দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবির জন্য জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুকে দায়ী করেছে দলটির একাংশ। রোববার রাজধানীতে এক মতবিনিময় সভায় এ দাবি জানানো হয়।
দলটির একাংশের নেতাদের দাবি, কিছু মানুষের কু-পরামর্শে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে জাতীয় পার্টির ক্ষতি করেছেন চেয়ারম্যান জিএম কাদের। নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের সাথে চেয়ারম্যানের বৈঠকের আহ্বানও জানান তারা।
৭ জানুয়ারির নির্বাচনে ২৬০টিরও বেশি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল জাতীয় পার্টি। নির্বাচনের ঠিক আগ মুহুর্তে ২৬টি আসনে তাদের ছাড় দেয় আওয়ামী লীগ। কিন্তু তারপরেও এই আসনগুলোতে জয়ী হতে পারেনি জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা। নির্বাচনে জাতীয় পার্টি পায় ১১টি আসন। আওয়ামী লীগের ছাড় দেওয়া আসনের বাহিরে কোথাও জয় পায়নি দলটি।
জাতীয় নির্বাচনে এই ভরাডুবির দায় নিয়ে গত শুক্রবার দলটির চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুর পদত্যাগ দাবি করেছেন নেতা-কর্মীরা। ওইদিন পরাজিত কয়েকজন প্রার্থীর নেতৃত্বে নেতা-কর্মী বিক্ষোভ করেন এবং শীর্ষ দুই নেতাকে ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেন।
রোববার রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে পরাজিত জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের নিয়ে মতবিনিময় সভা করেন কয়েকজন কো-চেয়ারম্যান ও প্রেসিডিয়াম মেম্বার। এসময় নির্বাচনে অংশ নেয়ায় চেয়ারম্যানের সমালোচনা করেন তারা।
দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘৬০ জন, ৭০ জন প্রার্থীকে পানিতে ফেলে দিলেন! আগুনে ফেলে দিলেন! ২৬ টা আসনের থেকে ১১টা আনলেন এটাই কি চমক?’
আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন বলেন, ‘মাননীয় চেয়ারম্যান, আপনি ভুল করবেন না। আপনি নিজেই বোঝেন, আপনার দলকে কারা ডুবিয়েছে। আপনার দলকে ধ্বংস করা করেছে, এটা আপনি নিজেই বোঝেন। এই নির্বাচনে গিয়ে আমাদের দলের অনেক ক্ষতি হয়েছে। গত ৫ বছর আপনি যে শো ডাউন করেছেন সেটা বৃথা গেছে।’
নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীরা অভিযোগ করেন, ভোটের মাঠে ছেড়ে দিয়ে কোন খোঁজ নেননি চেয়ারম্যান–মহাসচিব। অবশ্য তাঁদের দাবি, জাতীয় পার্টি ভাঙার চেষ্টা করছেন না তারা।
দলটির কো–চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা বলেন, ‘কি, হয়েছে কি? ১১টা হয়েছে, আপনাদের ভুল ভ্রান্তি ২৬টার জায়গায় হয়েছে। আমি বাবলা সিটির সভাপতি, উত্তরের সভাপতি খোকা এ রকম আমাদের আরও কয়েকটা সিট যদি থাকত আজকে আপনার (জিএম কাদের) বুকের পাটা কত থাকত? আপনি সকলকে ডাকুন। ডেকে দলকে সুসংগঠিত করুন।’
নির্বাচনের আগে থেকেই জাতীয় পার্টিতে নতুন করে দলীয় বিভাজন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠতে শুরু করে। দলটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ আর চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। রওশন জাতীয় পার্টির প্রয়াত চেয়ারম্যান এরশাদের স্ত্রী। তিনি অভিযোগ করেন, দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সরিয়ে জিএম কাদের ক্যু করে জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব গ্রহণ করেছেন।
দলে রওশনপন্থি বলে পরিচিত নেতাদের এবারের নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। এরশাদের নির্বাচনি আসন রংপুর–৩ থেকে নির্বাচন করেন জিএম কাদের। যদিও ধারনা করা হয়েছিল, এরশাদের ছেলে রাহগির আলমাহি সাদ এই আসন থেকে মনোনয়ন পাবেন। প্রতিবাদে নির্বাচন বর্জন করেন রওশন ও তাঁর অনুসারিরা।
ভোটের পর গত ১২ জানুয়ারি, জাতীয় পার্টির দুই কেন্দ্রীয় নেতা কাজী ফিরোজ রশিদ ও সুনীল শুভরায়কে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। দলের যুগ্ম দফতর সম্পাদক মাহমুদ আলমের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের দলীয় গঠনতন্ত্রে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে কাজী ফিরোজ রশিদ ও সুনীল শুভরায়'কে জাতীয় পার্টির কো- চেয়ারম্যান ও প্রেসিডিয়াম সদস্য পদ সহ দলীয় সকল পদ-পদবী থেকে অব্যাহতি প্রদান করেছেন।
জাতীয় পার্টির কো–চেয়ারম্যান কাজী ফিরোজ রশিদ জাতীয় পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতাদের অন্যতম। তিনি দলটির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের মন্ত্রিসভায় উপমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ঢাকা–৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। এবার তাঁকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে, দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য সুনীল শুভরায় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রেস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেছেন।
মতবিনিময় সভায় কাজী ফিরোজ রশিদ ও সুনীল শুভ রায়ের বহি:ষ্কার প্রত্যারেরও দাবি জানানো হয়।