মাস্কের ‘এক্সমেইল’ যে বার্তা দিচ্ছে গুগল–অ্যাপলকে

ইলন মাস্ক তাঁর নিজের ই-মেইল সার্ভিস ‘এক্সমেইল’ নিয়ে আসবেন- এই খবরটি প্রযুক্তি বিশ্বে বেশ অনেক দিন ধরেই চাউর ছিল। বিশেষ করে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ মাস্ক নিজেই এক্সমেইলের বিষয়ে এমন একটি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। এরপর অবশ্য এ নিয়ে আর কিছু শোনা যায়নি তাঁর মুখ থেকে। ফলে এক্সমেইল সম্পর্কিত যাবতীয় আলোচনাকে গুজব বা গুঞ্জন বলে চালিয়ে দেওয়া যাচ্ছিলো। কিন্তু এবার আর সেটা সম্ভব হচ্ছে না।

গত ১৫ ডিসেম্বর এক্স প্ল্যাটফর্মেই প্রকাশিত এক পোস্টের প্রত্যুত্তরে তিনি জানিয়েছেন যে, এক্সমেইল তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকম্পনার অংশ। শুধু তাই নয়, এর ঠিক পরের দিন তিনি আবারও এক্স প্ল্যাটফর্মের একটি পোস্টে রিপ্লাই দিতে গিয়ে এক্সমেইল কেমন হতে পারে সে সম্পর্কে ‘হ্যাঁ’সূচক ইঙ্গিত দিয়েছেন।

ফলে এক্সমেইল-কে এখন আর গুজব, গুঞ্জন, কিংবা কাল্পনিক ধারণার ‘ট্যাগ’ পরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। এক্সমেইল আসছে, এটা এখন বেশ হলফ করেই বলা যায়। যদি কবে নাগাদ এটি বাজারে আসবে সে সম্পর্কে ইলন মাস্ক কিংবা এক্স প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কিছু জানা যায়নি। 

তবে এক্সমেইলের সম্ভাব্য ফিচারগুলো সম্পর্কে ইতোমধ্যেই বেশ লেখালেখি শুরু হয়ে গেছে। এর একটি ফিচার সম্পর্কে ইলন মাস্ক নিজেই কিছুটা ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন। ফিচার সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা না গেলেও বিভিন্ন সময় জিমেইল ও অন্যান্য ই-মেইল সার্ভিসগুলো সম্পর্কে মাস্কের মন্তব্য এবং মাস্কের প্রযুক্তি সম্পর্কে যারা ধারণা রাখেন এমন ব্যক্তিদের মতামতের ভিত্তিতে এক্সমেইলের সম্ভাব্য ফিচার সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারণা করা যায়। 

ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার বিষয়টি প্রাধান্য পেতে পারে এক্সমেইলে, ফলে থাকতে পারে এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন ফিচারটি, যেমনটা হোয়াটসঅ্যাপে দেখা যায়। পাশাপাশি সাবসক্রিপশনভিত্তিক  মডেলে ব্যবহারকারীরা ‘টার্গেটেড বিজ্ঞাপন’ থেকে মুক্তি পেতে পারেন। এছাড়া ডিরেক্ট মেসেজিং (ডিএম)-এর মতো একটি ইউজার ইন্টারফেজ থাকতে পারে মাস্কের ই-মেইল সার্ভিসে, বিশেষ করে মাস্ক নিজেই যখন এই ফিচারটির পক্ষে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। এর ফলে লম্বা থ্রেডের দীর্ঘ মেইলের পরিবর্তে মেইলগুলো সংক্ষিপ্ত চ্যাট মেসেজের আকারে দেখা যেতে পারে ইনবক্সে। 

সাধারণ ইন্টারফেজের কল্যাণে নতুন ব্যবহারকারীরা সহজেই অভ্যস্ত হয়ে উঠবেন। পাশাপাশি সহজে ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় এক্সমেইলে তুলনামূলকভাবে দ্রুত কাজ করা যাবে। পাশাপাশি এআই প্রযুক্তির ব্যবহারে মেইল ক্যাটাগরাইজেশন, স্মার্ট রিপ্লাই ও স্প্যাম শনাক্তকরণের কাজগুলো অনেক বেশি সহজ হয়ে উঠবে। এছাড়া এক্সমেইল যে এক্স প্ল্যাটফর্মের সাথে সমন্বিত হবে এটা নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না। আরেকটি উল্লেখযোগ্য ফিচার হতে পারে, একাধিক ডিভাইস থেকে এক্সমেইল অ্যাক্সেস করার সুযোগ।

এসব তো গেল এক্সমেইলের সম্ভাব্য কিছু ফিচার। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এক্সমেইলের আগমনে কী প্রভাব পড়বে ই-মেইলের বৈশ্বিক বাজারে। মাস্কের প্রায় সকল প্রোডাক্ট ও সার্ভিস-ই ‘ডিসরাপটিভ’। অর্থাৎ এগুলো প্রযুক্তি বাজারের প্রচলিত ব্যবস্থায়, কিংবা স্থিতাবস্থায় (স্ট্যাটাসকো’তে), বিঘ্ন ঘটায়। এক্সমেইল-এর ক্ষেত্রেও কি তেমনটাই হতে চলেছে? মাস্কের নতুন ই-মেইল সার্ভিসের প্রভাব কি শুধুই ই-মেইলের বাজারে সীমাবদ্ধ থাকবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানার প্রচেষ্টা থেকেই এই আলোচনার সূত্রপাত। 

যে বার্তা দিচ্ছে এক্সমেইল 

বর্তমানে ই-মেইলের বৈশ্বিক বাজারে আধিপত্য বিস্তার করে আছে গুগলের জিমেইল ও অ্যাপলের ‘অ্যাপল মেইল’। সেপ্টেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ই-মেইলের বাজারে অ্যাপলের শেয়ার ৫৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং জিমেইলের শেয়ার ৩০ দশমিক ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জনই ই-মেইল সার্ভিসের জন্য এই দুটোর কোনো একটিকে ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু এক্সমেইলের আগমনের পর ই-মেইলের বৈশ্বিক বাজারে দীর্ঘদিনের এই স্থিতাবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা আছে বলেই মনে করছেন প্রযুক্তি বিশ্বের অনেকে। 

বিশ্বজুড়ে বর্তমানে গুগল ইকোসিস্টেমের গ্রাহক সংখ্যা ৪৯১ কোটি। সংখ্যাটা বিশ্বের মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ৯০ শতাংশেরও বেশি। অ্যালফাবেটের মালিকানাধীন গুগল তাঁদের বিভিন্ন প্রোডাক্ট ও সেবাকে একটি ইকোসিস্টেমের মধ্যে সমন্বয় করতে পেরেছে। আর এই ইকোসিস্টেমের চাবি হিসেবে কাজ করছে জিমেইল অ্যাকাউন্ট। অ্যাপলও ইকোসিস্টেমকেন্দ্রিক গ্রাহক তৈরিতে সর্বদা সচেষ্ট আছে। 

ইলন মাস্ক তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-কে কেন্দ্র করে একইরকম একটি ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে চাইলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। হ্যাঁ, ব্যবহারকারীর সংখ্যার দিক থেকে গুগলের প্রায় ৫০০ কোটির তুলনায় এক্স-এর ৬০ কোটিকে নগণ্য বলেই মনে হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে ইলন মাস্কের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং ভবিষ্যতে তিনি এক্স ইকোসিস্টেমে যে ধরণের প্রোডাক্ট ও সেবা যুক্ত করার পরিকল্পনা করছেন সেগুলোকে বিবেচনায় আনতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে ২০ কোটির-ও বেশি মানুষ ইলন মাস্ককে অনুসরণ (ফলো) করেন। পাশাপাশি মাস্ক তাঁর প্ল্যাটফর্মে বেশ সরব ও সক্রিয় থাকেন। আসন্ন ট্রাম্প প্রশাসনে পালন করবেন নতুন গঠিত ‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সি’-এর সহ-প্রধানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও। ফলে সামনের দিনগুলোতে সোশ্যাল ও মেইনস্ট্রিম- উভয় মাধ্যমেই মাস্কের উপস্থিতি বাড়বে বই কমবে না।

এদিকে আগামী ২ বছরে ইলন মাস্কের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বেশ কয়েকটি আলোচিত পণ্য বাজারে আসার কথা। টেসলার অটোনোমাস প্রযুক্তির চালকহীন বৈদ্যুতিক গাড়ি ‘সাইবারক্যাব’ ও রোবোভ্যান এবং হিউম্যানয়েড রোবোট ‘অপটিমাস’ বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আসার কথা ২০২৬ সালে। 

এদিকে ২০২৬ সালের মধ্যেই স্পেসএক্স-এর স্টারশিপ রকেটকে মঙ্গল গ্রহে পাঠাতে চায় মাস্ক। স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা স্টারলিংক-এর বৈশ্বিক বিস্তৃতি নিয়েও তাঁর বিশদ পরিকল্পনা রয়েছে। এই যেমন ভারতে স্টারলিংক নিয়ে আসার ক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই অনেক দূর এগিয়ে গেছেন মাস্ক। 

নিজের এআই স্টার্টআপ ‘এক্সএআই’ নিয়েও যথেষ্ট উচ্চাভিলাষী ইলন মাস্ক। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির আলোচিত চ্যাটবট গ্রোক ২-কে এক্সের সকল ব্যবহারকারীদের (প্রিমিয়াম ও নন-প্রিমিয়াম) জন্য উন্মুক্ত করেছেন তিনি। গ্রোক ২-তে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে নতুন টেক্সট-টু-ইমেজ এআই মডেল ‘অরোরা’। 

গ্রোক চ্যাটবটটির উন্নয়নকে আরও ত্বরান্বিত করতে গত মাসেই মাস্ক এক্স ব্যবহারকারীদেরকে তাদের মেডিক্যাল ডেটা গ্রোক চ্যাটবটে আপলোড করার আহ্বান জানিয়েছেন। ব্যবহারকারীদের এক্স-রে, এমআরআই ও সিটি স্ক্যানের মতো ডকুমেন্টগুলো গ্রোকের প্রশিক্ষণে ব্যবহার করতে চাইছেন মাস্ক, যাতে করে চ্যাটবটটি আরও দক্ষ হয়ে উঠে এবং এর সক্ষমতা আগের চেয়ে বৃদ্ধি পায়।

গত মাসেই এক্সএআই থেকে একটি গেম স্টুডিও তৈরির ইচ্ছের কথাও প্রকাশ করেছেন ইলন মাস্ক। এদিকে মানব মস্তিষ্কে চিপ স্থাপনের মাস্কের উদ্যোগ নিউরালিংকের কার্যক্রমও এগিয়ে চলেছে দুর্বার গতিতেই। বিটকয়েন নিয়েও মাস্কের আগ্রহ নতুন কিছু নয়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এক্সমেইল-এর আগমনে এক্স প্ল্যাটফর্মকে কেন্দ্র করে একটি ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার পরিকল্পনার সাথে ইলন মাস্কের ভবিষ্যৎ উচ্চাভিলাষী প্রোজেক্টগুলোর সম্পর্ক কোথায়। একটি ইকোসিস্টেম তৈরি করতে হলে প্রয়োজন হয় বিভিন্ন প্রোডাক্ট ও সার্ভিসের। প্রচলিত জনপ্রিয় ইকোসিস্টেমগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে গুগল, অ্যাপল ও মাইক্রোসফট তাঁদের ইকোসিস্টেমে একাধিক টুল, ফিচার ও সার্ভিস সফলভাবে সমন্বয় করতে পেরেছে।  

