নতুন ভূতাত্ত্বিক যুগে পৃথিবী

মানুষের কার্যকলাপের ফলে পৃথিবীর ভূতত্ত্ব, বায়ুমণ্ডল এবং জীবজগতের ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। আর পরিবর্তন এতটাই মারাত্মক যে পৃথিবীর ভূতত্ত্ব মৌলিক পরিবর্তন হয়ে নতুন এক যুগে প্রবেশ করেছে বলে বলছে বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানীদের দাবি, নতুন এ ভূতাত্ত্বিক যুগ অ্যানথ্রোপোসিন বা নৃতাত্ত্বিক নামে পরিচিত।

অ্যানথ্রোপোসিন ওয়ার্কিং গ্রুপের (এডব্লিউজি) চেয়ারপার্সন ও লিচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিদ কলিন ওয়াটারস বলেন, এটি বেশ স্পষ্ট যে পরিবর্তনের মাত্রা অবিশ্বাস্যভাবে তীব্র হয়েছে এবং এটি মানুষের প্রভাবেই হয়েছে।

তিনি দাবি করেন, মানুষের কর্মকাণ্ড শুধু পৃথিবীকে প্রভাবিত করছে না প্রকৃতপক্ষে নিয়ন্ত্রণ করছে।

মঙ্গলবার কানাডার টরেন্টোর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার পশ্চিমের ক্রফোর্ড হ্রদে গবেষণা করে এ তথ্য প্রকাশ করে ওই বিজ্ঞানীরা।ওই হ্রদের তলদেশে জমা পলি বিশ্লেষণ করে পরিবেশগত পরিবর্তনের ভূতাত্ত্বিক এ রেকর্ডের কথা জানাল বিজ্ঞানীরা।

ভূতাত্ত্বিক নতুন যুগের দাবি করা ওই বিজ্ঞানীরা প্রায় ১১ জায়গার মূল নমুনা সংগ্রহ করেছেন। লেক ক্রফোর্ডের গভীরতা অনেক বেশি হওয়ায় সেখানকার পলি তুলনামূলকভাবে নিরবচ্ছিন্নভাবে নিচের দিকে ভাসতে থাকে, এমন স্তর তৈরি হয় যা স্বতন্ত্র পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করে। ক্রফোর্ডের গভীরতা বেশি হওয়ার কারণেই তলদেশে পলিমাটিতে জমে থাকা প্রমাণগুলো এখনও নষ্ট হয়নি।

ওই বিজ্ঞানীরা এই পলির স্তরের মধ্যে একটি "গোল্ডেন স্পাইক" ফেলে নাটকীয় এ ফলাফল পায়। যে ফলাফল অন্তত ভূতাত্ত্বিক পরিপ্রেক্ষিতে পৃথিবীর আকস্মিক পরিবর্তনকে নির্দেশ করে।

সেই "স্পাইক" এর এক অংশের মাধ্যমে হ্রদের পলিতে প্লুটোনিয়ামের (ইউরেনিয়াম থেকে গঠিত মৌল পদার্থ) উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়।প্লুটোনিয়াম খুব কমই প্রাকৃতিকভাবে ঘটে। ফলে বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, যে এটি ১৯৫০ এর দশকে পারমাণবিক পরীক্ষা থেকে এসেছে। আর এসব আলামতই ইঙ্গিত দিচ্ছে, ৭০ বছর আগে অ্যানথ্রোপোসিন যুগ বা মনুষ্যসৃষ্ট ভূতাত্ত্বিক যুগের সূচনা হয়েছে।

অ্যানথ্রোপোসিন ওয়ার্কিং গ্রুপের চেয়ারম্যান ভূতত্ত্ববিদ কলিন ওয়াটারস ও অন্যান্য বিজ্ঞানীরা বলেছেন, প্রায় ৭০ বছর আগে ১৯৫০ সালের দিকে যে এ যুগের সূচনা হয়েছে তার পরিষ্কার নির্দেশক এই প্লুটোনিয়াম। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৪ সালের মধ্যে নতুন এ যুগের শুরুর কথা জানান তারা। এ সময় থেকেই নতুন যুগের নামকরণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

কলিন ওয়াটারস বলেছেন, পৃথিবীর জীব জগতের আকস্মিক পরিবর্তন হয়েছে। আমরা এখন হোলোসিন যুগে ফিরে যেতে পারি না।

যদি অ্যানথ্রোপোসিন ওয়ার্কিং গ্রুপের এই প্রস্তাব গৃহীত হয় তাহলে বর্তমানে চলা হলোসিন ভূতাত্ত্বিক যুগের সমাপ্তি হবে। ১১ হাজার ৭০০ বছর আগে বরফযুগ শেষ হওয়ার পর এ যুগের সূচনা হয়েছিল।

ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অন স্ট্রাটিগ্রাফি ভূতাত্ত্বিক যুগের নামকরণ করে থাকে। এডব্লিউজিদের গবেষণার তথ্যপ্রমাণ সাপেক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে অ্যানথ্রোপোসিন যুগের স্বীকৃতি মিলবে।

নৃতাত্ত্বিক যুগের ধারণাটি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত হয়নি। প্রায় ২০ বছর আগে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী রসায়নবিদ পল ক্রুটজেন
এ বিষয়ে প্রথম প্রস্তাব করেন। তখন অ্যানথ্রোপোসিন নিয়ে তীব্র বিতর্ক হয়। এটি কখন শুরু বা কীভাবে এটি সংজ্ঞায়িত করা যায় তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা দ্বিমত পোষণ করেন।

এদিকে মার্কিন হোয়াইট হাউসের সাবেক বিজ্ঞান বিষয়ক উপদেষ্টা জন হোল্ডরেন এডব্লিউজি-এর সদস্য না হয়েও অ্যানথ্রোপোসিন যুগের শুরু অনেক আগে থেকেই হয়েছে এ মতবাদের পক্ষে কথা বলে আসছেন। এর পক্ষে যুক্তি হিসেবে বলেছেন, মানুষের আচরণ অপ্রত্যাশিত উপায়ে পৃথিবীকে পরিবর্তন করছে।