এআই অপরাজিতা কি দেশের সাংবাদিকদের চাকরি খাবে?

অতি সম্প্রতি দেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশন স্টেশন প্রথমবারের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সংবাদ উপস্থাপককে নিয়ে দর্শকদের সামনে হাজির হয়েছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে অপরাজিতা। এ নিয়ে সারা দেশে বেশ আলোচনা চলছে এখন। সাংবাদিক মহলে এবং এর বাইরেও কেউ কেউ আশংকা প্রকাশ করে বলতে শুরু করেছেন, দেশের সাংবাদিকদের নাকি শিরে সংক্রান্তি উপস্থিত! চাকরি এই গেল বলে! কিন্তু আসলেই কি তাই?

গত বছরের শেষ থেকে সারা পৃথিবীতেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে তোলপাড় চলছে। এর শুরুটা হয়েছে মানুষের মতো কথোপকথনে সক্ষম চ্যাটজিপিটি দিয়ে। একে একে গুগল, ফেসবুক থেকে শুরু করে প্রধান প্রধান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এআই-এর বিভিন্ন মডেল নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছে পুরোদমে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন খাতে এআই টুলস ব্যবহার শুরু করার হার বেড়ে গেছে। টেক দুনিয়ার এক নতুন ক্রেজ এই এআই। যেভাবে কম্পিউটার বা ইন্টারনেট নিয়ে একদা পুরো বিশ্বে মাতামাতি হয়েছিল, তা এবার শুরু হয়েছে এআই নিয়ে। কম্পিউটার বা ইন্টারনেট নিয়েও মানুষের মধ্যে কাজ হারানোর শংকা প্রবল ছিল। ঠিক তেমনটি আছে এআই নিয়েও। এরই মধ্যে এআই-এর কারণে কোন কোন পেশার মানুষ ঝুঁকিতে পড়তে পারেন, তার হিসাব-নিকাশও শুরু হয়ে গেছে।

অন্যান্য কর্মক্ষেত্রের মতো সংবাদমাধ্যমেও এমন হিসাব-নিকাশ আছে প্রবলভাবেই। গত কয়েক মাসে ভারতের বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক ইলেকট্রনিক সংবাদমাধ্যম কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তা বা এআই সংবাদ উপস্থাপক হাজির করেছে। ইন্ডিয়া টুডে গ্রুপের আজতক নিউজ চ্যানেল গত এপ্রিলে হাজির করে সানা। ওড়িশার প্রখ্যাত টিভি চ্যানেল ওটিভি নিয়ে আসে লিসা। উল্লেখযোগ্য যে, ভারতে বেশির ভাগ টিভি চ্যানেল বেশ ধুমধাম করে নানা আয়োজনে নিয়ে এসেছে এসব এআই সংবাদ উপস্থাপক। অর্থাৎ শুধু নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারই নয়, বরং এর সঙ্গে টিভি চ্যানেলের নিজস্ব প্রচার পাওয়ার বিষয়টিও জড়িত ছিল ভালোভাবেই। ভারতেও এআই সংবাদ উপস্থাপক নিয়ে উদ্বেগ দেখা গেছে মোটা দাগে।

এর বাইরে রাশিয়ার সোভয়ি টিভি গত মার্চে আবহাওয়ার খবর জানানোর জন্য ভার্চুয়াল উপস্থাপকের ব্যবহার শুরু করেছে। এছাড়া দ্য গার্ডিয়ান, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, ব্লুমবার্গ, ফোর্বস, রয়টার্সসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রথিতযশা সংবাদমাধ্যম বেশ বছর চারেক ধরেই সংবাদ তৈরির কাজে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছে। ফোর্বস তো এমন এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, যেটি কনটেন্টের বিষয় ও শিরোনাম তৈরির ক্ষেত্রে পরামর্শ দেয়। আর দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের একটি এআই টুল প্রচুর ডেটা থেকে পুরো সংবাদই তৈরি করতে পারে।

