শুক্রবারের ভূমিকম্পের ভয় কাটতে না কাটতেই শনিবার আবার কেঁপে উঠল রাজধানী ঢাকা। সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে নরসিংদীর পলাশ উপজেলায়ও ভূমিকম্প অনুভূত হয়। আর সন্ধ্যা ৬টা ৬ মিনিটে ঢাকায় অনুভূত হওয়া এই কম্পন মানুষের মনে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে।
ঢাকার এত কাছাকাছি ভূমিকম্প হওয়া, এটা অনেকের কাছেই প্রথম অভিজ্ঞতা। ২১ নভেম্বরের ৫ দশমিক ৭ মাত্রার এই ভূমিকম্পে সারাদেশে ১০ জনের মৃত্যু এবং শতাধিক মানুষের আহত হওয়ার খবর মিলেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, ভূমিকম্প কি আগে থেকে জানা যায় না?
বিশ্বজুড়ে বিশেষজ্ঞরা বহু বছর ধরে ভূমিকম্পের আগাম সংকেত ধরতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ভূমিকম্পের পরপরই পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সংবেদনশীল যন্ত্রগুলো নানা সংকেত ধরতে পারে। ফলে কোথাও বড় ধরনের দ্বিতীয় ধাক্কা আসার সম্ভাবনা থাকলে তা মুহূর্তেই ধরা পড়ে। কিন্তু ভূমিকম্প হওয়ার আগে তার সময়, স্থান ও মাত্রা, এই তিনটি জিনিস বলা এখনও বিজ্ঞানীদের জন্য প্রায় অসম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর বড় কারণ হলো পৃথিবীর অভ্যন্তরের টেকটোনিক প্লেটগুলো অত্যন্ত জটিলভাবে নড়াচড়া করে। কোন ফল্ট লাইনে কখন চাপ জমবে এবং কখন সেটি হঠাৎ ভেঙে শক্তি ছাড়বে, তা নিশ্চিতভাবে বোঝা খুব কঠিন। ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিমভাবে তৈরি ভূকম্পে বিজ্ঞানীরা কিছু আগাম সংকেত ধরতে পারলেও, বাস্তব পৃথিবীর জটিলতায় সেই পদ্ধতি কার্যকর হয় না।
ইতালির সেপিয়েঞ্জা বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের পেন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানী ক্রিস ম্যারোন বলেন, ‘প্রকৃতিতে এত অনিশ্চয়তা থাকে যে বড় ভূমিকম্প আসছে, এমন সংকেত আমরা বেশিরভাগ সময়ই পাই না।’
বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় গবেষণা চলছেই। কেউ কেউ প্রাণীর আচরণ, কেউ বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তন, কেউ মাধ্যাকর্ষণের নড়াচড়া, কোনো কিছুতেই এখনো নির্ভরযোগ্য সাফল্য আসেনি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-কে নিয়ে বাড়ছে আশাবাদ। অতীতের ভূকম্পন ডেটা থেকে ভবিষ্যতের ধাক্কার সম্ভাবনা খুঁজছে মেশিন-লার্নিং অ্যালগরিদম। চীন, ইসরায়েল ও জাপানের কয়েকটি গবেষণা দল দাবি করেছে যে, তারা ভূমিকম্পের আগে আয়নমণ্ডলের পরিবর্তন ধরতে পেরেছেন। তবে সেগুলোও এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে, নির্ভুলতার ঘাটতি রয়েছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, একটি নিখুঁত পূর্বাভাস দিতে হলে জানতে হবে ভূমিকম্প কোথায় হবে, কখন হবে এবং কত শক্তির হবে। বিশ্বের কোনো দেশ বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানই এখনো তিনটি তথ্য একসঙ্গে নিশ্চিতভাবে দিতে পারেনি।
তাই আপাতত বিজ্ঞানীদের নির্ভরতা ‘ঝুঁকি মানচিত্র’-এর ওপর। দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণ থেকে কোন এলাকায় বড় ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা আছে তা বলা যায়। সেই অনুযায়ী ভবন নির্মাণের নিয়ম-কানুন শক্ত করা হয়। কিন্তু মানুষকে সরিয়ে নেওয়া বা আগাম সতর্কতার মতো সিদ্ধান্ত, এখনো অসম্ভব।
ভবন নির্মাণসংক্রান্ত নিয়ম না মানা, পুরোনো দুর্বল দালান, এবং ঢিলেঢালা অবকাঠামো, এসবও তুরস্ক-সিরিয়ার মতো ভয়াবহ বিপর্যয় বাড়িয়ে দেয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ বড় ভূমিকম্পের ঠিক পরেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয় দুর্বল ভবনগুলোর ভেঙে পড়ায়।
এআই কিছু ক্ষেত্রে এখনই সাহায্য করছে, ভূমিকম্পের পরপরই স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে কোন এলাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে তা শনাক্ত করতে। যাতে দ্রুত উদ্ধার পাঠানো যায়। ভবিষ্যতে আফটারশকও পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হতে পারে বলে আশা করছেন গবেষকরা।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, আমরা কি কখনো আগেভাগে ভূমিকম্পের সঠিক পূর্বাভাস পেতে পারব? বিজ্ঞানীদের ভাষায়, হয়তো একদিন সম্ভব হবে, কিন্তু এখনো সেই পথে অনেকটা পথ বাকি।
এক্ষেত্রে তুলনা করা হচ্ছে আবহাওয়ার পূর্বাভাসের সঙ্গে, যেখানে বিজ্ঞান ধীরে ধীরে নির্ভুলতা বাড়িয়েছে। কিন্তু ভূমিকম্প তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। ক্রিস ম্যারোনের ভাষায়, ‘এই মুহূর্তে আমরা আগাম ভূমিকম্পের সঠিক পূর্বাভাসের কাছাকাছি কোথাও নেই।’
তাই বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ভূমিকম্প আগাম জানা না গেলেও ঝুঁকি কমানোর উপায় রয়েছে। তা হলো শক্তিশালী ভবন, সঠিক নির্মাণকাঠামো, এবং ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় সতর্কতা। এগুলোই এখন সবচেয়ে বড় ‘পূর্বাভাস’।


ফের ভূমিকম্পে কাঁপল ঢাকা
ঢাকার এত কাছে এই মাত্রার ভূমিকম্প কি এই প্রথম?
