অভিন্ন ইউরোপের বিরাট স্বপ্ন দেখিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ইইউর নামে অনেকগুলো দেশ একত্রিত হয়েছিল। ৩০ বছরে স্বপ্ন সাকার হয়েছে সত্যি, কিন্তু বিভেদটা আর ঘোচেনি। এর বড় প্রমাণ ইইউ থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়া। যাকে সবাই খুব আদর করে ব্রেক্সিট বলে ডাকে। আর এ জন্য দোষারোপ করে রুশ গুপ্তচরদের। কিন্তু ভুলেও কেউ একবার বলে না, ইইউতে জার্মানি ও ফ্রান্সের মাতব্বরি বেড়ে চলাটা উন্নাসিক ব্রিটিশরা ঠিক নিতে পারেনি। যে কারণে শুরু থেকে আঠার মতো লেগে থাকলেও ব্রিটিশরা কখনো তাদের মুদ্রা পাউন্ডকে বাদ দিয়ে ইউরোপের অভিন্ন মুদ্র ইউরো-কে মেনে নেয়নি। আর প্রথম সদস্য দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্যই ৩১ জানুয়ারি, ২০২০ বেরিয়ে যায় ইইউ থেকে।
এই অবিশ্বাস যে শুধু ব্রিটিশদের মধ্যে আছে, তা কিন্তু নয়। অন্য দেশের মানুষ ও শাসকদের মধ্যে বিদ্বেষের বীজ ভালোভাবে টিকে আছে। পশ্চিম ইউরোপের ধনী দেশগুলোর ক্লাবের মেম্বার হয়ে জাতে উঠতে চেয়েছিল পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো। বিলুপ্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের খপ্পর থেকে বেরিয়ে প্রতিবেশী ধনীদের সাথে গা ঘেঁষাঘেঁষি করতে তাই সময় লাগেনি বা অসুবিধা হয়নি তাদের। কিন্তু গত ৩০ বছরে এই দেশগুলো বুঝেছে, আপন ভাগ্য আপনাকেই গড়তে হবে। সময়ের সাথে সাথে পশ্চিমা বন্ধুদের প্রেম-ভালোবাসা ফিকে হয়ে গেছে। পুতিন সাহেবের হটকারি সিদ্ধান্ত সেটাকে আরও ভালোভাবে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
এখানে মজার ব্যাপার হলো, ইউরোপের একটা বড়সংখ্যক মানুষ বিশ্বাস করে, রাশিয়ার ইউক্রেনে হামলার জন্য আমেরিকার উসাকনিই দায়ী। আর এই সংঘাতে ইউরোপকে জড়ানো আমেরিকার বৃহত্তর গেম প্ল্যানেরই অংশ। গত শীতে কাবু হওয়া জার্মানরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, আমেরিকার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল করে তুলতে তাদের প্রতিবেশী রাশিয়ার কাছ থেকে গ্যাস না কিনতে বাধ্য করেছে ওয়াশিংটন। ইতালির বাসিন্দাদের বক্তব্য, ১৯৯৯ সালে ন্যাটো সাবেক যুগোশ্লাভিয়ায় বোমা মেরে রক্তাক্ত করেছিল ঠুনকো অজুহাতে। সেই হামলা দেশটাকে ভেঙেচুরে কয়েক টুকরো বানিয়েছে। একইভাবে গাদ্দাফিকে অপসারণের কথা বলে ২০১১-তে লিবিয়ায় কী যাচ্ছেতাই কাণ্ডটাই না ঘটিয়েছিল ন্যাটো। এর বাইরে আফগানিস্তানে ও ইরাকে এককভাবে হামলা চালিয়েছে আমেরিকা। কই তখন তো কিছু হয়নি? তাহলে এখন রাশিয়ার ইউক্রেনে হামলার বিষয়টিকে এত বড় করে দেখা হচ্ছে কেন? সত্যিই তো। এ প্রশ্নের জবাব ইউরোপের নেতাদের কাছে নেই। এ কারণে বার্লিনে এক অনুষ্ঠানে সাধারণ দেশবাসীর হাতে অপদস্থ হয়ে জার্মান চ্যান্সেলর ওলফ শুলজকে বলতে শোনা গেছে, ‘তোমাদের মোটা মাথায় যদি সামান্যতম ঘিলু থেকে থাকে, তাহলে বুঝতে কে আসল যুদ্ধবাজ (পুতিন)’?
