আগামী এক বছরেরও কম সময়ে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। পরবর্তী পাঁচ বছর কারা ক্ষমতায় থাকবে, তা ঠিক করবে এই তিন দেশের ভোটাররা। এদের মধ্যে প্রথমে; অর্থাৎ, আগামী নভেম্বরে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের নির্বাচন হবে। এখন পর্যন্ত তেমনটাই বলা হচ্ছে। আর আগামী ডিসেম্বর বা জানুয়ারির শুরুতে আমাদের দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা। সব শেষ মে ২০২৪-এ ভারতে লোকসভা নির্বাচনের কথা রয়েছে। যদিও আগামী বছর আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হবে। ২০২৪-এর ৭ মে রাশিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং ওই বছরেরই শেষের দিকে (৫ নভেম্বর) ঠিক হবে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ভবিষ্যৎ।
আমরা আপাতত দুই পরাশক্তিকে নিয়ে বিশেষ মাথা না ঘামিয়ে এই উপমহাদেশের দিকে নজর দিই। কারণ, প্রথম তিনটি দেশ একই উত্তারধিকার হিসেবে ব্রিটিশ সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে নিজেদের রাজনৈতিক পদ্ধতি হিসেবে মেনে নিয়েছে। অর্থাৎ, এই ব্যবস্থায় জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচিত হবেন এবং তাঁরাই ঠিক করবেন পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। তবে একই উত্তরাধিকার নিয়ে চললেও বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তানের প্রেক্ষিত একেবারেই ভিন্ন। মিল শুধু একটি জায়গায়, নির্বাচনকে ঘিরে টানটান উত্তেজনা। উত্তেজনার ধরন অবশ্য প্রকৃতিগতভাবে আলাদা।
পাকিস্তানের কথাই ধরা যাক। পাকিস্তান বোধহয় বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে কোনো প্রধানমন্ত্রী পাঁচ বছরের মেয়াদ পুরো করতে পারেননি। দীর্ঘ দিন সামরিক শাসনে থাকা দেশটিতে কেন কেউ মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি, সে প্রশ্ন অবান্তর। মুখ্য হলো, রাওয়ালপিন্ডির সেনা কর্মকর্তারা কী চান। ২০১৮-তে নওয়াজ শরিফকে বিদায় দিয়ে তাঁদের মনে হয়েছিল পাঠান ইমরান খান হতে পারেন তাঁদের নিরাপদ সঙ্গী। কিন্তু ক্ষমতা পেয়ে খানসাহেব যে এভাবে বেঁকে বসবেন, তা তাঁরাও ভাবতে পারেননি! ফলে মেয়াদ শেষের আগেই ইমরানকে বিদায় দিয়ে ক্ষান্ত দেননি সেনা কর্মকর্তারা। তাঁকে জেলের ভাত (রুটিও হতে পারে) খাওয়ানোর সব আয়োজন পাকা বলা চলে। নভেম্বরের নির্বাচনে ইমরান বা তাঁর দল অংশ নিতে পারবে কিনা, তা নিয়েও সংশয় থেকেই গেছে।
আর দেশের অর্থনীতির কর্কট রোগ তো আছেই। আইএমএফ, চীন, সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাহায্যে কত কাল টিকে থাকা যাবে- এ এক লাখ টাকার প্রশ্ন। ডলারের দাম বাড়ায় গত দেড় বছরেরও কম সময়ে নগদ অর্থের মালিকদের সম্পদের পরিমাণ অর্ধেক হয়ে গেছে। ফলে নভেম্বরের নির্বাচনে যারাই ক্ষমতায় আসবে, তাদের জন্য বিশেষ কোনো সুখবর থাকছে না, তখতে বসা ছাড়া।
দলীয় না নিরপেক্ষ সরকার- এই বিতর্ক চলার মধ্যেই উঠে এসেছে নানা প্রস্তাব। এই ধরনের সংকট কাটাতে কেউ প্রস্তাব দিচ্ছেন দ্বিস্তরবিশিষ্ট জাতীয় সংসদ, যার উচ্চকক্ষ সব সময় সচল থাকবে। বিশ্বের সর্বত্র যেমন হয়। বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তান ব্রিটিশ শাসনের উত্তারাধিকার হওয়ার কারণে এখানে ওয়েস্টমিনিস্টার ধাঁচের সরকার ও নির্বাচনী কাঠামো বর্তমান। এই কাঠামোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো বহুদলীয় নির্বাচনে এখানে কোনো প্রার্থী ৫০ ভাগের অনেক কম ভোট পেয়েও জিতে যেতে পারেন। কোনো দল মাত্র ৩০-৪০ ভাগ ভোট পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ক্ষমতায় বসতে পারে। আর জেতার পরে বিরোধীদের কোনো পাত্তা না দিয়েও বহাল তবিয়তে পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকতে পারে। এরই বিকল্প হিসেব কেউ কেউ আনুপাতিক ভোটের হারে আসন সংখ্যা নির্ধারণের প্রস্তাব দিচ্ছেন। বিশ্বে জনগণের ভোটের মাধ্যমে সরকার গঠিত হয় যেসব দেশে, তার ৬৫ ভাগ দেশেই এই আনুপাতিক ভোট ব্যবস্থা চালু আছে। এতে করে আইনসভায় একেবারে ছোট দলগুলোরও প্রতিনিধি থাকার সুযোগ তৈরি হয়। এই ব্যবস্থায় আইনসভার পাশাপাশি গণতন্ত্রই আরও শক্তিশালী হয়। কেউ কেউ আবার বলছেন, পুরোটা আনুপাতিক ভোটের হারে না করতে পারলে অন্তত অর্ধেক করা যেতে পারে, যেমনটা প্রতিবেশি নেপাল করেছে।
সব মিলিয়ে রাজপথের উত্তেজনার পাশাপাশি সরকার ব্যবস্থা নিয়ে এই তাত্ত্বিক আলোচনাও অনেক বড় প্রাপ্তি। মনে রাখা ভালো, তাত্ত্বিক আলোচনার ওপরেই গড়ে ওঠে ব্যবহারিক কাঠামোর সৌধ। ফলে আজ যত উত্তেজনাই রাজধানীর রাজপথে থাকুক না কেন, তা নিয়ে বিচলিত বা উৎকণ্ঠিত হওয়ার কারণ দেখি না। বরং রাজনীতিহীনতাকে দূর করতে এ ধরনের অহিংস উত্তেজনাকে স্বাগত জানানোই যায়।
এই উপমহাদেশে এখনো পর্যন্ত ভারতেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা স্থায়ী রূপ পেয়েছে। সে কারণে দেশটি তার প্রতিবেশীদের কাছেও অনুসরণীয় ছিল। কিন্তু গত এক দশকে যে পরিবর্তন এসেছে, তাতে সেখানকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিয়ে সবাই চিন্তিত। এর উল্টো পাশে আছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একক জনপ্রিয়তা। এই দৌড়ে তিনি অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। ফলে মোদির কাঁধে ভর করে বিজেপি যদি আবারও ভারতে ক্ষমতায় আসে, তাহলে নিজেদের ব্যর্থতার কথাই ভাবতে হবে কংগ্রেসসহ সব বিরোধী দলকে।
লোকসভার গত দুটো নির্বাচনে হারের পর বিরোধীরা কোনো শিক্ষা নেয়নি এমন নয়। বিরোধীদের মধ্যে এবার কংগ্রেস অনেক নমনীয়। কংগ্রেসের উদ্যোগে নতুন জোট ইন্ডিয়া (ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টাল ইনক্লুসিভ অ্যালায়েন্স) আত্মপ্রকাশ করেছে। কংগ্রেস জানিয়ে দিয়েছে, ওই দল থেকে প্রধানমন্ত্রী হতে হবে এ রকম কোনো পূর্বশর্ত তাদের নেই। ফলে ২৬টি দলের এই জোটে অন্যরা এবার অনেক বেশি খোলা মনে আছে। তবে বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে হটাতে কংগ্রেসের যে কোনো বিকল্প নেই, এটাও অন্য শরিকেরা ভালোমতোই বুঝেছে। মনিপুরের ঘটনায় সম্প্রতি ইন্ডিয়া জোটের দলগুলো এক হয়ে যেভাবে লোকসভা ও রাজ্যসভার অধিবেশন পণ্ড করে দিয়েছে, তাতে মোদির কিছুটা হলেও ভয় পাওয়ার অবকাশ আছে। এই একই বিষয়ে লোকসভায় অনাস্থা প্রস্তাব এনেছে বিরোধী পক্ষ। এই প্রস্তাবে পরাজয় নিশ্চিত জেনেও তারা এটা করেছে এই ভেবে যে, মনিপুর নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সংসদে দাঁড়িয়ে কিছু অন্তত বলুন, যা ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি মনিপুরেও বিজেপি ক্ষমতায়। ফলে এই রাজ্যের জাতিগত সহিংসতা এখন দলটির গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মোদিকে দূরে রেখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর নেতৃত্বে সমস্যা থেকে পরিত্রাণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তারা।
আসলে বিজেপি ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনকে আগের দুবারের মতো মোদি বনাম রাহুল- এই লড়াইয়ে নিয়ে যেতে চাইছে। আর এই ফাঁদে পা না দেওয়ার জন্য মল্লিকার্জুন খাড়গের মতো দলিত নেতাকে সভাপতি পদে বসিয়েছেন সোনিয়া গান্ধী ও তাঁর সন্তানেরা। ১৯৮৪ সালের পর; অর্থাৎ, গত প্রায় ৩৯ বছর বছরে গান্ধী পরিবারের কেউ প্রধানমন্ত্রী না হওয়া সত্ত্বেও ওই পরিবারের বশংবদ শাসনের অভিযোগ ক্রমাগত করে চলেছে বিজেপি। একে ভোঁতা করে দিতেই রাহুল প্রথমে দলের সভাপতি পদ ছেড়েছেন, এখন দলের কারও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বাসনা না থাকার কথা জানিয়েছেন। এতে করে লড়াইয়ের অভিমুখ মোদি-রাহুল থেকে ঘুরিয়ে মোদি-খাড়গের দিকে নিতে পেরেছে কংগ্রেস। ফলে লাভ হলো, রাহুলকে যেভাবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিজেপি আক্রমণ করতে পারত, খাড়গের বেলায় তা কঠিন। কারণ, দলিত কোনো নেতাকে আক্রমণের ঝুঁকি নির্বাচনের আগে বিজেপি নিতে পারবে না। দেশের বিভিন্ন স্থানে দলিত সম্প্রদায়ের লোকজনের ওপর নির্যাতনের অভিযোগে ইতিমধ্যে বিজেপি বেশ বেকায়দায় আছে।
ভারতের বিগত দুটি লোকসভা নির্বাচনে প্রমাণ হয়েছে, সে দেশের ভোটাররা কেন্দ্র ও রাজ্য নির্বাচনে আলাদা বিবেচনা নিয়ে ভোট দেয়। এটা বিজেপির জন্য যতটা সুবিধার, তাদের বিরোধীদের জন্য ততটাই উদ্বেগের। ইন্ডিয়া জোট এই বাধা কতটা কটিয়ে উঠতে পারবে তার ওপর নির্ভর করছে তাদের সাফল্য, বিশেষ করে হিন্দিভাষী রাজ্যগুলোতে। আর যদি তা না পারে, তাহলে আবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে নরেন্দ্র মোদি তাঁর কংগ্রেসি পূর্বসুরী জওহরলাল নেহেরুর টানা ক্ষমতায় থাকার রেকর্ড ভেঙে দেবেন। মোদির হাতে তৈরি হওয়া নতুন ভারতের আখ্যান নীরবে মেনে নিতে হবে কংগ্রেস ও তার সাথীদের।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন