কিছুদিন আগে অনুষ্ঠিত হওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আগামী জানুয়ারি মাসে নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি শপথও নেবেন। এরই মধ্যে ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছেন যে, প্রথম দফার প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন সময়ে যেসব নীতি তিনি গ্রহণ করেছিলেন, সেসবের ধারাবাহিকতা তিনি রক্ষা করবেন। এমনকি দ্বিতীয় দফায় সেসব পদক্ষেপ আরও কঠোরও হতে পারে। তবে কি আবারও হুয়াওয়ের ওপর খড়্গহস্ত হবেন ট্রাম্প? হুয়াওয়ে কি সেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করে দিয়েছে?
ট্রাম্পের আগের কর্মকাণ্ড একটু রিক্যাপ করে নেওয়া যাক। ২০১৯ সালের ১৫ মে আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের হুয়াওয়েকে যুক্তরাষ্ট্রে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করে তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসন। সরকারি অনুমোদন ছাড়া মার্কিন সংস্থা থেকে প্রযুক্তিসেবা নেওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায় হুয়াওয়ের। এরপরই অবশ্য এই বিধিনিষেধ ৯০ দিনের জন্য শিথিল করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগ। ততক্ষণে গুগল জানিয়ে দেয় যে, আর হুয়াওয়েকে সেবা দেবে না। একই পথ অনুসরণ করে মাইক্রোসফট, চিপ ডিজাইনার কোম্পানি এআরএম, প্যানাসনিকসহ আরও অনেক কোম্পানি। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, হুয়াওয়ের মোবাইল সেটগুলো স্রেফ খেলনায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এবং পরবর্তী কয়েক বছরে হয়েছেও খানিকটা তাই। এরপর থেকে বিশ্বজুড়ে মোবাইল ফোনসেটের ব্যবসায় ক্রমাগত পেছাতে থাকে হুয়াওয়ে। চীনের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের শুরু করা সেই বাণিজ্য যুদ্ধে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হিসেবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি সম্ভবত হয়েছে এই কোম্পানিটিরই। যদিও হুয়াওয়ে শুধু মোবাইল ফোনসেটের ব্যবসাই করে না। চালায় ফাইভ জি নেটওয়ার্ক ও নানা প্রযুক্তি উপকরণ বাজারজাত করার কাজও। তবে কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার আগের সময়টায় বিশ্বজুড়ে মোবাইল ফোনসেট তৈরি ও বাজারজাতকরণের দিক থেকে বেশ এগিয়ে গিয়েছিল কোম্পানিটি। ট্রাম্প মূলত তাতেই বাধা দেন। সেই ক্ষতির জের আজও বয়ে চলেছে হুয়াওয়ে।
তবে এটি ঠিক যে, ট্রাম্পের সেই বাণিজ্য যুদ্ধের কারণেই পশ্চিমা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমানোর মিশনে নামে হুয়াওয়ে। যদিও ২০১৯ সালে এ খাতে বেশ পিছিয়ে ছিল কোম্পানিটি। এখনও যে খুব এগিয়ে গেছে, তা বলার জো নেই। তবে এগিয়ে যাওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে ভালোভাবেই। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে শুধু হুয়াওয়ে কেন, সার্বিকভাবে পুরো চীনের উত্থানই সহজ হবে না। কারণ, গবেষণায় এখনো ঢের পিছিয়ে আছে দেশটি। চেষ্টা করলে হয়তো এগিয়ে আসতে পারবে। তবে তার জন্য আরও এক দশকেরও বেশি সময় লেগে যেতে পারে। মোবাইল ফোনসেটের হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার—দুটোতেই অন্য দেশের প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতা আছে চীনের। এমন নির্ভরশীলতা কমানো সহজ নয়।
