৫০ ওভারের ক্রিকেট তাঁর কাছে ধাঁধার মতো।
টেস্টে তিনি এ যুগের কিংবদন্তি - ৫৫ টেস্টে ২৩৯ উইকেট সে সাক্ষ্যই দেয়। আবার সিভিতে কলকাতা নাইট রাইডার্স, সিডনি সিক্সার্স, পার্থ স্কর্চার্স, সিডনি থান্ডার বা দিল্লি ডেয়ারডেভিলসের মতো ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর উপস্থিতি প্রমাণ করে - ক্ষুদ্রতম সংস্করণেও বেশ দাম আছে তাঁর।
কিন্তু ৫০ ওভারের ধাঁধা সমাধান করতে গিয়েই থমকে যান। খটকা লাগে। অভিষেকের এক যুগ পরেও। সেটা বোলিংয়ের দিক দিয়ে হোক, বা নেতৃত্ব। ক্রিকেটের মাঝারি সংস্করণকে সেভাবে ভালোবাসতে পারেননি, বিনিময়ে ওয়ানডেও তাঁকে এমন কিছু দেয়নি, যা আঁকড়ে থাকা যায়।
তিনি নিজেই মানেন এটা। বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে নামার আগে বলেছিলেন - ওয়ানডে খেলার যে ধকল, সেটা এখনও সামলানো শিখছেন। শিখছেন পঞ্চাশ ওভারের দৌড়ে কীভাবে স্পেল ধরে ধরে পরিকল্পনা করতে হয়।
এ সংস্করণের নেতৃত্ব চাননি। বলা যায় - অনেকটা পাকেচক্রে পড়ে নিতে হয়েছে। ভালো না বেসেই তাঁর ওয়ানডের নেতৃত্ব পাওয়ার ব্যাপারটাকে অনেকটা ‘অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ’-এর সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। যেখানে প্রত্যাশা করা হয়, অচেনা মানুষটার সঙ্গে ভালোবাসার বুনন গড়ে উঠবে বিয়ের পর। সব দেখেশুনে বিশ্বখ্যাত এক ক্রিকেট ওয়েবসাইট কামিন্সকে নিয়ে এক লেখায় শিরোনাম দিল - ‘কামিন্স ও ওয়ানডে - এখনও অমন প্রেমকাহিনি হয়ে ওঠেনি’ - এই কয়েকদিন আগে।
তিনি না বুঝলেও, অস্ট্রেলিয়ার বোর্ড বুঝেছিল - ছেলেটা পারবে। পারবে স্টিভ স্মিথ আর টিম পেইনের অধীনে দলের গায়ে লাগা সমালোচনার কালি সাফ করে একটা পরিচ্ছন্ন ইমেজ নিয়ে আসতে। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া যে এত দিনের পরিচিত ফর্মূলা ছুঁড়ে ফেলে সম্পূর্ণ অপরিচিত এক পথে সাফল্যের আশা করা শুরু করল - তা তো প্যাট কামিন্সের প্রতিভা, ব্যক্তিত্ব ও সামর্থ্যের ওপর ভরসা করেই!
অপরিচিত পথটা কেমন - ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট দলের অধিনায়ক বলার সঙ্গে সঙ্গে মাথায় যে ছবি ভেসে ওঠে, তার সঙ্গে কামিন্সের মিল নেই মোটেও। অ্যালান বোর্ডার বা রিকি পন্টিংয়ের মতো স্লিপে দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষকে স্লেজের বন্যায় ভাসাবেন না, ইয়ান চ্যাপেলের মতো মাথা গরম করে হুটহাট কিছু বলে বসবেন না।
সবচেয়ে বড় অমিল - বাকি সবার পারফরম্যান্সের নিয়ামক যেখানে রান - তাঁর উইকেট। একজন ফাস্ট বোলারকে নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্বকাপ জেতার আশা করা - আর যা-ই হোক, এমন ‘কাঁচা কাজ’ অস্ট্রেলিয়ার মতো ‘পাকা’ বোর্ডের হতে পারে বলে এতদিন কেউ বিশ্বাস করেননি। ঠিক যেমনভাবে ভাবেননি মাত্র চারটা ওয়ানডেতে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে বিশ্বকাপের মতো আসরে পাঠানোর মতো ‘ঝড়ে বক মারা কৌশল’ নেবে তাঁরা। দুটো ঘটনার প্রত্যেকটাই ঘটেছে।
কামিন্সের ওপর বোর্ডের ভরসা এতটাই - তাঁর নিজেরও হয়তো অতটা নেই। থাকবে কী করে? নিজের মনে যে তখনও ওয়ানডে-ধাঁধার সমাধান মেলাতে পারেননি তিনি!
যে নিজেই ওয়ানডের নেতৃত্ব চাচ্ছে না, তাঁর সঙ্গে ৫০ ওভারের এই ‘অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ’ করিয়ে দেওয়ার সাহস অস্ট্রেলিয়া বোর্ড পেয়েছে টেস্ট থেকে। ২০২১ সালের শেষ দিকে টেস্ট অধিনায়কত্ব পাওয়ার পর বেশ ভালোই করছিলেন - কিন্তু শুধু ‘ভালো’-তে সন্তুষ্ট থাকলে তিনি আর অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক কেন? তেইশে অ্যাশেজ, টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ আর ওয়ানডে বিশ্বকাপের মতো বড় তিন শিরোপার হাতছানি, তাই বাইশের শেষেই ঘোষণা দিয়ে পায়ে ঠেলেছেন আইপিএলের শৌর্য।
এরপরের যাত্রাটা সুখের ছিল না। ভারতের বিপক্ষে টানা দুই টেস্ট হার প্রশ্ন তুলল অধিনায়কত্ব নিয়ে। মার্ক টেলরের মতো অধিনায়ক লিখলেন, ‘অধিনায়ক কামিন্সের উন্নতি প্রয়োজন’।
এতকিছুর মাঝে হারালেন মা-কে। ব্যক্তিগত যন্ত্রণা দলীয় সাফল্য এনে দেওয়ার জন্য আরও বেশি তাতিয়ে তুলল যেন। কিন্তু কামিন্স তো কামিন্সই - ভেতরের ভাঙাগড়া বুঝতে দিলেন না।
এল অ্যাশেজ। লর্ডসে জনি বেয়ারস্টোকে যেভাবে আউট করলেন, তাতেই পরিষ্কার হলো কামিন্স-অধিনায়কত্বের মূলমন্ত্র। দেখালেন - চ্যাপেল, ওয়াহ বা পন্টিংদের মতো কথা আর স্লেজের তুবড়ি ছোটানো ছাড়াও প্রতিপক্ষের সঙ্গে ‘মাইন্ড গেইম’ খেলা যায়।
চলে আসে এজবাস্টনের প্রসঙ্গও। ২৮১ রানের লক্ষ্যে ২২৭ রানে আট উইকেট হারানোর পরেও যে টেস্ট অস্ট্রেলিয়া জেতে ‘ব্যাটসম্যান’ কামিন্সের সৌজন্যে। শত্রুর ঘরে খাজা-স্টার্কের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি চুপচাপ কামিন্সের নেতৃত্বও ‘কথা’ বলল - নিশ্চিত করল ছাইদানির দখলটা অজিদেরই থাকছে। ভারতকে হারিয়ে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপাও জেতা হয়ে গেছে এর মধ্যে। এমন দুটি সাফল্যের পর কীভাবে কামিন্সকে অধিনায়ক না করে বিশ্বকাপে পাঠাত অস্ট্রেলিয়া!
কিন্তু ওই যে, ওয়ানডে নিয়ে কামিন্সের নিজের মনেই খচখচানি ছিল। বোলার হিসেবে তো বটেই, নেতৃত্ব নিয়েও। দুই পেস-সঙ্গী স্টার্ক আর হ্যাজলউড যেখানে ওয়ানডেতে টপাটপ উইকেট শিকার করেন, কামিন্স সেখানে খাবি খান। প্রথম দুই পেসার ইনিংসের শুরুতে বল করতে এসে প্রতিপক্ষকে শিকলবন্দী করে রাখেন, তৃতীয় বোলার হিসেবে কামিন্স এসেই বাউন্ডারি হজম করে উল্টো সে শিকল আলগা করে দেন নিয়মিত। যে সংস্করণে নিজের পারফরম্যান্সেরই এই অবস্থা - বিশ্বকাপে কোন মুখে অধিনায়কত্ব করবেন তিনি?
বুঝতে পেরেছিলেন, নেতৃত্ব দিতে হবে সামনে থেকেই। পারফরম্যান্স দেখিয়ে। আর কী দুর্দান্তভাবেই না বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে সে পারফরম্যান্স দেখালেন তিনি!
না, টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি হননি। ওই মর্যাদা জুটেছে মোহাম্মদ শামির কপালে। তাহলে সবচেয়ে কিপটে বোলিং? না - নিয়মিত বোলারদের মধ্যে সেটা যশপ্রীত বুমরা করেছেন। সেরা বোলিং গড় আর বোলিং ফিগারও শামিরই। কামিন্স কী করলেন তাহলে?
মাহাত্ম্যটা এখানেই। এমন কিছু করে দেখিয়েছেন, পরিসংখ্যানের পাতায় যার অস্তিস্ব থাকবে না - কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনায় সেসব কাজগুলোই একটু একটু করে অস্ট্রেলিয়াকে বিশ্বকাপের কাছাকাছি নিয়ে গেছে।
ভারত আর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টানা দুই ম্যাচে নাকানিচুবানি খাওয়ার পর তৃতীয় ম্যাচে শ্রীলঙ্কার দুই ওপেনার কুশল পেরেরা আর পাতুম নিশাঙ্কা তখন চোখ রাঙাচ্ছেন। স্টার্ক-হ্যাজলউডরা বেদম মার খাচ্ছেন। বিনা উইকেটে ১২৫ করা শ্রীলঙ্কা খুব তাড়াতাড়ি এরপর দুই ওপেনারকে হারালো। ওই আঘাত সেরে আর উঠতে পারেনি লঙ্কানরা, থেমেছে ২০৯ রানে।
থিতু হওয়া দুই ওপেনারকে সরিয়ে দেওয়ার কাজটা কে করেছেন? কামিন্স।
উড়তে থাকা প্রতিবেশি নিউজিল্যান্ডকে হারানোর জন্য প্রথমে ব্যাট করা অস্ট্রেলিয়ার কাজটা সহজ ছিল না। মেরে খেলে রানপাহাড়ে চাপা দেওয়ার সে কাজটায় ওয়ার্নার-হেড-ম্যাক্সওয়েলদের পাশাপাশি হাত লাগালেন কামিন্সও। সেদিন পরিস্থিতি বুঝে শেষদিকে কামিন্স ১৪ বলে ৩৭ রান না করলে কিউইদের হয়তো পাঁচ রানের আক্ষেপটা থাকত না। আক্ষেপ থাকত না কামিন্সের বলেই দুর্দান্ত ফর্মে থাকা রাচিন রবীন্দ্র আউট না হলে।
আফগানিস্তানের বিপক্ষে পরিস্থিতির দাবি মিটিয়ে এবার পুরোপুরি ১৮০ ডিগ্রি উলটে গেলেন কামিন্স। গ্লেন ম্যাক্সওয়েল যেন নিশ্চিন্তে চার-ছক্কার ইতিহাস গড়ে দলকে জেতাতে পারেন, সে জন্য ৬৮ বল ধরে নিজের উইকেট আগলে রাখলেন পঁচাত্তরের গাভাস্কারের মতো। সেদিনের ১২ রান কোনো পরিসংখ্যানের পাতায় ঝড় তুলবে না - কিন্তু যেকোনো অস্ট্রেলিয়ানকে জিজ্ঞেস করুন - কামিন্সের ইনিংসটাকে যেকোনো অর্থহীন ওয়ানডে সেঞ্চুরির চেয়ে এগিয়ে রাখবেন তাঁরা, সেমিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দলের সাত উইকেট চলে যাওয়ার পর তাঁর ২৯ বলে ১৪ রানকেও একই কাতারে রাখবেন।
একই ম্যাচে কামিন্সের ফিল্ডিংয়ের কথাই বা কীভাবে ভোলা যায়? যে কুইন্টন ডি কক সুযোগ পেলেই সেঞ্চুরি করছিলেন, সেমিতে তাঁকেই মাত্র তিন রানে ফিরিয়েছেন মিড উইকেট থেকে উল্টোদিকে দৌড়ে অবিশ্বাস্য ক্যাচ ধরে। বোঝা যাচ্ছিল, ওয়ানডেকে আস্তে আস্তে ভালো লাগা শুরু হয়েছে তাঁর। সাদা বলের রোমাঞ্চে বেশ ভালোভাবেই বুঁদ হয়েছেন।
কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়কদের তো এসব দুই-একটা জয়ে ইতিহাস মনে রাখে না। দিন শেষে ঝকমকে ট্রফিটা ঘরে না তুলতে পারলে - সব নস্যি।
ফাইনালে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী - আট বছর আগে সে অনুপ্রেরণা হাতে-কলমে পেয়েছিলেন মাইকেল ক্লার্কের ৭২ বলে ৭৪ রানের ইনিংস দেখে। বাড়তি অনুপ্রেরণার জন্য গতকাল প্রেসবক্সে রিকি পন্টিং ছিলেন - এই ভারতকেই দুই দশক আগে যার ঝড়ো ১৪০ স্তব্ধ করে দিয়েছিল। একইভাবে স্তব্ধ করার পরিকল্পনা যে তিনিও মনে মনে আঁটছেন - প্রকাশ করতে কোনো রাখঢাক করেননি। সংবাদ সম্মেলনে জানালেন, ‘এক লাখ তিরিশ হাজার সমর্থককে চুপ করিয়ে দেওয়ার মতো শান্তি আর কোনকিছুতে নেই!’
আহমেদাবাদকে চুপ করার মূল দায়িত্ব নিজের কাঁধেই তুলে নিলেন। যার শুরু টস দিয়ে। টস জিতে যেখানে অধিকাংশ অধিনায়ক ব্যাটিং বেছে নেন - কামিন্স নিলেন ফিল্ডিং। দুই দিন ধরে মোতেরার পিচ পর্যবেক্ষণ করে বুঝেছিলেন, ভারতের সঙ্গে প্রথম ম্যাচে যে পিচে খেলেছিলেন, চেন্নাইয়ের ওই পিচের সঙ্গে এ পিচের বেশি ফারাক নেই। সে ম্যাচে পরে ব্যাট করে হেসেছিল ভারত।
সঙ্গে আহমেদাবাদের ইতিহাস তো ছিলই। ফাইনালের আগে এ মাঠে যে চার দল আগে ব্যাট করেছে, তিনবার জিতেছে তাঁরাই। উদ্বোধনী ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তানের বিপক্ষে ভারত - শিশিরসিক্ত মোতেরায় প্রত্যেকে পরে ব্যাট করে সুবিধা পেয়েছে। সিদ্ধান্তটা যে কতটা বুদ্ধিদীপ্ত ছিল, ম্যাচসেরা ট্র্যাভিস হেডের কথাতেই স্পষ্ট, ‘টস জিতে বোলিং নেওয়ার সিদ্ধান্তটা অসাধারণ ছিল। মনে হয়েছে পরে উইকেট আরও ব্যাটিং উপযোগী হয়েছে।’
তবে শুধু টস জিতলেই যদি ভারতকে হারানো যেত, তাহলে তো হতোই। এই ভারতকে হারানোর জন্য শুরুতেই রোহিতকে থামাতে হয়, যাতে ভারত অধিনায়ক প্রথমে ঝড় তুলে দলকে একটা শক্ত ভিত্তি না এনে দিতে পারেন। এই ভারতকে হারানোর জন্য বিরাট কোহলিকে আটকাতে হয় সেঞ্চুরি করা থেকে, নিরন্তর সিঙ্গেলস-ডাবলস নেওয়া থেকে। দলের একমাত্র ডানহাতি রিস্ট স্পিনার অ্যাডাম জাম্পা যেন ভারতের ডানহাতি মিডল অর্ডারে খেই না হারিয়ে ফেলেন - নিশ্চিত করতে হয়।
কামিন্স সব জানতেন। শুরু থেকে রোহিতকে ঠেকানোর জন্য ডিপ থার্ডে ফিল্ডার না রেখে ডিপ পয়েন্টে ফিল্ডার রাখলেন - দেখা গেল, প্রথম দুই ওভারে ঐ ফিল্ডারই পাঁচ রান আটকেছেন। মিড অনে রাখলেন জাম্পাকে, স্টার্কের স্কিড করা বলে থতমত খাওয়া গিল সেখানেই ক্যাচ তুললেন।
রোহিত মেরেধরে খেলবেন, জানাই ছিল। তাও স্টার্ক-হ্যাজলউডরা মুভমেন্ট পাচ্ছিলেন। এমন অবস্থায় তৃতীয় বোলার হিসেবে কামিন্স নিজে আসবেন, ভারতীয়রা এমনটা ভেবে থাকলে তাঁদের চমকাতে বেশীক্ষণ নেননি তিনি। আট ওভারেই ম্যাক্সওয়েলকে আক্রমণে আনলেন, যাতে স্পিনার পেটাতে গিয়ে রোহিত উল্টো উইকেট বিলিয়ে আসেন। হলোও তাই।
রোহিত উইকেটের মায়া করেননি, এ বিশ্বকাপে তাঁর ভূমিকাও ছিল না অমন। কোহলির ব্যাপারটা তা নয়। বাড়তি ঝুঁকি না নিয়ে ধরে খেলার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। এক পর্যায়ে কামিন্স তাঁকেও অধৈর্য্য বানিয়ে ফেললেন। বাউন্ডারির পাশাপাশি অবিশ্বাস্যভাবে সিঙ্গেলস-ডাবলস বের করে নিতে জুড়ি নেই কোহলির - কামিন্স তাই এমনভাবে ফিল্ডিং সাজালেন, যাতে বাউন্ডারিও না আসে, সিঙ্গেলস-ডাবলসও না হয়। লং থাকলে মিড উইকেট সামনে, মিড উইকেট পেছনে থাকলে লং ওপরে - ব্যস!
ততক্ষণে রান আটকে গেছে। এবার কামিন্স এসে কোহলিকে বাউন্সার-স্লোয়ার বাউন্সার-কাটার দেওয়া শুরু করলেন, যে বাউন্সারে কোহলি গোটা ম্যাচই অস্বস্তিতে ছিলেন। স্থিরই হতে দিচ্ছিলেন না কোহলি আর রাহুলকে। অতি সতর্ক দুজনের রান রেট কমিয়ে নেওয়া দেখে জাম্পা আর নিজের পাশাপাশি তিনজন পার্টটাইমার মিচেল মার্শ, গ্লেন ম্যাক্সওয়েল, ট্র্যাভিস হেডকে দিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে মাঝের কিছু ওভার করিয়ে নিলেন, যাতে ইনিংসের শেষ দিকে মূল বোলারদের করার মতো ওভার বাকি থাকে। ১৬ থেকে ২৪ ওভার পর্যন্ত চারজন বোলার এক ওভারের স্পেল করলেন।
শেষমেশ ধৈর্য হারিয়ে কামিন্সের বলেই হাতখুলে শট খেলার জায়গা না পেয়ে বোল্ড হলেন কোহলি। আগেরদিন এক লাখ তিরিশ হাজার দর্শককে স্তব্ধ করার হুংকার দেওয়া কামিন্স দেখিয়ে দিলেন, কথার কথা বলেননি। সূর্যকুমার স্লোয়ার বাউন্সার খেলতে পারেন না, হ্যাজলউড তাঁকে আউট করেছেন ওই বলেই।
ইনিংসের শেষদিকে টেল এন্ডাররা যেন হুটহাট বাউন্ডারি বের করে রান বাড়িয়ে নিতে না পারেন, সে জন্য লং অফ-লং অনে দুই ফিল্ডার রাখেননি কামিন্স। প্রায় সবাইকেই কাছাকাছি নিয়ে এসেছিলেন।
প্রশ্ন উঠতে পারে, তাতে তো বাউন্ডারি বের করা আরও সুবিধা, কোনোরকমে কাছে থাকা ফিল্ডারদের মাথার উপরে বল তুলে দিলেই কেল্লাফতে! কিন্তু বুদ্ধি খাটিয়ে যদি বাউন্ডারিই বের করতে পারেন, তাহলে মোহাম্মদ শামিরা টেল এন্ডার কেন! ওই কথা ভেবেই মারতে গিয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে আউট হয়েছেন টুর্নামেন্টের সফলতম পেসার।
রোহিত-ঝড়ে প্রথম দশ ওভারে ৮০ তোলা, পুরো টুর্নামেন্টে চার-ছক্কার বৃষ্টি নামানো ভারত পরের ৪০ ওভারে মাত্র চারটা বাউন্ডারি পেল, রান তুলতে পারল ১৬০। নিজে দশ ওভার বল করে মাত্র ৩৪ রানে নিলেন এমন দুজনের উইকেট - যে দুজনের সেঞ্চুরিতে চড়েই ফাইনালে এসেছিল স্বাগতিকরা। দ্বিতীয় ইনিংসে হেড-লাবুশেনরা দেখিয়েছেন, পরে ব্যাট করলে পিচ আরও সহজ হবে - কামিন্সের এ চিন্তায় গলদ ছিল না কোনো। ধারাভাষ্যে মুগ্ধ হার্শা ভোগলে ততক্ষণে বলছেন, ‘ভারতের ব্যাটসম্যানরা উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত কারাগারে আটকা পড়েছে!’
কামিন্সের সেই কারাগারে অবশ্য শুধু ভারতের ১১ জন খেলোয়াড়ই নন, আটকা পড়েছিলেন গ্যালারিতে থাকা এক লাখ ৩২ হাজার দর্শক, আটকা পড়েছিল তাঁদের উচ্ছ্বাস-উন্মাদনা-গর্জন। ভারতকে থামানোর দাওয়াই তো কমবেশি সবারই জানা, বিশ্বকাপে সেটা প্রয়োগ করতে পেরেছেন ক’জন?
কামিন্স পেরেছেন। তাতে পঞ্চাশের মারাকানার মতো স্তব্ধ হয়েছে আহমেদাবাদ। ব্রাজিলের বোবাকান্নার সহমর্মী হয়েছে ভারত। নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগ শেষ হয়েছে সেই কবে, কামিন্সের সৌজন্যে এক শতাব্দী পর মোতেরায় সেই যুগেরই শ্রেষ্ঠতম চলচ্চিত্রের মঞ্চায়ন হলো যেন। যার পরিচালক প্যাট কামিন্স, সহ-পরিচালক ট্র্যাভিস হেড আর মারনাস লাবুশেন!
সবচেয়ে বড় কথা, অবশেষে ৫০ ওভারের ধাঁধার সমাধান করতে পেরেছেন প্রথম পেস বোলিং অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপ জিতে। ওয়ানডে ক্রিকেটের আরও কাছে এসেছেন কামিন্স। ম্যাচ শেষে তো জানিয়েই দিয়েছেন -
‘এই বিশ্বকাপে আমি ওয়ানডে ক্রিকেটের প্রেমে পড়েছি!’