গত কয়েক মাসে আমাদের উপমহাদেশে এআই উপস্থাপক নিয়ে তোলপাড় শুরু হলেও, এসবের শুরুটা হয়েছিল প্রায় চার-পাঁচ বছর আগে। চীনের সিনহুয়া ২০১৮ সালে প্রথম এক আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সম্মেলনে প্রথম প্রদর্শন করেছিল এআই সংবাদ উপস্থাপক। পুরুষরূপী সেই সংবাদ উপস্থাপকই ছিল বিশ্বের প্রথম এআই সংবাদ উপস্থাপক। এর কিছুদিন পরে সেই উপস্থাপককে দিয়ে ঘটা করে সংবাদ উপস্থাপনও করা হয়েছিল চীনের টিভি চ্যানেলে।

চীন তখন বলেছিল, তাদের এই এআই উপস্থাপক মেশিন লার্নিং, ফেস রিকগনিশন, ডেটা অ্যানালাইসিসসহ বিভিন্ন কাজ করে ফেলবে এক তুড়িতে। সিনহুয়া তখন এও বলেছিল যে, নিউজরুমের বিভিন্ন কাজে এআই ব্যবহারের পাশাপাশি মাঠের সাংবাদিকতার কাজেও তারা এআই রিপোর্টার ব্যবহার করবে শিগগিরই। কিন্তু অতো তাড়াতাড়ি আর কিছু হয়নি। বরং এআই উপস্থাপক তৈরিতে পথ দেখানো চীন চলতি বছর অবশেষে নারীরূপী এআই সংবাদ উপস্থাপক আনতে পেরেছে। অর্থাৎ, মুখে যাই বলা হোক না কেন এই কাজটি একেবারে সহজ নয়।

মূলত চ্যাটজিপিটির আবির্ভাবের কারণেই ভারত-বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এআই সংবাদ উপস্থাপক নিয়ে আসার কাজটি তুলনামূলকভাবে সফল হয়েছে। কম্পিউটার গ্রাফিক্সের মাধ্যমে মানব আদল তৈরি করে তাতে টেক্সট টু স্পিচ টেকনোলজি ব্যবহার করা হচ্ছে। অর্থাৎ আপনি এআই-কে যা বলতে বলছেন, সে তাই বলবে। এটা অনেকটা মাইক্রোফোনে কথা বলার মতো। মাউথ পিসে আপনি যা বলেন, সেটিই যেমন সাউন্ডবক্সে শোনা যায়, তেমনি এআই উপস্থাপককে আপনি যা বলতে বলবেন, সেটি তাই বলবে।

তবে হ্যাঁ, এর সঙ্গে যদি বিগ ডেটা অ্যানালাইসিস, হালনাগাদ ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তিসহ অন্যান্য উন্নত প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়, তখন মানুষ সাংবাদিকদের সঙ্গে এর বিশাল পার্থক্য তৈরি হবে। কারণ এসব কাজগুলো মানুষের জন্য শ্রম ও সময়সাধ্য। কিন্তু এআই এগুলো অনেক কম সময়ে নিখুঁতভাবে করে ফেলতে সক্ষম হবে।

এখনকার এআই সংবাদ উপস্থাপকদের বিষয়টিই বিবেচনা করা যাক। একটি ২৪ ঘন্টা ধরে বিরতিহীন চলা টিভি স্টেশনে উপস্থাপকদের একটি বড় দল রাখতে হয়। কোনো একজনের পক্ষেই ৮ ঘন্টার বেশি কাজ করা সম্ভব নয়। আবার এই ৮ ঘন্টার মধ্যেও কাজের চাপে কেউ না কেউ অসুস্থ হয়ে যেতে পারেন, ক্লান্ত হতে পারেন। এই অক্লান্ত কাজ করে যাওয়ার জায়গাটিতেই মানুষকে টপকে যেতে পারে এআই অপরাজিতারা। কারণ এ ধরনের এআই মডেল ২৪ ঘন্টাই প্রতিষ্ঠানকে সার্ভিস দিয়ে যেতে পারবে। অন্তত নিরলসভাবে পাঠ করে যেতে পারবে নিউজ বুলেটিন।

