শুক্রবারের ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর গতকাল শনিবার তিনটি মৃদু ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে রাজধানী ঢাকাসহ বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে। শুক্রবারের ভূমিকম্পে ১০ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন কয়েকশ মানুষ। তবে শনিবারের তিনটি ভূকম্পনে প্রাণহানি বা বড় রকমের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
কিন্তু শুক্রবারের মাঝারি ভূমিকম্পের পর শনিবারের তিনটি মৃদু ভূকম্পনে জনমনে আতঙ্ক আরও বেড়েছে, এখনও বাড়ছে।
উল্লেখ্য, শনিবার প্রথম ভূকম্পনটির উৎপত্তি হয় সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে নরসিংদীর পলাশে যার স্থায়িত্ব ছিল ১২ সেকেন্ড। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৩। এরপর সন্ধ্যা ৬টা ৬ মিনিটে এক-দুই সেকেন্ডের ব্যবধানে অনুভূত হয় পর পর দুটি ভূমিকম্প, যেগুলোর উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার বাড্ডা। রিখটার স্কেলে এ দুটির মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৭ এবং ৪ দশমিক ৩।
বিশেষজ্ঞদের অনেকেই শনিবারের ভূকম্পনগুলোকে শুক্রবার নরসিংদীর মাধবদীতে সৃষ্ট মাঝারি ভূমিকম্পের ‘আফটার শক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এবার প্রশ্ন হচ্ছে, আফটার শক কী এবং কী কারণে অনুভূত হয় এই ‘আফটার শক’। চলুন এই প্রশ্ন দুটির উত্তর খুঁজে দেখা যাক।
ভূমিকম্পের ‘আফটার শক’ আসলে কী?
কোনো একটি অঞ্চলে মাঝারি বা বড় আকারের ভূমিকম্পের পর পরবর্তী ৭২ ঘন্টার মধ্যে মূল ভূমিকম্পের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম তীব্রতার এক বা একাধিক ভূকম্পন অনুভূত হলে এগুলোকে মূল ভূমিকম্পের ‘আফটার শক’ বলা হয়ে থাকে।
আফটার শকগুলো সাধারণত মূল ভূমিকম্পের চেয়ে ১ মাত্রা বা পয়েন্ট কম হয়ে থাকে। সে হিসেবে শুক্রবারের ৫ দশমিক ৭ মাত্রার মূল ভূমিকম্পের পর গতকাল শনিবার অনুভূত তিনটি আফটার শকের মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৩ দশমিক ৩, ৩ দশমিক ৭ এবং ৪ দশমিক ৩। তিনটি আফটার শক-ই হয়েছে মূল ভূমিকম্পের ৩২ ঘন্টার মধ্যে।
অর্থাৎ, আফটার শক হচ্ছে মূল ভূমিকম্পের (মেইন শক) উৎপত্তিস্থলের কাছাকাছি সৃষ্ট ছোট ছোট ভূকম্পন। এগুলো সাধারণত মূল ভূমিকম্পের ৭২ ঘন্টার মধ্যে অনুভূত হয় বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস ধরে দেখা দিতে পারে আফটার শক।
কোনটি আফটার শক, কীভাবে বুঝবেন?
একটি ভূকম্পন ‘আফটার শক’ কি না তা নিরূপণের ক্ষেত্রে ভূকম্পবিদরা তিনটি মানদণ্ড ব্যবহার করে থাকেন। এগুলো হচ্ছে:
সময়কাল: এটি মূল ভূমিকম্পের কয়েক মিনিট পর থেকে শুরু করে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস পর্যন্ত চলতে পারে। মোদ্দা কথা হচ্ছে, মূল ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল এবং আশেপাশের অঞ্চলে মাটির নিচের প্লেটগুলোতে সিসমিক অ্যাকটিভিটি (ভূকম্পনের সক্রিয়তা) কমে না আসা পর্যন্ত আফটার শক হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
অর্থাৎ, সিসমিক অ্যাকটিভিটি মূল ভূমিকম্পটি সৃষ্টি হওয়ার পূর্বের অবস্থায় ফিরে না আসা পর্যন্ত আফটার শক হতে পারে। ফলে উৎপত্তিস্থল ও তৎসংলগ্ন এলাকায় ক্ষেত্র বিশেষে এমনকি কয়েক বছর পর্যন্ত ছোট ছোট আফটার শক অনুভূত হতে পার।
মাত্রা (ম্যাগনিচ্যুড): আফটার শকের মাত্রা সাধারণত মূল ভূমিকম্পের মাত্রার চেয়ে কম হয়ে থাকে। সাধারণ এটি অন্তত ১ মাত্রা কম হয়ে থাকে। শনিবারের আফটার শকগুলোতে তেমন একটা ক্ষয়ক্ষতি না হলেও, অনেক সময় মূল ভূমিকম্পের ‘আফটার শক’ নতুন করে ক্ষয়ক্ষতির কারণ হতে পারে।
আফটার শকের সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো অঞ্চলে যদি পরপর দুটি ভূমিকম্প হয়, তবে এর মধ্যে যেটির মাত্রা বেশি, সেটিকে 'মূল ভূমিকম্প' এবং অপেক্ষাকৃত ছোট কম্পনটিকে 'আফটার শক' বলা হয়ে থাকে।
স্থান (লোকেশন): মূল ভূমিকম্পটি যে ফল্ট জোন বা এলাকায় উৎপত্তি হয়েছে, সে ফল্ট জোনেই অনুভূত হয় ‘আফটার শক’। এই যেমন শুক্রবারের মূল ভূমিকম্পটি উৎপত্তি হয়েছিল নরসিংদীর মাধবদী। এরপর গতকাল সকালে অনুভূত প্রথম আফটার শকটি সৃষ্টি হয়েছে নরসিংদীর পলাশ উপজেলায়। এরপর সন্ধ্যার আফটার শক দুটির উৎপত্তিস্থল ঢাকার বাড্ডা, যেটা একই ফল্ট জোনের অধীন।
আফটার শক কেন হয়?
বড় বা মাঝারি আকারের ভূমিকম্পের পর অপেক্ষাকৃত কম তীব্রতার (মাত্রার) ‘আফটার শক’ হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে, ভূ-অভ্যন্তরে গভীরে অবস্থিত টেকটনিক প্লেটের ভারসাম্যহীনতা দূর করা। অর্থাৎ, মূল ভূমিকম্পের কারণে কয়েক শতাব্দী ধরে জমে থাকা সিসমিক এনার্জি বা শক্তি নির্গত হলে যে সিসমিক অ্যাকটিভিটি শুরু হয় তা স্তিমিত হতে হতে টেকটনিক প্লেটগুলো
যখন বড় একটি ভূমিকম্প হয়, তখন ভূত্বকের গভীরে থাকা টেকটনিক প্লেটের ফাটল রেখায় (ফল্ট লাইন) জমে থাকা বিশাল শক্তি হঠাৎ করে মুক্ত হয়, অর্থাৎ ভূমির উপরে নির্গত হয়। আট’শ থেকে এক হাজার বছর ধরে জমতে থাকা এই শক্তি আকস্মিক মুক্তি পাওয়ায় টেকটনিক প্লেটের চারপাশে এবং ফল্ট লাইনের অন্যান্য অংশে নতুন করে চাপ বা স্ট্রেস সৃষ্টি করে।
সহজ করে বললে, মূল ভূমিকম্পের ফলে পৃথিবীর ভূত্বকের অভ্যন্তরে যে বিশাল পরিবর্তন আসে, তার কারণে পার্শ্ববর্তী এলাকার টেকটনিক প্লেটগুলোতে নতুন করে চাপের সৃষ্টি হয়। নতুন এই চাপ ধীরে ধীরে মুক্ত হয়। ভূত্বক তখন নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা বা স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। এই ভারসাম্যের প্রক্রিয়ায় ছোট ছোট কম্পন বা আফটার শকের সৃষ্টি হয়, যতক্ষণ না প্লেটগুলো তাদের নতুন স্থানে শান্ত হয়ে আসে।
উদাহরণস্বরুপ, একটি বিশাল পাথর সরালে যেমন তার আশপাশের নুড়ি-পাথরগুলোও কিছুটা গড়িয়ে এরপর স্থির হয়ে আসে, তেমনি মূল ভূমিকম্পের পর চাপমুক্তির এই ছোট ছোট প্রক্রিয়াগুলোই হচ্ছে আফটার শক।
আফটার শক কি বিপজ্জনক হতে পারে?
আফটার শকের মাত্রা মূল ভূমিকম্পের চেয়ে কম হলেও এটি বেশ কিছু কারণে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। এই যেমন মূল ভূমিকম্পে যে ভবনগুলো আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত বা দুর্বল হয়েছে, অপেক্ষাকৃত ছোট মাত্রার আফটার শকে সেই ভবনগুলোই সম্পূর্ণ ধসে পড়তে পারে।
এছাড়া মূল ভূমিকম্পের পর উদ্ধার কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বাঁধাগ্রস্ত হতে পারে আফটার শকের কারণে। এক্ষেত্রে উদ্ধার কার্যক্রমে নিয়োজিত দল এবং সাধারণ মানুষ নতুন করে আতঙ্কিত হয়ে পড়তে পারেন। ফলে ব্যাপকভাবে ব্যাহত হতে পারে উদ্ধার কার্যক্রম। পাশাপাশি বারবার কম্পন অনুভূত হলে এলাকার সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র মানসিক চাপ ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়।