শিক্ষাজীবন পেরিয়ে বা কারও কারও ক্ষেত্রে ঠিকঠাক পার হওয়ার আগেই জীবনের প্রয়োজনে কর্মক্ষেত্রে ঢুকতে হয়। রুটি-রুজি বলে তো একটা ব্যাপার আছে। মানুষকে বেঁচে থাকতে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাকার প্রয়োজন মেটাতে হয়। শুধু নিজের নয়, পরিবারের প্রয়োজনও মেটাতে হয়। ফলে তাঁকে উপার্জন করতে হয়। আর যেহেতু কেউ কাউকে এমনি এমনি পয়সা দেয় না, সেহেতু কাজ করেই তা জোগাতে হয়। তাই কর্মক্ষেত্র নিঃসন্দেহে একজন কর্মজীবীর কাছে অনেক বড় একটি বিষয়। কিন্তু কতটা বড়? এই কর্মক্ষেত্র কি চাইলে কর্মীর ব্যক্তিগত জীবনে নাক গলাতে পারে? নিশ্চিতভাবেই উত্তরটি -না। কিন্তু টাঙ্গাইলের একটি উচ্চবিদ্যালয়ে এমন অনভিপ্রেত নাক গলানোর ঘটনাই ঘটেছে।
জন্ম, মৃত্যু, আর বিয়ে- এই তিনটি বিষয়কে কেউ কেউ দৈব নির্ধারিত বলে ধরে নিতে পছন্দ করেন। কিন্তু এখন জন্মের বিষয়টি একেবারে অঙ্ক কষার মতো বিষয় হয়ে উঠেছে। দম্পতিরা নিজেদের সময়-সুযোগ বুঝে সন্তান নেন। মৃত্যুর বাস্তবতা মানুষ এখনো ঠেকাতে না পারলেও আয়ুষ্কালের প্রলম্বন ঘটাতে পারছে অনেকটাই, শুধু প্রয়োজন পয়সার। আর বিয়ে? এ যে কোনোভাবেই দৈব ঘটনা নয়, তা তো বন্ধন ও বিচ্ছেদের সমীকরণ অনায়াসে বলে দিচ্ছে।
এই তিনের মধ্যে বিশেষ বিয়ে বিষয়টি যে একান্তই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, তা এক রকম মীমাংসিত। বহু বছর হয়ে গেল ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদের ধ্বজা উড়ছে। ব্যক্তির জীবনের কোন কোন ক্ষেত্রে অন্য লোক প্রবেশ করতে পারবে, আর কোন পর্যন্ত পারবে না, সেই সীমানা অনেক আগেই নির্ধারিত হয়ে আছে। দেশের আইনেও এই সীমা লঙ্ঘনের বিষয়ে কড়াকড়ি আছে।
কিন্তু দেশটার কী যেন একটা হয়েছে। কেউ কোনো সীমানা মানছে না। বিশেষত ব্যক্তিগত বিষয়াদিতে। টাঙ্গাইলের সাজানপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের দাপ্তরিক প্যাডে লেখা একটি চিঠি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ হইচই হচ্ছে। অনেকেই শেয়ার করছেন চিঠিটি। সেসব পোস্টে হাসির ইমোই বেশি দেখা যাচ্ছে। হাসতে হাসতে আমরা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এড়িয়ে যেতে চাইছি যেন। আর তা হলো-কর্মক্ষেত্র বা ঊর্ধ্বতনের নাক আসলে ব্যক্তিজীবনের কতটুকু এলাকায় গলানো যেতে পারে। আদৌ তাঁরা নাক গলানোর অধিকার রাখেন কিনা।
আসুন চিঠিটির দিকে আগে মনোযোগ দিই। গত ২৬ জুলাই লেখা চিঠিটিতে এক সহকারী শিক্ষককে ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে বিয়ের আদেশ দেওয়া হয়েছে। অনেকটা অভিযোগের সুরে লেখা সেই চিঠিতে লেখা হয়েছে, ওই সহকারী শিক্ষক ২০১৬ সালে স্কুলে যোগ দেন। যোগ দেওয়ার পর স্কুল কর্তৃপক্ষ জানতে পারে যে, তিনি বিবাহিত নন। তাঁকে একাধিকবার মৌখিকভাবে বিয়ে করার অনুরোধও করা হয়। সেই অনুরোধ তিনি রাখেননি। অতঃপর বাধ্য হয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ কঠোর হতে বাধ্য হয়েছে মর্মে আগামী ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে বিয়ে করার জন্য সেই সহকারী শিক্ষককে আদেশ দিয়েছে।