সমস্যা হলো, কাজ চালিয়ে নিতে পারলেও এআই সংবাদ উপস্থাপক দিয়ে মানুষের মতো আবেগের বহিঃপ্রকাশ সম্ভব নয়। ধরুন, দেশে বড় কোনো ঘটনা ঘটে গেলে, সত্যিকারের কোনো ব্রেকিং নিউজ তৈরি হলো। সেক্ষেত্রে এআই সংবাদ উপস্থাপকের কিছু নির্দিষ্ট মুখভঙ্গি দিয়ে ঘটনার তাৎপর্য দর্শকদের সামনে সঠিকভাবে তুলে ধরা কঠিন। বিশেষ করে সাক্ষাৎকার নেওয়া বা বিতর্ক পরিচালনা করা এআই দিয়ে এখনও পর্যন্ত অসম্ভব। অর্থাৎ সঠিক ভাবাবেগ ও প্রতিক্রিয়ার প্রকাশে এখনও মানুষ তুলনাহীন। তবে যেভাবে প্রযুক্তির শনৈ শনৈ উন্নতি হচ্ছে, তাতে এ ক্ষেত্রেও যে এআই একসময় প্রতিযোগী হিসেবে আবির্ভূত হতে পারবে না, তার সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎবাণী করা কখনোই নিরাপদ নয়।প্রশ্ন হলো, একটি নতুন প্রযুক্তি বাজারে আসা মাত্রই সাংবাদিকদের চাকরি হারানোর শংকা জাগছে কেন? আসলেই কি যোগ্য এআই-এর কাছেই চাকরি হারাতে হবে? নাকি প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের বদলে ফেললেই ল্যাটা চুকে যাবে?

শুরুতে দেখা যাক, এআই বা রোবটের কারণে মানুষ কী পরিমাণ চাকরি হারাতে পারে! ২০২৩ সালের মার্চ মাসে গোল্ডম্যান স্যাকস এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে মানুষের করা কনটেন্ট জেনারেশনের মোট কাজের এক-চতুর্থাংশ করে ফেলতে পারবে এআই। আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর হিসাব করলে প্রায় ৩০ কোটি চাকরি খেয়ে ফেলবে এআই। এবং এর প্রভাব হবে সত্যিকার অর্থেই ভয়াবহ।

আশার কথা হলো, দুঃসংবাদের পাশাপাশি সুসংবাদও আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব কাজে মানুষের মানবিক গুণাবলী উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেসব কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অচল। বিশেষ করে যেসব কাজে আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা এবং মৌলিক ও অভিনব চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন হয়, সেসব কাজ মানুষ দিয়েই করাতে হবে। সেখানে রোবট বা এআই দিয়ে কাজ হবে না।

ভারতের গণমাধ্যম সমালোচক শৈলজা বাজপাই কিছুদিন আগে এ বিষয়ে কথা বলেছিলেন জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবশ্যই সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের কাজে প্রভাব বিস্তার করবে। কিন্তু কতটা প্রতিযোগী হয়ে উঠতে পারবে বা আদৌ পারবে কিনা, সেটি এখনই বলা সম্ভব নয়। নিউজ বুলেটিন পড়ে যাওয়ার কাজ করতে পারলেও এসব এআই উপস্থাপক প্রতিক্রিয়া দেখাতে এবং সঠিক ভাবাবেগ প্রদর্শনে পারদর্শী নয়। আবার কোনো টেলিভিশন বিতর্ক চালানোও এদের দিয়ে সম্ভব হবে না।'

প্রতীকী ছবি। ছবি: পিক্সেলস থেকে নেওয়া
তবে তাই বলে সাংবাদিকেরা একেবারে ঝুঁকিমুক্ত থাকবেন বলেও মনে করেন না শৈলজা। তাঁর মতে, সাংবাদিকদের নিজেদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য এখনই লেগে পড়া উচিত। প্রয়োজন বিশ্লেষণমূলক সংবাদ পরিবেশন, মাঠের সাংবাদিকতাকে শক্তিশালী করা এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় মনোনিবেশ করা। শৈলজার ভাষায়, ‘সাংবাদিকদের অবশ্যই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনকে মুক্তমনে গ্রহণ করতে হবে এবং এর কারণে যেসব প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে সেগুলো এড়ানোর জন্য নিজেদেরকে পরিবর্তন করে যন্ত্রের থেকে এগিয়ে রাখতে হবে।‘

এবার প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের কিছু কথা শোনা যাক। তাঁরা বলছেন, আক্ষরিক অর্থেই যে কাজগুলো সৃজনশীল, সেগুলোতে মানুষের বিকল্প নেই। অর্থাৎ, যেসব কাজ ফর্মুলা মেনে হয় না, নতুন ধারণা সৃষ্টি করতে হয় এবং স্রেফ উপাদানগুলো ওলট-পালট করেই ফলাফল পাওয়া যায় না, সেসব কাজ মানুষকেই করে যেতে হবে। পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে যেসব কাজ হয়, সেগুলোও রোবট বা এআই করতে পারবে না। কারণ রোবট বা এআই তাদের ডেটাবেজে পাওয়া ডেটা নিয়েই এখনও পর্যন্ত কাজ করে। অর্থাৎ ক্রিয়েটিভ ও সোশ্যাল ইন্টেলিজেন্সে মানুষ যদি আরও দক্ষ হয়ে ওঠে, তবে এআই-এর পক্ষে সেটি অর্জন করা ঢের ঢের কঠিন। সত্যিকারের নতুন নতুন সৃজনশীল ধারণা তৈরি করা বা একেবারেই আউট অব দ্য বক্স কিছু ভাবা বর্তমান এআই-এর পক্ষে সম্ভব নয়। তবে ভবিষ্যতে জেমস ক্যামেরনের টারমিনেটর সিরিজের মতো নিজের মতো করে চিন্তা করতে পারা এআই বাস্তবে আবির্ভূত হলে ভিন্ন কথা।

অর্থাৎ, মোদ্দা কথা এই যে, ক্যামেরার পাশে রাখা অটো কিউ দেখে স্রেফ রিডিং পড়ে বা স্ক্রিপ্ট মুখস্ত করে তোতাপাখির মতো উগড়ে দিয়ে সাংবাদিক হওয়ার দিন শেষ। উপস্থাপনায় আনতে হবে নতুনত্ব, আনতে হবে আরও মানবিক গুণাবলীর সমাবেশ। ওদিকে হাতে বুম নিয়ে কারও ‘অনুভূতি’ জেনে বা ঈদের ভিড়ে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষারত মানুষের কাছে গিয়ে ‘কেমন লাগছে’ জিজ্ঞেস করার মতো সাংবাদিকতাও আর বেশিদন চলবে না। কারণ এই সবই করে দিতে পারবে এআই সংবাদ উপস্থাপক বা রিপোর্টার।

বরং এআই যেসব জায়গায় অচল, সেখানেই সচল হতে হবে মানুষ সাংবাদিকদের। কিসে কিসে এআই অচল সেটি নিশ্চয়ই ওপরের আলোচনায় কিছুটা বোঝা গেছে। এবার সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার বিষয়টি জানিয়ে লেখা শেষ করা যাক। সংবাদমাধ্যমে এআই-এর ভূমিকা নিয়ে সবচেয়ে বড় যে শংকাটি এখন বিশ্বজুড়ে জারি রয়েছে, সেটি হলো ফেক নিউজ ও ডিসইনফরমেশন। বলা হচ্ছে, এআই-এর কারণে এই ফেক নিউজ ও ডিসইনফরমেশন ছড়িয়ে পড়ার হার আরও বেড়ে যেতে পারে। আর এই জায়গাটিই মানুষ সাংবাদিকদের জন্য তুরুপের তাস। সঠিক ও নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনই যন্ত্রের বিরুদ্ধে তাদের অব্যর্থ হাতিয়ার!

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন