম কি আমরা ভুলে গেছি? আমেরিকার গোপন সামরিক নথি ফাঁস করে এখন রাশিয়ার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বহাল তবিয়তে আছেন। গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগসহ বিভিন্ন অভিযোগে দুজনকেই অভিযুক্ত করলেও আমেরিকার পক্ষে তাঁদের আইনের আওতায় আনা এখনো সম্ভব হয়নি। এই দুটো বড় ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহারের কারণ প্রযুক্তি পুরো খেলাটাই বদলে দিয়েছে। এর সাথেই খাপ খাওয়াতে হবে বিভিন্ন দেশ ও তার সরকারকে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বিভাজিত দেশসহ যদি সবার কথাই চিন্তা করা যায়, তাহলে দেখা যাবে, এক ই-মেইল ব্যবস্থাই মানুষের ঠিকানা বৈশ্বিক করে ফেলেছে, মুছে ফেলেছে মোকাম। হোয়াটসঅ্যাপ বা এই জাতীয় কথা বলা বা বার্তা পাঠানোর অ্যাপ মানুষের ইন্টারনেটবিহীন ফোন সংযোগকেও অবান্তর করে তুলেছে। এসব তো গেল তৃতীয় বিপ্লবের সময়ের কথা। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অ্যাডভান্স রোবোটিকস, ক্লাউড কম্পিউটিং, বিগ ডেটা, ইন্টারনেট অব থিংস, অ্যাডিটিভ ম্যানুফ্যাকচারিং, অগমেন্টেড রিয়ালিটি, ভার্চুয়াল রিয়ালিটি, সাইবার সিকিউরিটি - চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এত কিছুর সাথে দেশে দেশে সরকারগুলো তাল মেলাবে কীভাবে? এর বাইরে আবার জিন প্রযুক্তিসহ আরও অনেক কিছুই আছে।
ছবি: পিক্সাবে
ফলে সরকারগুলোকে এটা বুঝতে হবে, প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্ষমতায়নের একটা পালাবদল হচ্ছে। প্রচলিত কাঠামো দুর্বল হয়ে সরকারের বাইরের প্রতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সক্ষমতা বাড়ছে। এটা যেমন ঠিক, তেমনি ক্লাউস বলছেন, সরকারকে এই পরিবর্তনের আবশ্যিক অংশ হতে হবে। কারণ এই পরিবর্তনের সাথে ভালো ও মন্দ - দুটোই আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। লন্ডনকেন্দ্রিক সামি কনসালটিং-এর ফেলো ডেভিড লে-র কথায়, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব সরকারকে আরও খোলামেলা, নমনীয় ও জ্ঞানসম্পন্ন হতে সাহায্য করবে। তবে বড় বড় করপোরেটদের কাছে সরকারের অক্ষমতা ক্রমশ বাড়ার আশংকা রয়েছে। আর সরকারি সংস্থাগুলো যদি নতুন নতুন প্রযুক্তি সময়মতো আত্তীকরণ করতে না পারে, তাহলে নিজেদের দক্ষতা তো হারাবেই, পাশাপাশি সরকারেরও ক্ষতি হবে।
সেজন্য সরকারের দায়িত্বে যাঁরা থাকবেন, সবার আগে তাঁদের ভুলে যেতে হবে পুরোনো দিনের কথা। নতুন প্রযুক্তি বা আবিষ্কার নিয়ে সরকারগুলোর সিদ্ধান্ত কী হবে - এর মধ্যে তাঁদের যেমন ২৪ ঘণ্টা ডুবে থাকতে হবে, তেমনি সব বিষয়ে নিজেদের হালনাগাদ রাখাটাও আবশ্যিক। সাবেকিয়ানা দিয়ে কতটুকু চলবে তা বলা বড় কঠিন পড়ছে দিনকে দিন। কারণ সরকারগুলো এত দিন ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়ার যে নীতি মেনেছে, তা বোধহয় অচল হতে চলেছে। এখন থেকে সব বিষয় অন্যভাবে ভাবতে হবে। না হলে তাঁদের টাইম মেশিনে ফিরে যেতে হবে মধুর অতীতে!
ভেনেজুয়েলার সাংবাদিক ও ওয়াশিংটনভিত্তিক ত্রৈমাসিক ফরেন পলিসির সাবেক সম্পাদক মোইসেস নাইম এক বাক্যে সরকার, রাজনীতিক সবার জন্য বিষয়টি জলবৎ তরলং করে দিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘একুশ শতকে ক্ষমতা পাওয়াটা হবে সহজতর, পালন করা হবে কঠিনতর এবং হারানোটা হবে আরও সহজ।’
সেলিম খান: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন