‘নামে কী-বা আসে যায়’! তবে মেটার মালিকানাধীন জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপ জানিয়েছে, নামই হতে যাচ্ছে এবার অ্যাপটি ব্যবহারের মূল বিষয়। এখন থেকে আপনার ফোন নম্বর নয়, প্ল্যাটফর্মটিতে ‘ইউজারনেম’ ব্যবহার করেই চ্যাট করা যাবে। বিশ্বব্যাপী ব্যবহারকারীদের সুরক্ষার কথা ভেবে এই ফিচার আনা হলেও, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা এর আড়ালে বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা দেখছেন। সম্পূর্ণ পরিচয় গোপন রাখার এই সুযোগ সাইবার অপরাধ ও প্রতারণার এক নতুন দুয়ার খুলে দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তাঁরা।
কী এই ফিচার?
হোয়াটসঅ্যাপ একটি নতুন ফিচার আনতে চলেছে যেখানে ফোন নম্বর ব্যবহার করে চ্যাট করার বদলে শুধু ইউজারনেম বা ব্যবহারকারী নাম দিয়ে কথা বলা যাবে। চলতি বছর থেকেই ব্যবহারকারীরা নিজেদের পছন্দমতো ইউনিক ইউজারনেম বেছে নিয়ে তা রিজার্ভ করে রাখার সুযোগ পাবেন। গ্রুপ চ্যাট বা অচেনা কারও সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ফোন নম্বর গোপন রাখতেই মূলত মেটা এই পদক্ষেপ নিয়েছে। একবার চ্যাট শুরু হয়ে গেলে ডিসপ্লে নাম দেখা গেলেও ফোন নম্বরটি সম্পূর্ণ আড়ালে থাকবে।
লুকিয়ে আছে যে বিপদ
ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষেত্রে এটিকে বড় পদক্ষেপ মনে করা হলেও এর নেতিবাচক দিক নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, সম্পূর্ণ পরিচয় গোপন রাখার এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্ল্যাটফর্মটিতে ভুয়া প্রোফাইল তৈরি ও নিখুঁতভাবে প্রতারণা করার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে।
দীর্ঘদিন ডেটা সিকিউরিটি নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞ সৌম্যক সেন বলেন, সম্পূর্ণ পরিচয় গোপন রাখার বিষয়টাই একটা বড় ঝুঁকি বয়ে আনে। এর ফলে ব্যবহারকারীদের হয়রানি ও ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে সূক্ষ্ম প্রতারণার মতো ঘটনা সহজে ঘটতে পারে। তাঁর মতে, "গোপনীয়তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অপরাধের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতাও জরুরি।"
আরেক ডেটা সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ সৌরভ দাস জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হোয়াটসঅ্যাপকে এমন এক ব্যবস্থা করতে হবে যা একদিকে গোপনীয়তা রক্ষা করবে, অন্যদিকে প্রতারকদের ফিল্টার করবে। কারণ, প্রতারকদের থেকে ব্যবহারকারীদের রক্ষা করাও পরোক্ষভাবে গোপনীয়তাকে সম্মান জানানো।
সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও নোটিশ
এই ফিচারের অপব্যবহার ও জালিয়াতির ঝুঁকি আঁচ করতে পেরে ইতোমধ্যেই নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউজারনেমের এই বিষয়টি নিয়ে ‘মেটা’কে নোটিশ পাঠিয়েছে ভারত সরকার। এই নতুন ফিচার এবং তার অপব্যবহার সংক্রান্ত নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও সমাধান না করা পর্যন্ত এটি চালু না করার জন্য বলা হয়েছে সেখানে।
প্রতারণা ঠেকাতে হোয়াটসঅ্যাপের যুক্তি
বিশ্বজুড়ে প্রায় তিনশো কোটি হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারী রয়েছেন। মেটা জানিয়েছে, বিখ্যাত ব্যক্তি, স্কুল বা বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক নাম যাতে কেউ অপব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য কিছু বিধি-নিষেধ থাকবে। যেমন—নিজেদের ডোনাল্ড ট্রাম্প বলে পরিচয় দিয়ে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ কম থাকবে। এছাড়া প্রথমবার চ্যাটকারীদের জন্য অতিরিক্ত সুরক্ষাস্তর হিসেবে একটি চার-সংখ্যার ঐচ্ছিক নিরাপত্তা কোডও বা পিন রাখা হতে পারে।
তবে প্রযুক্তিবিদরা মনে করছেন, তিনশো কোটি ব্যবহারকারীর এই বিশাল প্ল্যাটফর্মে শুধু স্বয়ংক্রিয় ফিল্টার বা কোড দিয়ে ভুয়া আইডেন্টিটি ও নিখুঁত সাইবার ক্রাইম পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। ফলে সুরক্ষার মোড়কে আসা হোয়াটসঅ্যাপের এই নতুন ফিচার শেষ পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের জন্য স্বস্তি নাকি নতুন কোনো সাইবার ট্র্যাপ হয়ে দাঁড়ায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।