এই আদেশ বা লিখিত বক্তব্য অনুযায়ী ‘বিশেষভাবে অনুরোধের’ পেছনে প্রচ্ছন্ন কারণ হিসেবে বিদ্যালয়ে সহশিক্ষা কার্যক্রম চলা এবং ওই সহকারী শিক্ষকের বিয়ে নিয়ে অভিভাবকদের নানা প্রশ্নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এবং শেষে ‘বিষয়টি অতীব জরুরি’ কথাটাও বেশ জোরের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিয়ে না করলে ওই সহকারী শিক্ষককে কী করা হবে বা পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে সে বিষয়ে চিঠিতে কিছু উল্লেখ নেই। তবে বেশ গা ছমছমে একটা ব্যাপার আছে। ভঙ্গিটি এমন যে, ‘না করেই দেখ না বাপু, কত ধানে কত চাল’। এই দেখে নেওয়ার প্রচ্ছন্ন বা প্রকট ভাব যেন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর নিত্য চর্চা হয়ে উঠেছে।
চিঠিটি পড়ে প্রথমেই সকৌতুকে যে কথাটি মাথায় আসে, তা হলো- যার বিয়ে তার খোঁজ নাই, পাড়াপড়শির ঘুম নাই। চলতি এই বাক্যবন্ধের এমন দালিলিক প্রমাণ সত্যিই এই বঙ্গ মুলুক ছাড়া আর কোথাও পাওয়া হয়ত সম্ভব হবে না।
কিন্তু আপনি যদি একটু সচেতন হন, তাহলেই এই কৌতুক ভাবনা বেশিক্ষণ স্থায়ী হবে না মগজে। বরং একটা ভীষণ অস্বস্তি আপনাকে ঘিরে ধরবে। আপনার ভেতরে তখন প্রশ্ন জাগতে বাধ্য-কর্মক্ষেত্র কি আসলে দুটি পয়সার বিনিময়ে আমাদের পায়ে বেড়ি পরাতে তৎপর? নইলে একজন সহকারী শিক্ষকের বিয়ের মতো ব্যক্তিগত একটা সিদ্ধান্তের সাথে স্কুলের সহশিক্ষা কার্যক্রমের কী সম্পর্ক থাকতে পারে? সেখানকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে কি সংশ্লিষ্ট শিক্ষক নিয়ে কোনো অস্বস্তি আছে? ওই শিক্ষকের আচরণগত কোনো সমস্যা কি আছে? এ দুটি বিষয়ের উত্তরই যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে দুটি বিষয়েরই মীমাংসা বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলার জন্য এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জন্য ক্ষতিকর। আর তেমন কিছু হলে বিয়ের নোটিশ নয়; বরং নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণই একমাত্র করণীয়। আর তেমনটি যদি না হয়, তাহলে শুরুতে উল্লিখিত প্রশ্নের কাছেই ফিরতে হয়।
চিঠির ভাষ্যমতে, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বা চিঠিতে সই করা ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিটি ওই সহকারী শিক্ষককে বারবার বিয়ে করার কথা বলেছেন। ধারণা করা অবান্তর হবে না যে, সেখানে ওই সহকারী শিক্ষককে গত কয়েক বছর ধরে নিদারুণ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। সম থেকে ঊর্ধ্ব প্রায় সব সহকর্মী এমনকি অভিভাবকেরাও হয়ত তাঁকে উপযুক্ত পাত্র বা পাত্রীর সন্ধান দিতে জীবন বাজি পর্যন্ত রেখেছিলেন। কেউ হয়ত ছবি দেখিয়েছেন, কেউ হয়ত এক কাঠি এগিয়ে পাত্র বা পাত্রীর সাথে অনানুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ পর্যন্ত করিয়েছেন। এমনটাই হয় সাধারণত, যা ভয়াবহ মানসিক যন্ত্রণা বা আরও ভালোভাবে বললে মানসিক নির্যাতনের শামিল।
এই ভীষণ যন্ত্রণার মধ্যেও ওই সহকারী শিক্ষক যে এখনো টিকে আছেন এবং পড়াচ্ছেন, তাতে তিনি সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। রীতিমতো ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা বলা যায় তাঁকে। দুঃখের বিষয় হলো-এমন ধৈর্যধারী ব্যক্তি এই সমাজে খুঁজলেই পাওয়া যাবে। কারণ, সমাজের বড় একটি অংশই আসলে ব্যক্তিগত সম্পর্কের অজুহাতে ব্যক্তিজীবনে প্রবেশের টিকিট চেয়ে বসতে সিদ্ধহস্ত। কখনো হাসতে হাসতে, কখনো খোঁচা দিয়ে, কখনো টিপ্পনী কেটে ব্যক্তির বিয়ে, সন্তান নেওয়া-না নেওয়া, সন্তানের মেধা, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত আরও নানা নিষিদ্ধ গণ্ডিতে প্রবেশ করতে চায় অনেকে।
মুশকিল হচ্ছে এই আচরণগুলোকে এই দেশে এখনো সেভাবে মানসিক নির্যাতন হিসেবে শনাক্ত করা হয়নি। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে কথা বললেও এ বিষয়গুলো এখনো জনপরিসরে সেভাবে গৃহীত হয়নি। হয়নি যে, তারই বড় প্রমাণ ওই চিঠি। এই চিঠি একইসাথে আমাদের মানসিক অপরিপক্বতা, দেশের বিদ্যায়তনের সংস্কৃতি, শিক্ষাকাঠামো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান বা নিয়ন্ত্রকদের মানসিক জড়ত্ব, অভিভাবককুল, প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক ভব্যতা ইত্যাদিকে একেবারে উন্মোচিত করে দেয়। এই চিঠি বলে দেয় সাজে-পোশাকে, কথায় বা ঠমকে যতই অগ্রগমণের কথা বলা হোক না কেন, যতই পশ্চিমা সাজ-পোশাক আয়ত্ত করা হোক না কেন, যতই কথায় কথায় ইংরেজি-বাংলার মিশেল দেওয়া হোক না কেন, যতই স্মার্টফোন গুঁতিয়ে সেলফি, রিল ইত্যাকার বিষয়াদির পয়দা হোক না কেন, আমরা এখনো অন্তঃকরণে একেবারে আনস্মার্টই রয়ে গেছি। যা দেখাই, তা আদতে ভেক। এ কারণেই অনায়াসে আমরা অন্যের জীবনে অনভিপ্রেত অনুপ্রবেশে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করি না।
এই অনুপ্রবেশ ততক্ষণ পর্যন্ত তবু সহনীয়, যতক্ষণ পর্যন্ত এটি ব্যক্তি পর্যায়ে থাকছে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক নোটিশ দিয়ে সময় বেঁধে দেওয়া একে তো আর ব্যক্তিপর্যায়ের বাজে চর্চায় সীমাবদ্ধ থাকতে দিচ্ছে না। একে রীতিমতো প্রশাসনিক করে তুলছে।
এই প্রশাসনিকতাই মনে হয় আমাদের সামষ্টিক আনস্মার্টনেসের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে উঠছে দিনদিন। যেকোনো কিছুকেই গদি বা চেয়ারের সাথে মিলিয়ে দেখার একটা প্রবণতা চালু হয়েছে ইদানীং। যেন একটি চেয়ারে কোনোমতে শরীরটি স্থাপন করতে পারলেই, আশপাশের সবার সবকিছুতে গলানোর মতো একটি নাকের মালিকানা পেয়ে যাচ্ছে সবাই। কি দেশ, কি জেলা বা উপজেলা বা বিদ্যালয়-সবখানেই এই গদির জোর বেশ প্রকট হয়ে উঠছে দিনদিন। কেউ আর সীমাটি যেন দেখতেই পারছে না। এটা কি তবে এ দেশের নয়া রোগ হতে চলেছে?
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন