মানুষ কি সত্যিই তারার সন্তান?

‘তারার মেলায় খুঁজে আমি তোমায় পেয়েছি।’ নব্বইয়ের দশকের বাংলা ব্যান্ড গানের সাথে যারা পরিচিত, তারা মুহূর্তেই ধরে ফেলবেন- গানটি একসময়ের জনপ্রিয় ব্যান্ড আর্কের লিড ভোকাল হাসানের। সে সময় গানটি বেশ জনপ্রিয়ও হয়েছিল। গানটিতে গীতিকবির আবেগ সুস্পষ্ট হলেও যদি কেউ প্রশ্ন করে, এও কি সম্ভব? তবে তো একটু থমকাতেই হয়।

না, আক্ষরিক অর্থেই ‘তারার মেলা’ তন্ন তন্ন করে খুঁজে কেউ হয়তো তার প্রিয়জনকে খুঁজে পাবে না। তবে এর মধ্য দিয়ে আশির দশকে কার্ল সেগানের সেই বিখ্যাত উক্তিটিই কিন্তু সামনে আসে- ‘মানুষ তারার সন্তান’।

সে যাই হোক, পৃথিবীতে মানুষ কীভাবে এল, তা নিয়ে কৌতূহলের অন্ত নেই। তাবৎ বিজ্ঞানী মাথার ঘাম পায়ে ফেলছেন এ নিয়ে গবেষণা করতে। বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার বিপরীতে প্রচলিত রয়েছে নানা ধর্মের নানা ব্যাখ্যা। কিন্তু কেউই সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেননি। আসলেই মানুষের সৃষ্টি কীভাবে? পৃথিবীতে প্রাণ কীভাবে এল? প্রাণ ছাড়াও পৃথিবীতে দৃশ্য-অদৃশ্য আরও যেসব বস্তু রয়েছে, সেগুলোর সৃষ্টি কীভাবে?

কেউ বলেছেন পানিতে এককোষী জীব হতে প্রথমে প্রাণের সৃষ্টি হয়েছে। এর পর বিবর্তনের মাধ্যমে আজকের মানুষে পরিণত হয়েছে। কারও মতে, মহাবিশ্বের নক্ষত্র বা তারকার মধ্যে প্রাণ ও অন্যান্য উপাদানের সৃষ্টি হয়েছে। এর পর সেই নক্ষত্রগুলো বিস্ফোরণের মাধ্যমে ধ্বংসের ফলে তার উপাদানগুলো পৃথিবীতে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। আর এভাবে পৃথিবীতে প্রাণের সঞ্চার ঘটেছে। এ নিয়ে নানা মুণির নানা মত।

বিখ্যাত মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগান বলেছিলেন, ‘মানুষ নক্ষত্রের উপাদান দিয়ে তৈরি।’ এই কথার দ্বারা তিনি কী বোঝাতে চেয়েছিলেন এবং তাঁর এই তত্ত্বের সত্যতা কত, তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা রয়েছে।


নাসার অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের সৌজন্যে সংগৃহীত ছবি

১৯৮০ সালের শুরুর দিকে মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগান ‘কসমস: আ পারসোনাল ভয়েস’ নামে বিজ্ঞান বিষয়ক ১৩ পর্বের একটি টেলিভিশন সিরিজ পরিচালনা ও উপস্থাপনা করেছিলেন, যা মার্কিন গণমাধ্যম পিবিএস-এ সম্প্রচারিত হয়েছিল। ওই শোতে সেগান পৃথিবীর ইতিহাস, বিবর্তন, প্রাণের উৎপত্তি এবং সৌরজগৎসহ বিজ্ঞান-সম্পর্কিত অনেক জটিল বিষয় নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেন।

সেই অনুষ্ঠানেরই একটি পর্বে সেগান বলেছিলেন, ‘আমরা নিজেকে জানার মাধ্যমে মহাবিশ্বকে জানতে পারি। কারণ, আমরা নিজের মধ্যে মহাবিশ্বকে ধারণ করি। আমাদের সত্তার কিছু অংশ জানে যে আমরা পৃথিবীতে কীভাবে এসেছি এবং কোথায় ফিরে যাব। নক্ষত্রের উপাদান থেকে আমাদের সৃষ্টি হয়েছে।’

সেগানের এই মতের স্বপক্ষে অনেকেই একমত পোষণ করেছেন। তাদের মধ্য অন্যতম অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিদ্যার অধ্যাপক ক্রিস ইম্পি। অধ্যাপক ক্রিস ইম্পি বলেছেন, ‘আমাদের দেহে কার্বন, নাইট্রোজেন এবং অক্সিজেন পরমাণু রয়েছে। আবার পৃথিবীতে থাকা অন্য সব ভারী মৌলের উৎপত্তি হয়েছিল আজ থেকে সাড়ে ৪০০ কোটি বছর আগে নক্ষত্রমণ্ডলিতে। মানুষসহ প্রত্যেক প্রাণী (পাশাপাশি পৃথিবীর বেশির ভাগ পদার্থ) এই উপাদানগুলো ধারণ করে। তাই আক্ষরিক অর্থে আমরা নক্ষত্রের উপাদান থেকেই সৃষ্টি।’

অধ্যাপক ইম্পি এখানেই থামেননি। তিনি আরও যুক্তি দিয়েছেন। তাঁর মতে, যেসব জৈব পদার্থ কার্বন ধারণ করে তাদের উৎপত্তি মূলত নক্ষত্রেই। মহাবিশ্বের শুরুর দিকে মূলত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম ছিল। এই দুই মৌল থেকে তেজষ্ক্রীয় রশ্মি বিকিরণের মধ্য দিয়ে পরে কার্বন সৃষ্টি হয়েছিল। এতে সময় লেগেছিল বিলিয়ন বছর।

নাসার অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের সৌজন্যে সংগৃহীত ছবি

যখন একটি নক্ষত্রে হাইড্রোজেনের সরবরাহ শেষ হয়ে যায়, তখন বিকট বিস্ফোরণে এর মৃত্যু হয় যাকে বলা হয় ‘নোভা’। বড় মাপের নক্ষত্রের বিস্ফোরণকে বলা হয় সুপারনোভা। ওয়ার্ল্ড বুক এনসাইক্লোপিডিয়া, ২০০৫ অনুসারে, একটি সুপারনোভার ফলে সূর্যের চেয়ে কোটি কোটি গুণ বেশি আলোর বিচ্ছুরণ হতে পারে। নক্ষত্রের এমন বিস্ফোরণের ফলে মহাকাশে ধূলিকণা ও গ্যাসের বিশাল মেঘের সৃষ্টি হয়। বিষয়টি অবশ্য সংশ্লিষ্ট নক্ষত্রের আকার, গঠন ও উপাদানের উপর নির্ভর করে।

একটি সুপারনোভা সংঘটনের কিছু সময় পর এটি তার সর্বোচ্চ উজ্জ্বলতায় পৌঁছায়। এর উজ্জলতা এতটাই তীব্র হতে পারে যে, তা পুরো গ্যালাক্সিকে আলোকিত করতে পারে। এটি নিঃশেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত এমন তীব্রভাবে জ্বলতে থাকে।

এর পর একটি সুপারনোভা থেকে সৃষ্ট উপাদানগুলো তার সৌরজগতের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। ‘কসমিক কলিউশনস: দ্য হাবল অ্যাটলাস অব মার্জিং গ্যালাক্সিস’ (স্প্রিংজার, ২০০৯) অনুসারে, প্রাচীনতম নক্ষত্রগুলো প্রায় একচেটিয়াভাবে হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম নিয়ে গঠিত। আর অক্সিজেন থেকে শুরু করে বাকি ভারী মৌলগুলো পরে সুপারনোভার ফলে আসে। প্রকৃতপক্ষে, জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সোনা, রুপা ও প্লাটিনামের মতো ভারী উপাদানগুলো মহাবিশ্বের কাছাকাছি জায়গায় সুপারনোভা অবশিষ্টাংশ থেকে আবিষ্কার করেছেন। শুরুর দিকে এগুলো ছায়াপথে উজ্জ্বল বস্তুরূপে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল।

ইএসওর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের সৌজন্যে সংগৃহীত ছবি

শেষদিকে অধ্যাপক ক্রিস ইম্পি একটি পরীক্ষিত তত্ত্বের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, নক্ষত্র বা তারকারা তাদের আয়ুষ্কালের শেষ দিকে ভারী উপাদান সৃষ্টি করে এবং তাদের ভেতরের গ্যাস নির্গত করে দেয়। এভাবে নির্গত উপাদানগুলোই পরে অন্য কোনো নক্ষত্র বা গ্রহের (এমনকি মানুষের) অংশ হতে পারে।

তাই পৃথিবীর সমস্ত জীবন এবং আমাদের দেহের উপাদানগুলো কোনো না কোনো নক্ষত্র থেকেই তৈরি হয়েছিল। একেকটি নক্ষত্রের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়া উপাদানগুলোই এসে জড়ো হয়েছে আমাদের শরীরগুলোতে। ফলে কেউ যদি তার প্রিয়জন খুঁজতে তারার মেলায় তল্লাশি চালানোর কথা বলে, তাকে বাড়িয়ে বলা যেতে পারে; কিন্তু কোনোভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তথ্যসূত্র: লাইভ সায়েন্স


ইমদাদুল হক জুয়েল, সহ-সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন, ডিজিটাল মিডিয়া