এক্স-কে কেন্দ্র করে একটি ইকোসিস্টেম বানাতে হলেও তাতে থাকতে হবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজন হয় এমন প্রোডাক্ট ও সার্ভিস। মাস্কের মস্তিস্কপ্রসূত প্রোডাক্ট ও সার্ভিসগুলো আকর্ষণীয় হলেও এখনও ঠিক গুগলে ইকোসিস্টেমের মতো দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারেনি। বিশেষ করে অটোনোমাস গাড়ি ও হিউম্যানয়েড রোবটের মতো প্রযুক্তিগুলোকে এখনও ভবিষ্যৎমুখী (ফিউচারিস্টিক) বলেই গণ্য করা হয়। অর্থাৎ, মাস্কের আসন্ন প্রোডাক্ট ও সার্ভিসগুলো এখনও সাধারণ ব্যবহারকারীদের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবসম্মত প্রোডাক্ট হয়ে উঠতে পারেনি। 

কিন্তু তাই বলে এগুলো ‘অবাস্তব’, এমনটা বলার সুযোগ কিন্তু নেই। ফলে আগামী ২-৩ বছরের মধ্যে এক্স-কে কেন্দ্র করে গুগলের মতোই শক্তিশালী একটি ইকোসিস্টেম গড়ে উঠার সম্ভাবনাকে আর যাই হোক একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এক্ষেত্রে মাস্কের বর্তমান প্রোডাক্ট ও সার্ভিসগুলোই তাঁর পক্ষে কথা বলবে। পাশাপাশি মাস্কের ভবিষ্যৎমুখী (ফিউচারিস্টিক) প্রোজেক্টগুলো সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতাকে ছুঁতে না পারলেও তাদের মানসপটে বেশ জোরালোভাবেই অবস্থান করছে- এটাকেও ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। 

ইলন মাস্ক বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তাঁর প্রোডাক্টগুলোকে সমন্বিত করে একটি ইকোসিস্টেম তৈরির দিকে ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে দিয়েছেন। এই যেমন মানুষের মস্তিষ্কে স্থাপিত নিউরালিংক-এর চিপ দিয়ে বিভিন্ন ডিভাইস অপারেট ও নিয়ন্ত্রণ করা এবং অটোনোমাস প্রযুক্তির বাস্তবায়নেও এর ভূমিকার কথা বলেছেন ইলন মাস্ক। অন্তত তাঁর উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার অংশ এগুলো।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মাস্ক যদি আসলেই এক্স ও এক্সমেইলকে কেন্দ্র করে একটি ইকোসিস্টেম তৈরিতে সমর্থ হয় তাহলে কি হবে। বাজারে নতুন একটি মেইল সার্ভিসের আগমনে নতুন আরেকটি ইকোসিস্টেম তৈরি হলেই কি বাজার থেকে উধাও হয়ে যাবে গুগল? একদম-ই তা নয়। প্রায় ৫০০ কোটি ব্যবহারকারীর বিশাল এক প্ল্যাটফর্ম উধাও হয়ে যাবে, এমনটা বোধহয় মাস্কের অতি-অনুগত অনুসারীরাও মনে করেন না। 

তবে মাস্কের পরিকল্পিত প্রজেক্টগুলো আগামী কয়েক বছরে আলোর মুখ দেখলে এক্সকেন্দ্রিক একটি ইকোসিস্টেম নিশ্চিতভাবেই গুগল ও অ্যাপলের আধিপত্যে ভাগ বসাবে। এখন দেখার বিষয়, মাস্কের প্রতিশ্রুত প্রডাক্ট ও সার্ভিসগুলো কতটা সফল হয়।

তথ্যসূত্র: এক্স, ফোর্বস, দ্য ফেডারেল, অ্যান্ড্রয়েড হেডলাইনস, ট্রাস্টেড ভিউজ, গিকি সিটি টাইমস ও ইয়াহু ফাইন্যান্স