আসলেই ঘিলু মনে হয় ইউরোপের শাসক থেকে শোষিত সবারই কমে গেছে। বিশেষ করে ইউক্রেন ইস্যুতে। সে কারণে এই ইস্যুতে পশ্চিমা বন্ধুদের সমালোচনায় সোচ্চার হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান। ন্যাটোর সদস্য হয়েও তিনি রাশিয়ার কাছে থেকে গ্যাস কেনা বন্ধ করেননি। এমনকি হাঙ্গেরি হয়ে ইউক্রেনে পশ্চিমা অস্ত্র পাঠানোরও অনুমতি দেননি তিনি। প্রতিবেশী অস্ট্রিয়া ‘ন্যাটোর সদস্য নয়’ কারণ দেখিয়ে ইউক্রেনে সাহায্য পাঠানোর ব্যাপারে তেমন কোনো উদারতা দেখায়নি। আর গ্রিস তো নিজ দেশের জাহাজে রাশিয়ার তেল পরিবহন করে লালে লাল হয়ে উঠেছে। ফলে কোন মুখে যুদ্ধ নিয়ে কথা বলবে তারা। তুরস্ক আর সার্বিয়া তো পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞা মানার চেয়ে তলে তলে রাশিয়াকে সহযোগিতা করে চলেছে। নিজ দেশের আইনের ওছিলা দিয়ে ইউক্রেনকে অস্ত্র দিতে অস্বীকার করেছে সুইজারল্যান্ড। ইউরোপজুড়ে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হওয়ার জোগাড়।
আর ইউরোপের দেশে দেশে যারা মসনদে আসীন আছেন, তাঁদের সবচেয়ে বড় ভয় নিজ দেশের উগ্র ডানপন্থী নেতাদের। এদের অনেকেই আবার পুতিনের সমর্থক। ফ্রান্সের কথাই ধরুন। প্রেসিডেন্ট ইমান্যুয়েল ম্যাঁখোর সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী মেরি লো পেন ক্রিমিয়া দখলের সময় রাশিয়ার গুণগান করেছিলেন। রাশিয়ার ব্যাংক থেকে তাঁর দলের ৯০ লাখ ইউরো ঋণ পাওয়া এর জন্য দায়ী কিনা বলা কঠিন। এখনো রুশবিরোধী কোনো শক্ত অবস্থান লো পেনের নেই। নমো নমো করে যা বলছেন তার মোদ্দা কথা হলো, রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তেমন একটা কাজ করছে না। এই তো ইইউর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য দেশের এক বড় রাজনীতিকের অবস্থা, যার কি-না ২০২৭ সালে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। প্রতিবেশী ও ইইউর সবচেয়ে স্বচ্ছল সদস্য জার্মানিতে এখনো ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন ভালোই আছে, কিন্তু জরিপ বলছে সেখানেও ভাটার টান শুরু হয়ে গেছে।
এ তো গেল ইউরোপের ঘরের কথা। যেখানে ঘর সামলানোই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে তারা পরকে সামলাবে কীভাবে? ডোনাল্ড ট্রাম্প যে গতিতে প্রচার শুরু করেছেন, তাতে আমেরিকার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে (২০২৪ সাল) রিপাবলিকান দলের পক্ষে প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন অনেকটাই নিশ্চিত তাঁর। ইতিমধ্যে ট্রাম্পের সাথীরা ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্টের জন্য কর্মপন্থা ঠিক করার কাজ করে চলেছেন। আগেরবার (২০১৬-২০) তিনি যা পারেননি, এবার তা করেই ছাড়বেন। তাঁর কাছে ইউক্রেন যুদ্ধে ঢালাওভাবে অর্থ সাহায্য করার চেয়ে মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর তোলা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আর ট্রাম্প ঘোষণাই দিয়েছেন যে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে আবার নির্বাচিত হলে তিনি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই যুদ্ধ (রাশিয়া-ইউক্রেন) বন্ধ করবেন? কিন্তু কীভাবে করবেন, তা খোলসা করেননি। ধরেই নেওয়া যায়, হোয়াইট হাউসে বসেই তাঁর প্রথম কাজটি হবে ইউক্রেনকে সব ধরনের সাহায্য দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া।
