তাঁর টেস্ট অভিষেক নিয়েই প্রশ্ন ছিল। অভিষেক ইনিংসে ১০০ স্ট্রাইকরেটে ব্যাট করে প্রশ্নের তীব্রতা আরও বাড়িয়েছেন। কারণ, ইনিংসটা ছিল তিন বলে। দ্বিতীয় ইনিংসে এর জবাব কীভাবে দিলেন? ৪ বলে ৩ চারে ১২ রান! এই ব্যাটসম্যান করবেন টেস্ট ওপেনিং?
আর আজ সিডনি টেস্টে ৭৫ বলে ৫৭ রান করে যখন ডেভিড ওয়ার্নার আউট হলেন, তখন অস্ট্রেলিয়ার বর্ণাঢ্য ইতিহাসেও সফলতম ওপেনারদের একজন হিসেবেই গ্যালারির ভালোবাসা মাখতে মাখতে ড্রেসিংরুমে ফিরলেন।
চতুর্থ ইনিংসের পঁচিশতম ওভারে যখন ওয়ার্নার আউট হলেন, ম্যাচের ভাগ্য ততক্ষণে লেখা হয়ে গেছে। সাদা জার্সি গায়ে শেষবারের সাজিদ খানের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে যখন ড্রেসিং রুমে ফিরছিলেন, সিডনির গ্যালারীতে উপস্থিত প্রায় চব্বিশ হাজার দর্শক দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে বিদায় জানান অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসের অন্যতম সেরা ওপেনারকে।
ওয়ার্নারের অন্তিম টেস্ট ইনিংস যখন শেষ হলো, জয় থেকে মাত্র ১১ রান দূরে অস্ট্রেলিয়া। স্টিভ স্মিথকে সঙ্গে নিয়ে বাকী কাজটুকু সারেন মারনাস লাবুশেন। তাতে ৮ উইকেটের জয় স্বাগতিকদের। পার্থ, মেলবোর্নের পর সিডনিতেও হেরে টেস্ট সিরিজে ধবলধোলাইয়ের লজ্জা এড়াতে পারল না পাকিস্তান।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে খেলতে গিয়ে টেস্টে হার পাকিস্তানের জন্য নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তাসমান পাড়ের দেশটিতে গিয়ে শেষবার লাল বলের ম্যাচে পাকিস্তান জয়ের মুখ দেখেছিল, সেটারও ২৮ বছর পেরিয়েছে। ১৯৯৫ সালের ৩০ নভেম্বরের সে টেস্টে ৭৪ রানে জিতেছিল সফরকারীরা। ম্যাচটি হয়েছিল সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে।
এরপর হারের বৃত্তে আটকে যায় পাকিস্তান। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টানা ১৭ টেস্টে একটি ম্যাচেও ড্র পর্যন্ত করতে পারেনি পাকিস্তান।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন টেস্টে শেষ ম্যাচ খেলা ওয়ার্নার, ‘এটা অনেকটা স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো। গত দুই বছর ধরে দুর্দান্ত ক্রিকেট খেলছে অস্ট্রেলিয়া, এটা (৩-০ ব্যবধানে সিরিজ জয়) তারই ধারাবাহিকতা। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জয়, অ্যাশেজে ড্র, ওয়ানডে বিশ্বকাপ জয়। এমন একটা দুর্দান্ত দলের হয়ে খেলতে পেরে আমি গর্বিত।’
দর্শকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে অস্ট্রেলিয়া ওপেনার বলেছেন, ‘আমার অভিষেকের পর থেকে গত এক দশকে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া ও আপনাদের থেকে যে সমর্থন পেয়েছি, সে ঋণ আমি শোধ করতে পারব না। আমি সবকিছুর জন্য খুশি ও গর্বিত। আজকে আমরা যা করছি, আপনাদের সমর্থন ছাড়া তা সম্ভব হত না।’
বিদায়ী টেস্ট সম্পর্কে বলেছেন, ‘দর্শকদের বিনোদন দেওয়া আমাদের কাজ। সবসময় যা করতে চেষ্টা করি, এখানে (সিডনি) তা করতে পেরে ভালো লাগছে। আমি টি-টোয়েন্টি দিয়ে শুরু করেছিলাম। এখনো সেটা ধরে রাখার চেষ্টা করছি। আমি সবসময় নিজের মতো খেলতে চেয়েছি। বোর্ডকে সেটা বোঝাতে পেরেছিলাম। আশা করি, আমি যেভাবে খেলেছি, বিনোদন দিয়েছি, সবার মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছি।’
তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে বার্তা দিয়েছেন ওয়ার্নার, ‘যারা আমার পদাঙ্ক অনুসরণ করতে চাও, তাদের বলছি, সাদা বলের ম্যাচের চেয়ে টেস্ট ক্রিকেট অনেক বেশি মর্যাদার। তাই ধৈর্য ধরে কঠোর পরিশ্রম করতে থাক। টেস্ট ক্রিকেটও অনেক আনন্দের। ধন্যবাদ সবাইকে।’
সিডনি টেস্টের ফল যে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে যাচ্ছে, এটা বোঝা গিয়েছিল টেস্টের তৃতীয় দিন শেষেই। নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৬৮ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে দিন শেষ করেছিল পাকিস্তান। সফরকারীরা তবুও বড় ইনিংসের আশায় ছিল উইকেটে মোহাম্মদ রিজওয়ান (৬*) ও আমের জামাল (০*) ছিলেন বলে।
প্রথম ইনিংসে সর্বোচ্চ ৮৮ রান এসেছিল রিজওয়ানের ব্যাট থেকে। অন্যদিকে জামাল খেলেছিলেন ৯৭ বলে ৮২ রানের দুর্দান্ত ইনিংস।
আজ শনিবার চতুর্থ দিনের শুরুতে দুজন যেভাবে ব্যাটিং করছিলেন, তাতে কিছুক্ষণের জন্য মনে হচ্ছিল প্রথম ইনিংসের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। রিজওয়ান-জামালের জুটিতে এদিন পাকিস্তানের স্কোরবোর্ডে যোগ হয় আরও ৪১ রান।
দিনের চৌদ্দতম ওভারে বোলিংয়ে এসে পাকিস্তানের স্বপ্নে আঘাত হানেন নাথান লায়ন। ১০৯ রানে অষ্টম উইকেটের পতন ঘটে সফরকারীদের। রিজওয়ানকে (২৮) ওয়ার্নারের হাতে ক্যাচে পরিণত করেন ৩৬ বছর বয়সী অফস্পিনার। সঙ্গী হারিয়ে উইকেটে টিকতে পারেননি জামালও। পরের ওভারে প্যাট কামিন্সের বোলিংয়ে ট্রাভিস হেডের হাতে ক্যাচ দিয়ে প্যাভিলিয়নে ফেরেন ১৮ রান করা জামাল। স্কোরবোর্ড তখন ১০৯/৯।
শেষ উইকেটের জুটিতে মীর হামজাকে সঙ্গে নিয়ে হাসান আলী খেলেছেন আরও ১৮ বল। দুজনে মিলে স্কোরবোর্ডে যোগ করেছেন ৬ রান। লায়নের অফস্পিনের ফাঁদে হাসান আলী (৫) বিদায় নিলে ১১৫ রানে থামে পাকিস্তানের ইনিংস। তাতে স্বাগতিকদের লক্ষ্য দাঁড়ায় ১৩০ রান।
জবাবে ব্যাটিংয়ে নেমে প্রথম ওভারে ওপেনার উসমান খাজাকে হারায় অস্ট্রেলিয়া। দারুণ এক ডেলিভারিতে রানের খাতা খোলার আগেই লেগ বিফোরের ফাঁদে ফেলে অস্ট্রেলিয়া ওপেনারকে প্যাভিলিয়নের পথ দেখান সাজিদ খান।
শুরুর ধাক্কা সামলে অস্ট্রেলিয়াকে এগিয়ে নেন ওয়ার্নার। তাঁকে সঙ্গ দেন লাবুশেন। দ্বিতীয় উইকেটের জুটিতে দুজনে ১১৯ রান তোলেন। সাজিদ খানের বলে ওয়ার্নার ফিরে গেলেও জয় নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়েন লাবুশেন (৭৩ বলে ৬২ রান) ।
প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেটের পাশাপাশি প্রথম ইনিংসে ৮২ রান করা আমের জামাল ম্যাচ সেরা হয়েছেন। সিরিজের সেরার পুরস্কার উঠেছে অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক প্যাট কামিন্সের হাতে। তিন ম্যাচের সিরিজে ১৯ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি ৩৮ রান করেছেন তিনি।