হুয়াওয়ের মোবাইল ফোনগুলোর মোটা দাগে দুটি ক্ষেত্রে পশ্চিমানির্ভরতা ছিল। একটি হলো হার্ডওয়্যারে, অন্যটি সফটওয়্যারে। হার্ডওয়্যারে মূল নির্ভরতা ছিল ভালো ও শক্তিশালী চিপের ওপর। আর সফটওয়্যারে নির্ভরতা ছিল অপারেটিং সিস্টেমে। মূলত গুগলের অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করেই বাজার ধরেছিল হুয়াওয়ে। আবার বাণিজ্য যুদ্ধের সময় গুগল সেবা দিতে রাজি না হওয়ায়, তাতেই বড় বিপদে পড়েছিল হুয়াওয়ে। এর পর থেকে তাই নিজস্ব নকশায় ভালো চিপ তৈরি এবং নিজেদের অপারেটিং সিস্টেম তৈরি—দুটোতেই এগোতে চায় কোম্পানিটি। এবং সেই উদ্যোগ থেকেই বেশ কয়েক বছর ধরেই হুয়াওয়ের নিজস্ব শক্তিশালী চিপ বাজারে আসার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। এরই মধ্যে গত বছর বাজারে আনা ‘মেট ৬০’ নামের স্মার্টফোনে নিজেদের তৈরি ৭ ন্যানোমিটারের চিপ ব্যবহার করে চমকে দিয়েছিল হুয়াওয়ে। এর মধ্য দিয়েই ফাইভ জি প্রযুক্তির স্মার্টফোনের বাজারে ফের পা রাখে কোম্পানিটি।
অর্থাৎ, প্রাথমিকভাবে আগে নিজেদের দেশে, অর্থাৎ চীনের ভোক্তাদের মন জয় করতে চাইছে হুয়াওয়ে। এই পরীক্ষায় পাস করতে পারলে শুরু হবে বিশ্বজয়ের যাত্রা।
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, অপারেটিং সিস্টেম তৈরি করে ফেলার চেয়েও কঠিন কাজ হচ্ছে এটিকে ভোক্তাদের কাছে জনপ্রিয় করে তোলা। আর জনপ্রিয় করতে হলে চাই অপারেটিং সিস্টেমে চলার মতো প্রয়োজনীয় সব অ্যাপ্লিকেশন বা অ্যাপস। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে চলা স্মার্টফোনের ৯৮ শতাংশই চলে গুগলের অ্যান্ড্রয়েড ও অ্যাপলের আইওএস দিয়ে। এর অন্যতম কারণ হলো এই দুই অপারেটিং সিস্টেমে চলার মতো অ্যাপস বেশি আছে। এবং ডেভেলপাররা মূলত এই দুই অপারেটিং সিস্টেমকে মাথায় রেখেই অ্যাপস বানাচ্ছে এখন। নতুন অপারেটিং সিস্টেম এর আগেও বাজারে এসেছে, কিন্তু এই অ্যাপসের ঘাটতির কারণেই আর ব্যবসায় আলোর মুখ দেখেনি। তাই হুয়াওয়ের নতুন অপারেটিং সিস্টেমের ক্ষেত্রেও মূল চ্যালেঞ্জ আসলে এখানেই।
যদিও বিশ্বব্যাপী গুগলের অ্যান্ড্রয়েড ওএসের জনপ্রিয়তার বিপরীতে চিন্তা করলে, বলতেই হয় যে হুয়াওয়ের ‘দিল্লি বহুৎ দূর’! কিন্তু আসল কথা হলো, হুয়াওয়ে এই প্রতিযোগিতা থেকে সরে যেতে চাইছে না। বরং লড়তে চাইছে। হুয়াওয়ে এখন অন্যান্য চীনা স্মার্টফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে হারমনিওএস ব্যবহারে আগ্রহী করে তুলতে চাইছে। যেমন: শাওমি, ভিভো বা অপ্পো’কে তারা দিতে চাইছে ‘ওপেনহারমনি’। মূলত অ্যান্ড্রয়েড যে ওপেন সোর্স কোড ফ্রি’তে দেয়, তারই প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তৈরি করা হয়েছে ‘ওপেনহারমনি’। সমস্যা হলো, শাওমি, ভিভো বা অপ্পো নিজেদের হুয়াওয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই মনে করে। এবং অ্যান্ড্রয়েডের দেওয়া ওপেন সোর্স কোড ব্যবহার করে তারাও নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম তৈরি করতে চাইছে। তৈরি করতে চাইছে নিজস্ব চিপও। ফলে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার কারণেই হয়তো স্বেচ্ছায় হুয়াওয়ের ‘ওপেনহারমনি’ গ্রহণ করতে চাইবে না শাওমি, ভিভো বা অপ্পো। তবে চীনের সরকার যদি জোর করে ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়, তবে ভিন্ন কথা! মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফায় আগমনের সংবাদে যেভাবে আগেভাগেই কোমর বাঁধছে চীনের সরকার, সেক্ষেত্রে যদি চীনা মোবাইল হ্যান্ডসেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে হারমনিওএস নিতে বাধ্যও করা হয়, তাতে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।
আর সেটি হলে, গুগল–অ্যাপলের কিন্তু খবর আছে! কারণ চীন যদি হুয়াওয়ের নতুন অপারেটিং সিস্টেমকে বাজার পাইয়ে দিতে সর্বশক্তি নিয়োগ করে, তাহলে অনেক বাধাই হয়ে যাবে নস্যি। হয়তো রাতারাতি গুগল–অ্যাপলকে টপকে যেতে পারবে না হুয়াওয়ে, কিন্তু আবির্ভূত হবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে। তাতেই থমকে যেতে পারে গুগল–অ্যাপলের একচেটিয়া ব্যবসার গতি!
তথ্যসূত্র: সিএনবিসি, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, দ্য ইকোনমিস্ট, অ্যান্ড্রয়েড অথোরিটি, হুয়াওয়ে সেন্ট্রাল ডট কম ও বিবিসি