আর এখানেই সিঁদুরে মেঘ দেখতে পাচ্ছেন ইউরোপের নেতারা। কারণ, প্রথম দফায় ট্রাম্প যে নজির রেখে গেছেন তা তাঁরা ভুলবেন কী করে? এর চেয়ে বড় দুঃসংবাদ হতে পারে যদি ট্রাম্প ন্যাটো জোট থেকে আমেরিকাকে প্রত্যাহার করে নেন। এত দিন ন্যাটোর ছায়াতলে আমেরিকার ঘাড়ে ভর করে পশ্চিম ইউরোপ যে সুরক্ষা বলয়ের মধ্যে বাস করেছে, তার অবসান হবে। এর চেয়ে বিপর্যয় আর কিছু হতে পারে! এ কথা ভাবলে কোন নেতার না গায়ে জ্বর চলে আসবে বলুন। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া হয়, ট্রাম্প কোনোভাবেই প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। কারণ, আমেরিকার শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো এবং সর্বোপরি পেন্টাগন। সেটা যদি হয়ও, তারপরও রিপাবলিকান পার্টির হয়ে যারা প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হবেন (এমনকি ডেমোক্র্যাট দলেও) তাঁরা জেতার জন্য যে ট্রাম্পের দেখানো পথে হাঁটবেন না, এই নিশ্চয়তা কে দেবে? ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমান্যুয়েল ম্যাঁখো তো বলেই ফেলেছেন, মার্কিন প্রশাসন কি সব সময় এমনই থাকবে- কেউ তা বলতে পারে না। তাই ইউরোপীয়দের উদ্দেশ্যে তাঁর বক্তব্য, ‘আমাদের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার বিষয়টি আমরা মার্কিন ভোটারদের পছন্দ-অপছন্দের ওপর ছেড়ে দিতে পারি না।’ বোঝাই যাচ্ছে কতটা ঘাবড়ে গেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট।
ভয়ের আরও কারণ হলো, প্রেসিডেন্টের মতো ফরাসি কর্মকর্তারা বিশ্বাস করেন, ট্রান্স-আটল্যান্টিক সম্পর্কের ইতিমধ্যে অবসান হয়ে গেছে। কারণ, বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে আমেরিকার ফোকাস এখন ইউরোপ নয়, এশিয়া; আরও পরিষ্কার করে বললে চীন। আজ হোক বা কাল চীনেরই মুখোমুখি হতে হবে আমেরিকাকে। বাইডেন হয়তো তাড়াহুড়া করছেন না, কিন্তু ট্রাম্প তো ছাড় দেবেন না। আর তাইওয়ান নিয়ে চীন আরেকটু আগ্রাসী হয়ে উঠলে আমেরিকার ইউক্রেন-ভালোবাসা কতক্ষণ থাকবে, তা নিয়েও তাঁরা সন্দিহান। বলাই বাহুল্য যে, সে ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের তালিকায় রাশিয়াকে ছাড়িয়ে চীন অনেক ওপরে উঠে যাবে ওয়াশিংটনের কাছে।
ইউরোপের এই আশঙ্কার সাথে দ্বিমত করেন না অনেক মার্কিন বিশেষজ্ঞ। তবে ইউরোপের কোনো কোনো দেশ এ নিয়ে এতটা চিন্তিত না। তারা মনে করে, ট্রাম্প জমানা ফিরে এলে তাদের আবার কঠিন সময় পার করতে হবে ঠিকই, এর বেশি কিছু হবে না। এদের কারও কারও প্রার্থনা, ট্রাম্প ফিরে এলে যতটা ভয় করা হচ্ছে তত খারাপ যেন না হয়।
ইউক্রেনকে ঘিরে অন্তত বাহ্যিকভাবে হলেও ইউরোপ কিছুটা এক হয়েছে। ট্রাম্প ফিরে এলে তা টুকরো টুকরো হবে না, এ প্রতিশ্রুতি কে দেবে? হ্যাঁ, দিতে পারে একমাত্র চীন। তাই বেইজিংয়ের কাছে তারা মিনতি জানাতে পারে, তাইওয়ান নিয়ে এখনই কোনো উল্টোপাল্টা কিছু যেন না করে চীন।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন