হঠাৎ করেই অনলাইন গণমাধ্যম ও সামজিক মাধ্যমে শুক্রবার; অর্থাৎ ২৯ রোজার দিন চাঁদ দেখা যাবে বলে একটি খবর ছড়িয়ে পড়ে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সূত্র উল্লেখ করেই খবরটা পরিবেশন করা হয়। আগে কখনো এমনটা না হওয়ার কারণে সবাই কম-বেশি অবাক হয়েছিলেন। প্রতিক্রিয়াও ছিল মিশ্র। শনিবার ঈদ হলে এক দিন ছুটি কমবে, এতে চাকরিজীবী অনেকের মন খারাপ হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ তাঁরা হয়তো সেভাবে চিন্তা করে ট্রেন-বাস-লঞ্চ-বিমানের টিকিট আগাম কেটে রেখেছেন। ব্যবসায়ীরাও ঈদের আগে ব্যবসার জন্য একটি দিন কম পাচ্ছেন ভেবে একটু দুঃখিত হতেই পারেন।
ঈদের আনন্দের মধ্যে এতটুকু মন খারাপ এতক্ষণে সহে গেছে সবার। কিন্তু একটা বিষয় তো মানবেন, বিজ্ঞানের অগ্রগতির কারণে বহুদিন আগে থেকেই আকাশে চাঁদের অবস্থান সঠিকভাবে বলা সম্ভব। চন্দ্রগ্রহণ বা সূর্যগ্রহণের দিনক্ষণ অনেক আগেই আমরা জানতে পারি। আর সব সময় এই গ্রহণ আমাদের দেশ বা আমি যে এলাকায় থাকি সেখান থেকে দেখা যাবে এমন কোনো কথা নেই। ফলে কেউ যদি অঙ্ক কষে চাঁদের অবস্থান আগে জানিয়ে দিয়ে থাকেন, তাতে দোষ খুঁজতে যাওয়া অমূলক, অকারণ।
বরং আসুন, এই ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে তীব্র গরম উপেক্ষা করে যারা ঢাকা ছেড়েছেন বা বাড়ি গেছেন তাঁদের যাত্রা কতটা নিরাপদ ছিল, সেটা দেখি। ঈদের আগে ছাপা পত্রিকা প্রকাশের শেষ দিন আজ শুক্রবার। একটু প্রবীণ পাঠকমাত্রই জানেন, ট্রেনের ছাদের গাদাগাদি করা ভিড়, লঞ্চে তিল ধরানোর ঠাঁই না থাকা বা ঘণ্টার ঘণ্টা বাসের জন্য আপেক্ষা করে মূহ্যমান যাত্রীদের ছবি এ দিনের পত্রিকার প্রথম পাতায় বিরাট করে ছাপা হতো। টেলিভিশনের পর্দায়ও দর্শকেরা তা ভালোভাবেই টের পেতেন। অনেকেই এই ভেবে আত্মপ্রসাদ লাভ করতেন, ‘এবার তাঁর বাড়ি না যাওয়ার সিদ্ধান্ত কতটা দূরদর্শী’ ছিল। আর বেশির ভাগ যাত্রীর হাতে ইন্টারনেট সমৃদ্ধ মোবাইল থাকার কারণে অনেক কষ্ট বা দুর্ঘটনার ছবি/ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।
কিন্তু এবারের দৃশ্যপটটা যেন একটু ভিন্ন। সেই ভিড়, সেই ঠেলাঠেলি, গাদাগাদি নেই। আমি নিজে আজকের ১৫টির বেশি দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাতা উল্টালাম। এর মধ্যে মাত্র দুটো পত্রিকায় লঞ্চের ছবি ছাপা হয়েছে। ট্রেন-বাস একেবারে উধাও। ছাপা হয়েছে ঘন সারিবদ্ধ মোটরসাইকেলের অপেক্ষমাণ অবস্থায় থাকার দৃশ্য। অর্থাৎ, ব্যক্তিগত দু চাকার পরিবহনের ওপর নির্ভর করে অনেকেই বাড়ি গেছেন। সবাই রোদ তেতে ওঠার আগে গন্তব্যে পৌঁছানোর তাগিদে হয়তো সকাল-সকাল বেরিয়ে পড়েছিলেন। হয়তো সে কারণে তাঁদের এই সম্মিলন দেখার অবকাশ ঘটেছে আমাদের। পদ্মা সেতুতে বা হাইওয়েতে মোটরসাইকেল চালানোর অনুমতি দেওয়ায় সরকারকে সাধুবাদ। কারণ বাস-ট্রেন-লঞ্চের টিকিট স্বল্পতার কারণে মোটরসাইকেল ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না। আর খরচও একটা বড় ব্যাপার। ঈদকে সামনে রেখে যেভাবে টিকিটের দাম বাড়ানো হয়, তাতে একবারের ভাড়ায় অনেকেরই যাতায়াত হয়ে যাবে। যারা ঈদের সময় মোটরসাইকেলে ঢাকা ছেড়ে বাড়িতে যাবেন বলে ঠিক করেছেন, তাঁরা নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল। যেকোনো মূল্যে তাঁরা ঢাকা ছাড়তেন। বরং বাইকে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে বাস-ট্রেন-লঞ্চের টিকিটের ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হয়েছে।
বিপুলসংখ্যক মানুষের এবারের ঈদযাত্রা এখন পর্যন্ত নির্বিঘ্ন হয়েছে বলতে হবে। ছবি: আবির আহমেদ
আগে ঈদ এলেই চন্দ্রার মোড়, ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, মাওয়া-পাটুরিয়া ফেরিঘাট, টাঙ্গাইল থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক- এসবই ছিল যাত্রীদের কাছে আতঙ্কের নাম। সেই আতঙ্ক কিন্তু দিনে দিনে কমে এসেছে। এবার নেই বললে চলে। ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তফা জব্বার গত বৃহস্পতিবার (২০ এপ্রিল, ২০২৩) তাঁর ফেসবুক পেজে জানিয়েছেন, ২৯ লাখ মোবাইল ফোন সিম ব্যবহারকারী ঢাকা ছেড়েছেন। গত কয়েক বছর ধরে তিনি এই তথ্য নিয়মিত দিচ্ছেন। গত বছর ঈদুল ফিতরের আগের চার দিনে ৭৩ লাখ সিম ব্যবহারকারী ঢাকা ছেড়েছিলেন বলে তিনি জানিয়েছিলেন। অনেকে একাধিক সিম ব্যবহার করলেও এই সংখ্যা থেকে ঢাকা ছেড়ে যাওয়া মানুষের একটা হিসাব আন্দাজ করা যায়।
ফলে ঈদ বা উৎসব উপলক্ষে ঢাকা ছেড়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা যে বিপুল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাঁদের এবারের ঈদযাত্রা যে এখন পর্যন্ত নির্বিঘ্ন হয়েছে, তার জন্য সরকারের প্রশাসনিক ব্যবস্থা যেমন কাজ করেছে তেমনি মানুষের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। অনেকেই তেমন জরুরি কিছু না থাকলে একটু আগেই পরিবারের অন্য সদস্যদের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন। ফলে সকলে একত্রে হইহই করতে করতে বাড়ি ফিরতে হবে- এই ভাবনা থেকে সরে আসার কারণে যাতায়াতটা সহজ হয়েছে।
একটু ভেবে দেখুন, এর আগে ঈদ এলেই বেতন-বোনাস-ওভারটাইমের দাবিতে পোশাক শ্রমিকেরা রাস্তায় নামতেন। সড়ক অবরুদ্ধ হতো। ভোগান্তি পোহাতেন লাখ লাখ যাত্রী। কিন্তু পোশাক শ্রমিকদের দাবির ন্যায্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। সবাই সবকিছু পাবেন, আর তাঁরাই শুধু বঞ্চিত হয়ে নিরানন্দে পরিবার নিয়ে ঈদ করবেন, এটা তো হতে পারে না। তাঁরা বাড়তি কিছু না, তাঁদের হক দাবি করতেন। এবং এটাও যেন অলিখিত নিয়ম হয়ে দাড়িয়েছিল যে, পোশাক শ্রমিক ভাইবোনেরা মহাসড়ক অবরোধ না করলে কারও টনক নড়বে না। অথচ আমরা ঠান্ডা ঘরে বসে ৩৬ ইঞ্চির বুকের ছাতিকে ৪০ ইঞ্চি করে বড় গলায় বলি, আমাদের সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আসে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে। আর যারা এর কারিগর তাঁদের অবস্থাটা দেখুন।
এবার বিজিএমইএসহ সব পক্ষকে ধন্যবাদ। দীর্ঘদিন পরে আমাদের এই ভাই-বোনদের হকের দাবিতে রাস্তায় নামতে হয়নি। যে দুই-এক জায়গায় হয়েছে তাকে ব্যতিক্রমই বলা যায়। এবং সমাধানে মালিক-পুলিশ-প্রশাসন সবার একটা উদ্যোগ ছিল। অথচ এবার পশ্চিমা দুনিয়ায়, যেখানে আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয় সেখানে মন্দা, মহামন্দা আসার কত কথাই না শুনেছি। কারও কারও ক্রয়াদেশ বাতিলও হয়েছে। এই রকম একটা সামগ্রিক ব্যবস্থার মধ্যে কীভাবে প্রতি বছরকার ‘ঈদ সমস্যার’ সমাধান হয়েছে, তা আমি জানি না। তবে পিচ-গলা রোদে তাঁদের যে পথে নামতে হয়নি, এ জন্য ধরেই নিতে পারি এবার তাঁরা ফি-বছরের সমস্যায় হয়তো পড়েননি বা পড়লেও মাত্রাটা আগের তুলনায় অনেক কম।
ঈদের সময় যারা ঢাকায় থাকেন ‘ঢাকা ছেড়ে যাওয়া’ লোকজনকে নিয়ে তাঁদের নানা প্রশ্ন। মানে ভাবখানা এমন, সারা বছর ঢাকায় খাস-থাকিস-পরিস আর ঈদ আসলেই গ্রামে ছুটতে হবে? কই পাশে কলকাতা শহরে তো এমনটা হয় না। বরং দুর্গাপূজার সময় সন্ধ্যা হলে দলে দলে লোক কলকাতা আসে। যারা পুজোর সময় কলকাতায় থেকেছেন তাঁরা জানেন, এই সময় সন্ধ্যার কলকাতার জনসমুদ্র কী ভয়াবহ! ফলে আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারি না, উৎসবের দিনে ঢাকা ছাড়তে চাওয়া আসলে কতটা অপরাধ?
যারা অপরাধের এই যুক্তিতে আস্থা রাখেন তাঁরা কী বলতে পারবেন, ঢাকায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম কাটিয়েছেন এমন লোকের সংখ্যা আসলে কত? যদি বৃহত্তর ঢাকার জনসংখ্যা দুই কোটির বেশি ধরে নিই, তাহলে দেখব এদের অধিকাংশ ঢাকার বাইরে থেকে আসা এবং প্রথম প্রজন্ম। রাজধানী ঢাকা তাঁদের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করলেও শিকড় গাড়তে দেয়নি। তাঁরা কেউ পরস্পরের আপন হতে পারেনি। ফলে উৎসব হোক বা অন্তিম শয্যা, এ সময় সবার আগে মনে পড়ে সেই ফেলে আসা ‘বাড়ি’র কথা। এতে দোষ খুঁজতে যাওয়াটাই বোকামি। দেখুন নিউইয়র্ক, লন্ডন বা অন্য কোনো শহর থেকে কোনো প্রবাসী যখন দেশে ঈদ পালনের জন্য আসেন, তখন আমরা উৎফুল্ল হই। অথচ ঈদের সময়টুকুর জন্য কেউ ঢাকা ছাড়তে চাইলে আমরা বাঁকা চোখে তাকাই। এই বৈপরিত্যের মধ্যে ঘরে বসে ভরপেট খেয়ে দুপুরে সুখনিদ্রা দিয়ে আমরা ঈদ কাটিয়ে দিই।
আমার এক সাংবাদিক বন্ধু তাঁর ঢাকায় ঈদ পালনের করুণ অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন। বললেন, যেকোনো কারণে একবার বাড়ি যেতে পারেননি। স্বাভাবিকভাবে ঢাকায় এক মসজিদে ঈদের জামাতে শরিক হন। তাঁর ভাষায়, ‘নামাজ শেষ হওয়ার পর দেখি কোলাকুলি করার মতো একজনও নেই’। সেদিন থেকে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ঈদে কোনোভাবেই ঢাকায় থাকবেন না। তাঁর মতো এ অভিজ্ঞতা হয়তো অনেকেরই আছে। আমার তো প্রতিবারই হয়। নামাজ শেষে অপেক্ষায় থাকি কখন ভিড়টা পাতলা হবে, আস্তে করে চোরের মতো পালিয়ে এসে নিজের ঘরে ঢুকি।
বর্তমান ফ্ল্যাট সিস্টেমের এই ঢাকা শহরে আমরা পাশের ফ্ল্যাটের নিকটতম প্রতিবেশিকেই চিনি না। আসা-যাওয়ার পথে হয়তো সালাম বা মুচকি হাসি বিনিময়ের মধ্যে সীমিত যাবতীয় আলাপ-পরিচয়। কখনো ভেতরে ঢুকে তাঁকে বা তাঁর পরিবারকে জানার-বোঝার চেষ্টা করিনি। নিজেকে নিয়ে থাকতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। এই আমরা নিজেরাই নিজেদের জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে আমাদের চারপাশে যে ব্যুহ তৈরি করে ফেলেছি, সেখান থেকে বেরোনোর কোনো ইচ্ছেও আমাদের আছে বলে মনে হয় না। ফলে আমরা বা আমাদের পরের প্রজন্ম খুব আনন্দের সাথে ঈদ বা অন্য উৎসব পালন করে, এটা জোর দিয়ে বলা কঠিন। আর আমাদের মধ্যে দেখানোপনা যত বাড়ছে, ততটাই কমছে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে উৎসরিত আনন্দধারা।
সে জন্য বছরজুড়ে কাজ আর চাপের মধ্যে থাকা কেউ যদি উৎসবের দিনে ঢাকা ছেড়ে বাড়ি গিয়ে সবার সাথে মিলেমিশে আনন্দ পেতে চায়, পাক না। আমাদের সবার কাজটা হোক, তাঁদের যাতায়াতকে নির্বিঘ্ন, নিরুপদ্রব ও আনন্দদায়ক করা।
সবাই ভালো থাকুন। ঈদ মোবারক।
সেলিম খান: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশন