আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই’র যুগে আমরা প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় যা দেখছি, তার কতটুকু সত্য আর কতটুকু ভুয়া, তা শনাক্ত করতে নিয়মিতই হিমশিম খেতে হচ্ছে। ভুয়া অ্যাকাউন্ট, স্প্যাম আর স্ক্যামারের ভিড়ে 'আসল মানুষ' বা ‘আসল ব্যবহারকারী’ চেনাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এই সমস্যার সমাধানে ফেসবুকের মালিক প্রতিষ্ঠান মেটা এবার বড় এক ঘোষণা দিয়েছে। ফেসবুক ব্যবহারকারীরা এবার থেকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাবেন ‘ফেসবুক ভেরিফায়েড ব্যাজ’। অর্থাৎ, এর জন্য ব্যবহারকারীকে প্রতি মাসে সাবসক্রিপশন ফি দিতে হবে না, যেমনটা দিতে হয় ‘মেটা ভেরিফায়েড’ ব্যাজের ক্ষেত্রে।
নতুন এই ফিচারটির কল্যাণে পুরোপুরি বিনামূল্যে নিশ্চিত করা যাবে যে, নির্দিষ্ট একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টের পেছনে একজন রক্ত-মাংসের ‘আসল ব্যবহারকারী’ রয়েছেন।
কীভাবে বিনামূল্যে মিলবে ‘ফেসবুক ভেরিফায়েড ব্যাজ’?
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে বিনামূল্যে পাওয়া যাবে এই ‘ফেসবুক ভেরিফায়েড ব্যাজ?’ প্রক্রিয়াটি খুবই সহজ এবং মাত্র কয়েক মিনিটেই সম্পন্ন হবে।
এজন্য প্রথমে আপনার ফোনে ছোট একটি ভিডিও সেলফি রেকর্ড করতে হবে। অর্থাৎ, ফোনের সেলফি মোডে গিয়ে ব্যবহারকারীকে নিজের একটি ভিডিও রেকর্ড করতে হবে। এবারে ফেসবুক তাদের ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির সাহায্যে আপনার ভিডিও সেলফির সাথে আপনার প্রোফাইলে থাকা ছবিগুলো মিলিয়ে দেখবে। আর চেহারা মিলে গেলেই একেবারে বিনামূল্যে ফেসবুক ভেরিফায়েড ব্যাজ পেয়ে যাবেন আপনি।
ফেসবুক ভেরিফায়েড ব্যাজ প্রাপ্তির শর্ত
তবে ফেসবুকের নতুন এই সুবিধাটি পেতে কিছু শর্তও মেনে চলতে হবে। প্রথমত, ব্যবহারকারীর বয়স হতে হবে ১৮ বছর বা তার বেশি। দ্বিতীয়ত, অ্যাকাউন্টটিকে ফেসবুকের ট্রাস্ট অ্যান্ড সেফটি এবং কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডের নীতি মেনে চলতে হবে। ব্যবহারকারীর যদি কোনো ধরনের স্ক্যাম, প্রতারণা বা ভুয়া কার্যক্রমের ট্র্যাক রেকর্ড থাকে, তাহলে তিনি এই ব্যাজ পাবেন না।
কোথায় দৃশ্যমান হবে এই ব্যাজ?
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হলে ফেসবুক ভেরিফায়েড ব্যাজটি কোথায় দেখা যাবে? প্রাথমিকভাবে আপনি যখন ফেসবুক মার্কেটপ্লেসে কোনো পণ্য কেনাবেচা করবেন, কিংবা ফেসবুক ডেটিংয়ে কারো সাথে যোগাযোগ করবেন, অথবা কোনো গ্রুপে অংশ নেবেন, তখন আপনার নামের পাশে ছোট একটি টিক চিহ্ন দেখা যাবে। এর অর্থ হচ্ছে, আপনার অ্যাকাউন্টটি ফেসবুক ভেরিফায়েড।
এছাড়া আপনার ফেসবুক প্রোফাইলেও এই ব্যাজ দৃশ্যমান হবে। মেটা জানিয়েছে, ভবিষ্যতে সাধারণ ফেসবুক ফিডের পোস্টেও এটি যুক্ত করা হবে।
অর্থাৎ, মার্কেটপ্লেসে কোনো অচেনা বিক্রেতার সাথে লেনদেন করার আগে এই ফেসবুক ভেরিফায়েড ব্যাজ দেখে আপনি নিশ্চিত হতে পারবেন যে, স্ক্রিনের অপর পাশে থাকা ব্যবহারকারী কোনো এআই বট বা ভুয়া প্রোফাইল নয়। আর এই ফিচারটির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, একবার ভেরিফাই করলেই এটি স্থায়ীভাবে আপনার প্রোফাইলে থেকে যাবে, এর জন্য প্রতি মাসে সাবস্ক্রিপশন ফি গুণতে হবে না।
কী সুবিধা পাবেন, আর কী পাবেন না?
তবে ফেসবুকের নতুন এই ফিচার সম্পর্কে আরও কয়েকটি বিষয় জেনে রাখা প্রয়োজন। প্রথমত, এই ফ্রি ভেরিফায়েড ব্যাজটি কোনো ফেসবুক পেজ বা ফেসবুক প্রোফেশনাল মোড অ্যাকাউন্টের জন্য প্রযোজ্য নয়। এটি কেবলমাত্র সাধারণ ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত প্রোফাইলের জন্য প্রযোজ্য।
দ্বিতীয়ত, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এই ব্যাজ পাওয়ার অর্থ কিন্তু এই নয় যে, ফেসবুক নির্দিষ্ট একজন ব্যবহারকারীর বিশ্বস্ততা বা তার পণ্যের নিশ্চয়তা বা গ্যারান্টি দিচ্ছে। এটি শুধুই প্রমাণ করে যে, অ্যাকাউন্টের পেছনে একজন 'আসল মানুষ' আছেন, কোনো অটোমেটেড বট বা এআই নয়। তাই ফেসবুকে লেনদেনের ক্ষেত্রে কাউকে বিশ্বাস করা বা না করার দায়ভার বরাবরের মতোই ব্যবহারকারীর নিজের।
এছাড়া, 'মেটা ভেরিফায়েড' নামে আগে থেকেই যে পেইড সাবসক্রিপশন ফিচারটি আছে, তার সাথে নতুন এই ফ্রি ‘ফেসবুক ভেরিফায়েড’ ব্যাজের পার্থক্য রয়েছে। এই যেমন, পেইড সাবসক্রিপশনের ক্ষেত্রে একজন ব্যবহারকারী কন্টেন্ট ক্রিয়েটর বা ব্যবসার জন্য ইমপারসোনেশন প্রোটেকশন ও সাপোর্ট পেয়ে থাকেন। কিন্তু এই সুবিধাটি বিনামূল্যের ফেসবুক ভেরিফায়েড ব্যাজে পাওয়া যাবে না।
বিশ্বব্যাপী কবে থেকে চালু হচ্ছে?
মেটা ইতোমধ্যেই নির্দিষ্ট কিছু মার্কেটে ধাপে ধাপে ফেসবুক ভেরিফায়েড ব্যাজ ফিচারটি চালু করা শুরু করেছে। খুব শীঘ্রই তা বিশ্বব্যাপী সকল দেশের সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।
এআই-এর তৈরি কৃত্রিম দুনিয়ায় ডিজিটাল পরিচয়কে সুরক্ষিত রাখতে এবং সত্যিকারের মানুষের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখতে মেটার নতুন এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি বড় পদক্ষেপ।